জামাইষষ্ঠীর গোড়ায় ‘জামা’, কিন্তু এখন বেয়াল্লিশ সাইজ পেল্লায় আঁট। আবার চুয়াল্লিশ সেমি-আলখাল্লার মতো ঝুলঝুল। হাজার বললেও তো ক্যাশ উপহার দেবে না। দিলে মীরা স্টোর্সের মাসিমার মুখটা মিনি-মধু হত। টুকটাক চিপ্‌সও চলত অফিসফেরতা একলা হাঁটায়। তবে মেনুতে পাঁঠা অ্যাক্কেরে বাদ। লাল টকটকে ঝোল দেখলেও পেট গুড়গুড়। তা ছাড়া ডাক্তার বলেছে, রেড মিটের চেয়ে এক তোলা করে সেঁকো বিষ খান না ডেলি! ছিবড়ে চিকেনের জন্যে সাত মাইল ঠেঙিয়ে হাসি-হাসি মুখে এন্ট্রি, পোষায়? তাও যে ঘরে বসতে দেবে, গাঁকগাঁক টিভি। শ্বশুর কাল রাত্তিরে যে সিরিয়ালগুলো দেখেছেন, আজ তার রিপিট দেখছেন সমান বিস্মিত বালক টাইপ হাবলা মুখে। শালির ছেলেটা ভিডিয়ো গেমে নাক গুঁজড়ে বসে আছে। টড়াং টড়াং আওয়াজ স্ক্রিন থেকে। হয়তো মনস্টার নিকেশ হচ্ছে। বা ড্রাগন চুমু খাচ্ছে। কিছু জিজ্ঞেস করলে কাঁচা তাচ্ছিল্য প্লাস চোস্ত ইংরিজি মিশিয়ে ঝটাক উত্তর দেয়। শালি তার ট্যাঁশ ছেলের দিকে গর্বে আতুর তাকায় আর ভুঁড়িটা টেনে রাখার চেষ্টা করে। এই যে চল্লিশের খড়ির গণ্ডিটি পেরোল আর মানুষের চোখে চালশে ও জোঁকে নুন হামলে পড়ল, কিন্তু তার সাধ আর নোলা রয়ে গেল হুবহু ছাব্বিশ কাটিং, এ হচ্ছে ভগবানের সর্বাধিক ক্রূর কেলো। এ দিকে এত জোরে টিভি চললে হোয়াটসঅ্যাপের জোকগুলো অবধি খতিয়ে পড়া যাবে না, তাও বোঝে না অশিক্ষিতগুলো!

ভায়রাভাই মোদী সম্পর্কে সব জানে। নদী সম্পর্কেও। নীচে সিগারেট কিনতে যাওয়ার সময় চোখের একটা সেমি-স্ল্যাং ইশারা অ্যায়সা মারে, পুং-পুং কামারাদারিতে পায়চারির সঙ্গী হতে হয়। কোথায় ভাল সুশি পাওয়া যায়, কোথায় ভাল টোফু,  ইদানীং এই এরিয়ার ফ্ল্যাটে কত করে স্কোঃফুঃ, তাবৎ তথ্য তার মুখ থেকে সত্যের লালায় নেয়ে ছিটকে পড়তে থাকে, হাতের সিগারেটের বেঁটে লাশ সে উত্তমকুমার-টুসকিতে ছুড়ে ফেলে এবং অন্যের ইগোর ন্যায় দলে দেয়। মাঝখানে আবার ঘাড়ে হাত দিয়েও হাঁটল খানিক। যেন জিগরি দোস্তের সঙ্গে বেরিয়েছে। রাষ্ট্র সম্পর্কে খুব চিন্তায় পড়ে গিয়ে চকচকে লোকটি দ্রুত হজমোলা কিনে ফেলে। নিজে খায়, অফার করে না।

তবে কী করা? আসামাত্র ফ্ল্যাশব্যাক রাউন্ড শুরু হয়েছিল, হায় দিদি তোর কী ফিগার ছিল আমার সে কী চুল, বাবার ছিল কী প্রতিভা টেগোর সমতুল। পেছনে বেহালার অর্কেস্ট্রা এখন স্বল্প ফেড আউট হচ্ছে, ঢুকে পড়ছে জীবনের থরথরেতম থ্রিল: অসুখের গল্প। আমার যা ব্যথা কেউ ভাবতেও পারবে না, শুধু আমি বলেই নর্মাল-নর্মাল লড়ে যাচ্ছি উঁহু আমি একেবারে মরার দোরদোড়ায় কিন্তু ছেলেকে নুডলস না দিয়ে যমের বাড়ি যাব জো কী?  প্রত্যেকের কোমরে বল-বেয়ারিং হড়কেছে, হাঁটুতে অপারেশন তুরন্ত, আর বরানগরের মেসো গলায় ভাতের ড্যালা আটকে মারা গেলেন সে হরর স্টোরি হর লাঞ্চে ফ্যানের সঙ্গে পাখসাট না খেয়ে যাবে কই?  পেটের কাছে একটা আঁচিল হয়েছে, ব্যাটা শেষপাতে ক্যানসার নিকলোবে না তো?  কেন ইয়ের কথা জানো না, ভেবেছিল মশা কামড়েছে তার পর পুরো উয়োটাই কেটে বাদ দিতে হল?  সবে অসুখের ব্রতকথা জম্পেশ,  ছেলে ষাঁড়ের মতো চিৎকার জুড়ে দিল। এ বাড়িতে এসি নেই কেন? কার্টুন চ্যানেল ঘোরানো হচ্ছে না কেন? আমার ট্যাবে চার্জ চলে গেল কেন? এই ঘোটালার মধ্যে কাজের লোক মাছের বড়া হুমহাম মুখে পুরে দিয়েছে। ধরা পড়ত না, কিন্তু শ্যালিকার পিঠেও চারটে চোখ। শাশুড়ি এমন স্লো মোশনে বসে পড়লেন যেন সদ্য নোবেল চুরি গেল।

কী একটা হলদে সুতো তেলে না কাসুন্দিতে চুবিয়ে হাতে বেঁধে দিলেন, সাদা শার্টে এক বারটি লাগলেই চিত্তির। নিজের হাতকে খতরনাক প্রতিবেশীর মতো দূরে ঠেলে রাখতে হচ্ছে। কপালে ফোঁটাটাও তাক বুঝে মুছে নিতে হবে, নইলে লোকে বিজেপি ঠাউরে কমেন্ট। এক বার অফিস না গেলেই নয়। অ্যাপ-ক্যাব আসার সময়েই বিস্তর সার্জ দেখাচ্ছিল। ট্যাক্সিওলা বিচ্ছিরি বাংলা বা হিন্দিতে কুড়ি টাকা এক্সট্রা চাইলে আমরা ফায়ার, কিন্তু সুচারু ইংরেজিতে ৪.৮ গুণ বর্ধিত ভাড়ার আকাঙ্ক্ষা পড়ে ফোঁস শ্বাস ছেড়ে গলা গলিয়ে দিই। এখন বাসে করে অফিস গেলে খরচার একটা মা-বাপ থাকে। এ দিকে গরমের দেবতা একখান গনগনে লোহার শিক চাঁদি ফুঁড়ে ঝাঁকাচ্ছেন, বাসের টিনের কৌটোয় তা ছ’গুণ দবদবাচ্ছে।

শাশুড়ি দেবতার নামে কিছু বললেই ঠিকরে ওঠেন, তাঁর ভক্তির ঠেলায় বাড়ির সব কুলুঙ্গিতে ঠাকুর গুলগুল, আসার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় কাঁসার থালা ঠেকিয়ে গুচ্ছের লিচু আর কাঁঠালকোয়া গিলিয়েছেন। মনে হয় ভাত কম দেওয়ার চক্রান্ত, চালফাল কেনা নেই। অফিস যেতে যেতে ফুরফুরে কলেজ-কচিগুলোকে দেখে হিংসেয় কলজে ফেটে যায়। অফিসে অবিশ্যি রিল্যাক্স করে গল্প মারার চান্স নেই। অ্যালার্মের মতো ফোন। কাজ নাকে-মুখে সেরেই শ্বশুরবাড়ি রিটার্ন। নিপুণ ভায়রাভাই ঘাঁতঘোঁত বের করে ঠিক রেস্তোরাঁয় বুকিং সেরে ফেলেছে। বাংলা খাবার। উচ্ছেভাজা সাড়ে তিনশো টাকা। ভেটকিকে লেখা ‘ভেকটি’। বর্ণবিপর্যয়ে স্মার্ট।

এমনিতেই জীবন নরক, তার উপরে সেই মড়ক-সড়কে তিন পা চলতে না চলতে মানুষ ফুর্তির ফলক পুঁতেছে। চলো খাই। গদগদ হই। সিন্নি দিই। বেলুন কিনি। যেখানে ঘুম থেকে উঠে দেখা যায় ভোরবেলা পাখা কমিয়ে দিতে সবাই ভুলে গেছে, ব্রাশ করতে গিয়ে দেখা যায় তার ঝ্যাঁটার মতো ছ্যাতরা-শীর্ষে আরশোলার নাচ, জলখাবারে দেখা যায় আলুর তরকারি অলৌকিক আলুনি, হর সন্ধেয় বন্ধুর উল্লম্ফন মানিয়ে হুইস্কিতে প্রেজেন্ট প্লিজ দিতে দিতে হৃদয় হাল্লাক, আর রাত্তিরে হিসহিসে ঝগড়া শেষ করে বাতের মলমের গন্ধে ম-ম ঘরে নয়া চুলকুনি নিয়ে ব্যস্ত হতেই পিঠে প্যাঁট খেলনা-গাড়ির খোঁচ, সেখানে গোটা দিনটা দেঁতো হাসি কাট-পেস্ট করে এমন একটা বাড়িতে কাটিয়ে দিলাম, যেথা খালি-গা হতে লজ্জা করে? ফিরতে ফিরতে দেখা যায় মহিলা-গোয়েন্দাটির কিচ্ছু নজর এড়ায়নি। তোমার কি মেজাজ খারাপ? কেন? কী হল? কী করলাম? বাবা কিছু বলেছে? আহা, তোমার বাবা আবার কী বলবেন, ওঁর তো দিনভর গুটখা গাব্‌লাতেই ঠোঁট আর জিভ এলে গেল। ব্যস। ট্যাক্সি ড্রাইভার আড়ে হাসে। কুচো স্যাম্পলও কম যায় না। ‘কিন্ডার জয়’ কেনা হয়নি বলে গাড়ি থেকে নেমেই দাপানি। ছোটো মুদির দোকানে। বন্ধ। মুদি জামাইষষ্ঠীতে গেছে। কিন্তু ওর ছেলে কিন্ডার জয় চাইলে কী করবে?