প্রবাদ বলে, ‘যম-জামাই-ভাগনা তিন নয় আপনা।’ তবে প্রবাদ যাই বলুক না কেন যুগ যুগ ধরে শাশুড়িঠাকরুণরা জামাইকে তুষ্ট করার হরেক আয়োজন করে আসছেন। গ্রামাঞ্চলে বট-করমচার ডাল পুঁতে প্রতীকী অর্ঘ্য স্থাপন করে শাশুড়িরা প্রদীপ জ্বালিয়ে, হাতপাখায় জামাইকে বাতাস করে নানা ধরনের ফল ও মিষ্টি সহযোগে বরণ করেন। সঙ্গে থাকে দুপুরে খাওয়াদাওয়ার হরেক আয়োজনও।

মেয়ে-জামাইয়ের মঙ্গল কামনাতেই জ্যৈষ্ঠের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে শাশুড়িরা যে বিশেষ ষষ্ঠীর পুজো করেন সেটাই ‘জামাইষষ্ঠী’ নামে পরিচিত।

তবে শহুরে জামাইষষ্ঠীর ছবিটা বেশ অন্য রকম। কর্মব্যস্ততার প্রভাবে বদলাচ্ছে জামাইষষ্ঠীর তাৎপর্য ও উদ্‌যাপন। রান্নাবান্নার হাজারো হ্যাপা এড়াতে এখানে অনেকেরই ভরসা নামী হোটেল রেস্তোরাঁর ঐতিহ্যশালী পদের ‘থালি প্যাকেজ’। কিন্তু আজও বেশ কিছু বনেদি পরিবারে অতীতের রীতি মেনে হয় জামাইষষ্ঠী। সেখানে সময় যেন থমকে গিয়েছে ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের সামনে। হোটেল, রেস্তোরাঁ থেকে খাবার আনিয়ে নয়, আজও সেখানে প্রাধান্য পায় বাড়িতে তৈরি হরেক পদ।

অতীতের জামাইষষ্ঠীকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু কাহিনি।এক কালে মহাসমারোহে জামাইষষ্ঠী হত কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে। এই প্রথাটি অব্যাহত ছিল মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের উত্তরপুরুষ ক্ষৌণিশচন্দ্রের স্ত্রী জ্যোতির্ময়ী দেবীর যুগ পর্যন্ত।এ বাড়িতে জামাইয়ের সঙ্গে আসতেন তাঁর বন্ধুবান্ধবও। তাঁদেরও দেওয়া হত উপহার। মাসখানেক আগে থেকেই কী কী নতুন পদ তৈরি হবে তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। জামাইষষ্ঠীর দিন সকালে প্রথমেই জলখাবার। তাতে থাকত বাড়িতে তৈরি শিঙাড়া, কুচো নিমকি, রসবড়া, মালপোয়া। তার পর দুপুরে এলাহি ভোজপর্ব। সাদাভাত, শুক্তো, সাত রকম ভাজা, লাউ শাকের তরকারি, মুগের ডাল, সরষে পাবদা, পোলাও, কচি পাঁঠার ঝোল, কই মাছের হরগৌরী। অবশ্য সে সময় মুরগির প্রচলন ছিল না। সম্ভবত ষাটের দশকের পর থেকে মুরগি খাওয়ার প্রচলন হয়। ভোজনবিলাসের পাশাপশি মধুরেণ সমাপয়েৎ এবং তাম্বুল বিলাসেও ছিল চমক। বিশেষ সুগন্ধি পান সেজে গুঁজে দেওয়া হত সোনার লবঙ্গ। পান খাওয়ার সময় জামাইরা সেই লবঙ্গটা ছুড়ে ফেলে দিতেন। রাজপরিবারের বধূ অমৃতা রায় বলছিলেন, ‘‘পরিবারে প্রবীণদের মুখে শুনেছি প্রথমে রাজবাড়ির তরফে জামাইকে নিমন্ত্রণ পাঠানো হত বিশেষ উপহার দিয়ে। উপহারের মধ্যে থাকত বোতাম। তা সে পলার, পান্নার কিংবা মিনে করা বোতাম— যা-ই হোক না কেন।তবে উপহারটা ‘সোনা’-র হতেই হবে। শশুরবাড়িতে পৌঁছলে জামাইকে দেওয়া হত ধুতি, পাঞ্জাবি, দামি আতর। তার পরে জামাইষষ্ঠীর মূল অনুষ্ঠান। একটা ঝুড়িতে পান, নানা ধরনের ফল আর উপহার জামাইকে দেওয়া হত। একে বলা হত ‘বাটা দেওয়া’। অতীতে সোনার বাসনে জামাইদের আপ্যায়ন করা হত। এ বাড়ির জামাইদের মধ্যে যেমন রাজা, মহারাজারা ছিলেন, তেমনই ছিলেন বহু বিখ্যাত মানুষ। ইউ এন ব্রহ্মচারীর ছোট ছেলে নির্মল ব্রহ্মচারী ছিলেন মহারানি জ্যোতির্ময়ীর ছোট জামাই। তাঁকে এক বার সোনার রোলেক্স প্রিন্স ঘড়ি উপহার দেওয়া হয়েছিল।’’

তবে সে দিন আর নেই। রয়েছে তার রেশটুকু। তবু হারিয়ে যায়নি আভিজাত্যের গন্ধ মাখা জামাইষষ্ঠী উদ্‌যাপন। সে কালের স্মৃতি হাতড়ে শোভাবাজার রাজপরিবারের বড় তরফের প্রবীণ গৃহবধূ আরতি দেবী বলছিলেন, ‘‘আগে রাজ পরিবারে ঘটা করেই এক এক শরিকের বাড়ি জামাইষষ্ঠী পালন হত। সে সময় যে কোনও উৎসবে অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হত রুপোর থালা, বাটি, গ্লাস। এখন দিন বদলের সঙ্গে রুপোর পরিবর্তে এসেছে স্টিলের বাসন।’’

তাতে কী? রসনায় এতটুকুও আপস করতে রাজি নন নব্বই অতিক্রান্ত আরতি দেবী। এখনও জামাইষষ্ঠীর রান্নাটা নিজের হাতেই করেন। কারণ, রান্নার স্বাদে আপ্লুত জামাইয়ের হাসিটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আজও মেনুতে থাকে শুক্তো, মুগের ডাল, ছানার ডালনা, ফুলকপির চচ্চড়ি, কিমার পুর দিয়ে পটলের দোলমা, মুড়োলেজা-সহ কাতলা মাছ, পার্শে মাছের ঝাল, ঘি-ভাত, পাঁঠার মাংস এবং পুডিং। বাদ যায় না বাড়িতে পাতা দই আর আমও। এক সময় রসগোল্লা, সন্দেশও বাড়িতে তৈরি করতেন তিনি। তবে স্বাস্থ্য সচেতন জামাই রসগোল্লা, সন্দেশের চেয়ে পুডিংই বেশি পছন্দ করেন।

সময়ের সঙ্গে কিছুটা বদলালেও ভবানীপুরের গিরিশ ভবনের জামাইষষ্ঠীর ট্রাডিশন আজও চলছে। এই পরিবারের বধূ ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় জানালেন, ‘‘জামাইষষ্ঠীর দিন সকালে জামাইরা এলেও ভোজনপর্বটা সাধারণত হয় সপ্তাহ শেষে ছুটির দিনে। সাবেক রীতি মেনে জামাইদের হাতে পাঁচ রকম ফল, সরবত, ষষ্ঠীপুজোর দই-হলুদের ফোঁটা দিয়ে হাতপাখার বাতাস দিয়ে বরণ করেন শাশুড়িরা। এখনও সব রান্নাই হয় বাড়িতে। খাওয়াদাওয়া দুপুরে হলে মেনুতে থাকে সাদাভাত, শুক্তো, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, পোলাও, কচি পাঁঠার মাংস ইত্যাদি। আর সেটা রাতে হলে বিরিয়ানি, মাংসের রেজালা, চাঁপ ইত্যাদি থাকে। তবে উপহারের ব্যাপারে এসেছে পরিবর্তন। এখন জামাইদের নিজের পছন্দসই কিছু কেনার জন্য অর্থই দিয়ে দেওয়া হয়।’’

অতএব সেই প্রবাদ মানতে নারাজ শাশুড়িঠাকরুণরা আজও জামাইয়ের মন রাখতে কোনও ত্রুটি রাখতে চান না। জামাইষষ্ঠীতে তাই বনেদিবাড়ির শাশুড়িদের আজও ভরসা নিজেদের হাত গুণেই। কে জানে হয়তো হাত গুণে প্রবাদটাও বদলায়!

অলঙ্করণ: দেবাশীষ দেব।