চিকিৎসকদের দাবির প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি জানিয়ে তাঁদের দ্রুত কাজে ফিরতে অনুরোধ করলেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। বিভিন্ন হাসপাতালে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকদের নিরাপত্তা সব রকম ভাবে নিশ্চিত করার নির্দেশও রাজ্য প্রশাসনকে পাঠানো হচ্ছে বিবৃতি দিয়ে জানাল রাজভবন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অবিলম্বে স্বাস্থ্য পরিষেবায় স্বাভাবিকতা ফেরানোর নির্দেশ দিলেন। রোগীদের সঙ্কটের কথা দিনভর বার বার তুলে ধরলেন তিনি। কিন্তু রাজভবনের বিবৃতিতে আন্দেলনরত চিকিৎসকদের দাবিদাওয়াগুলির প্রতিও যে সহানুভূতি দেখা গেল, মুখ্যমন্ত্রীর ফেসবুক পোস্টে এ দিন তা সে ভাবে ধরা পড়ল না।

বৃহস্পতিবার এসএসকেএম হাসপাতালে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। রোগীরা কী রকম সঙ্কটে রয়েছেন, সে কথা মাথায় রেখে অবিলম্বে পরিষেবা স্বাভাবিক করার নির্দেশ দেন তিনি। জুনিয়র ডাক্তাররা চার ঘণ্টার মধ্যে কর্মবিরতি প্রত্যাহার না করলে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে, হস্টেল থেকে বার করে দেওয়া হবে— এমন হুঁশিয়ারিও তিনি দেন। তবে হুঁশিয়ারিতে কাজ হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে রীতিমতো বিক্ষোভ হয় এসএসকেএমে। তিনি হাসপাতাল চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও তার আঁচ বহাল থাকে। মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির জেরে তৈরি হওয়া পাল্টা ক্ষোভের রেশ এনআরএস, আরজি কর, সাগর দত্ত-সহ বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সে সবের মাঝেই চিকিৎসকদের এবং জুনিয়রদের কয়েকটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সঙ্গে দেখা করেন এবং বৈঠক করে স্মারকলিপি জমা দেন।

চিকিৎসক এবং জুনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলার পরে রাজ্যপাল কী পদক্ষেপ করেছেন, তা সন্ধ্যায় রাজভবনের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে। ‘‘হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, জুনিয়র ডাক্তারদের উপরে হামলার প্রকৃত তদন্ত ও অপরাধীদের প্রত্যেকের শাস্তি এবং তাঁদের অন্যান্য অভিযোগের সুরাহা তাঁরা (চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিনিধিরা) দাবি করেছেন। রাজ্য সরকারের তরফ থেকে দৃঢ় এবং বিশ্বাসযোগ্য ভাবে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি মিললেই তাঁরা কাজ শুরু করবেন বলে প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।’’ রাজভবনের বিবৃতিতে এ কথাই লেখা হয় এ দিন। চিকিৎসক এবং জুনিয়রদের সংগঠনগুলির এই সব দাবিদাওয়া রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হচ্ছে বলেও রাজভবন জানায়।

চিকিৎসকদের দাবির প্রতি সমর্থন এবং সঙ্কটাপন্ন রোগীদের প্রতি সহানুভূতি— রাজভবনের বিবৃতিতে দু’টি বিষয়ের খেয়ালই রাখা হয়েছে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী এ দিন সন্ধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় যে লম্বা বিবৃতি প্রকাশ করেছেন, তাতে কিন্তু চিকিৎসকদের দাবিগুলির প্রতি সহানুভূতির বিষয়টি খানিকটা অমিল।

আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলার জন্য কখনও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে বা কখনও কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে পাঠানোর কথা নিজের ফেসবুক পোস্টে এ দিন উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। চিকিৎসাধীন জুনিয়র ডাক্তারকে দেখতে স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষ আধিকারিককে যে তিনি পাঠিয়েছিলেন, সে কথা মনে করিয়ে দেন। জুনিয়রদের উপরে হামলার অভিযোগে ইতিমধ্যেই ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও তিনি লেখেন। ফেসবুক পোস্টটির পরবর্তী অংশে ধরা পড়েছে মুখ্যমন্ত্রীর বিরক্তি তথা উষ্মা। তিনি লিখেছেন, ‘‘আমাদের সরকার পূর্ণ সহযোগিতা করছে এবং জরুরি ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে প্ররোচনা আসছে, যার ফাঁদে কারও পা দেওয়া উচিত নয়।’’ এসএসকেএমে যাঁরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ‘বহিরাগত’ ছিলেন বলেও মুখ্যমন্ত্রী ওই পোস্টে দাবি করেন।

এসএসকেএমে দাঁড়িয়েও বৃহস্পতিবার এ কথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিক্ষোভকারীদের মুখ্যমন্ত্রী ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেশি করে ছড়ায়। মুখ্যমন্ত্রীকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে— এমন দাবিও উঠতে শুরু করে।

সন্ধ্যার ফেসবুক পোস্টে কিন্তু কোনও ক্ষমা যাচনা বা দুঃখ প্রকাশের রাস্তায় মুখ্যমন্ত্রী হাঁটেননি। দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের সঙ্কটের কথা জোর দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, রোগীদের এবং তাঁর পরিজনদের কিছু ছবিও নিজের ফেসবুক পোস্টে জুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসকদের ও জুনিয়রদের যে মূল দাবি, তা নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। এনআরএস-এ ১০ জুন যে ঘটনা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেওয়া হবে না— এমন আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রী দেননি।

দিনের শেষে অতএব সঙ্কটের নিরসন ঘটেনি। রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রী— দু’জনেই চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিতে বলেছেন ঠিকই। কিন্তু রাজ্যপাল যে ভাবে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করার উপরে জোর দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর ফেসবুক পোস্টে তা যেন অমিল। চিকিৎসক সংগঠনগুলির দাবিদাওয়া রাজ্য প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে রাজভবন জানিয়েছে ঠিকই। কিন্তু রাজভবন থেকে ওই সব দাবিদাওয়া সম্বলিত স্মারকলিপি নবান্নে পৌঁছলেও কাজ কতটা হবে, তা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না আন্দোলনকারীরা।