আত্মঘাতী সন্তানের দেহ মর্গে রেখে ‘দাদা’কে ভোট দিয়ে এলেন রেণুকা
‘‘ছেলেকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু ভোট দেওয়া একটা অধিকার। আমার জন্য দাদা (অধীর) হেরে গেলে সারা জীবন আফশোস থেকে যেত।’’
congress flags

সহমমির্তা: ছেলের দেহ মর্গে রেখে ভোট দিতে গিয়েছিলেন রেণুকা মার্ডি। পরের তাঁর বাড়িতে অধীর চৌধুরী।— নিজস্ব চিত্র

তৃণমূলের দাবি, কংগ্রেসের পুরনো ‘গড়’ এ বার তাদের দখলে আসছে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ‘‘মালদহ ও মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস,সিপিএম এবং বিজেপি একসঙ্গে ভোট করেছে!’’ রাজ্যের স্পর্শকাতর রাজনৈতিক আবহে অনেক হিসেব ওলট-পালট হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। কিন্তু উত্তর ও মধ্যবঙ্গে ভোট মিটে যাওয়ার পরে কংগ্রেস মনে করছে, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্তত চারটি লোকসভা আসন এ বারও ধরে রাখবে তারা।

পঞ্চায়েতে তথাকথিত সব ‘গড়’ ধূলিসাৎ হয়েছিল। লোকসভা নির্বাচনেও বুথ দখল এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে সরব কংগ্রেস। এত কিছুর মধ্যেও জেলা নেতৃত্বের পাঠানো ভোট-পরবর্তী রিপোর্টের প্রেক্ষিতে প্রদেশ কংগ্রেস মনে করছে, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ থেকে চারটি আসন তারা ঘরে তুলবে। একেবারে খুব বাজি রেখে বলতে না পারলেও আসনসংখ্যা বেড়ে পাঁচ হতে পারে, এমন আশাও করছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। শাসক দলের ‘বাধা’ মোকাবিলা করে আম জনতার ভোট দেওয়ার প্রবণতা এবং সংখ্যালঘু সমর্থনের জোরেই কংগ্রেস ভোট বৈতরণী পার হওয়ার অঙ্ক কষছে।

দলীয় রিপোর্ট অনুযায়ী, মালদহ উত্তর ও দক্ষিণ, মুর্শিদাবাদ এবং বহরমপুর আসন তারা জিতবে বলে মনে করছে কংগ্রেস। জঙ্গিপুরেও তাঁরা ‘এগিয়ে’ বলে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের দাবি। রায়গঞ্জের পরিস্থিতি অবশ্য এমনই টানটান, তা নিয়ে বিরাট কোনও দাবি কংগ্রেস নেতৃত্ব করছেন না। প্রদেশ কংগ্রেসের এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘‘চারটি আসন আমরা জিতব। তালিকা বেড়ে পাঁচও হতে পারে।’’

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

কংগ্রেসের হাতে থাকা আসনগুলির মধ্যে সব চেয়ে বেশি উত্তেজনা ছিল বহরমপুর নিয়েই। মুর্শিদাবাদের জেলা পরিষদ থেকে যাবতীয় পুরসভা, গ্রাম পঞ্চায়েত এখন তৃণমূলের হাতে। কংগ্রেসের একের পর এক বিধায়ককে দলে টেনেছে শাসক দল। তার উপরে বহরমপুরে অধীর চৌধুরীকে হারাতে কোমর বেঁধে নেমেছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শুভেন্দু অধিকারীকে। সংগঠনের জোর না থাকলেও সোমবার বহরমপুরে ভোটের দিন ‘অনিয়ম’ রুখতে দৌড়ে বেড়িয়েছিলেন অধীরবাবুই। দিনের শেষে বিধান ভবনে রিপোর্ট এসেছে, আসন বার করে নিতে পারবেন প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। অন্যান্য আসনের কিছু বুথে পুনর্নির্বাচন চাইলেও বহরমপুরে সে পথে হাঁটছেন না অধীরবাবু। তাঁর কথায়, ‘‘অন্যায় হয়েছে কিন্তু মানুষ বেরিয়ে এসে ভোটও দিয়েছেন।’’

কংগ্রেস নেতৃত্বের উৎসাহ বাড়িয়েছে বহরমপুরে রেণুকা মার্ডির মতো ভোটারের আবেগ। ভোটের লাইনে ভিড় দেখে সোমবার বাড়ি ফিরে গিয়ে রেনুকা দেখেন, তাঁর অবসাদগ্রস্ত ছেলে রজত গলায় দড়ি দিয়েছেন। লোকজন ডেকে ছেলেকে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ছেলের দেহ মর্গে রেখেই বুথে ফিরে ভোট দিয়েছেন রেণুকা। পরে বলেছেন, ‘‘ছেলেকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু ভোট দেওয়া একটা অধিকার। আমার জন্য দাদা (অধীর) হেরে গেলে সারা জীবন আফশোস থেকে যেত।’’ এমন ঘটনা শুনে মঙ্গলবার রেণুকার বাড়ি গিয়ে তাঁদের পাশে থাকার কথা বলেছেন অধীরবাবু। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ওঁদের ক্ষতি তো পূরণ করা যাবে না। কিন্তু এমন ভোটার পাওয়া গণতন্ত্র ও জনপ্রতিনিধির জন্য সৌভাগ্য।’’

আবেগের ভোটেই এ বার বিশেষ ভরসা কংগ্রেসের। 

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত