মুখ্যমন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশেই হাওড়া পুরসভায় দু’দফায় প্রায় চার হাজার অস্থায়ী কর্মী নেওয়া হয়েছিল— হাওড়া জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এমনই দাবি করলেন প্রাক্তন মেয়র রথীন চক্রবর্তী। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে বলেন, ‘‘সরকারের কোনও কাজ মৌখিক নির্দেশে হয় না। আমরা সব লিখিত ভাবে করি। আমি কবে মৌখিক ভাবে বললাম, লোক নিতে! আমার ও সব মনে নেই।’’ মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দেন, ‘‘অর্থ দফতরের অনুমোদন ছাড়া কাজ হলে আইনি ব্যবস্থা হবে। ফৌজদারি মামলা হবে। সব দফতরের সচিব ও অর্থসচিবদের বলছি, কোনও বেআইনি বিষয়ে অনুমতি দেবেন না।’’

 মমতার ধমক খেয়ে রথীন চুপ করলেও ‘মৌখিক নির্দেশে নিয়োগ’ নিয়ে বিতর্ক থামেনি। পুরসভা সূত্রের খবর, ২০১৩ সালে তৃণমূল হাওড়া পুরবোর্ডের দায়িত্বে এসে নাগরিক পরিষেবার জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করে। বছর তিনেক পরে আরও ৪১৯ জন অস্থায়ী কর্মী নেওয়া হয়। এই নিয়োগ নিয়েই সোমবার প্রশ্ন তোলেন মমতা। রথীন মুখ্যমন্ত্রীকে বলেন, ‘‘পুরসভার কর্মীসঙ্কটের ব্যাপারে আপনাকে জানিয়েছিলাম। আপনিই বলেছিলেন, স্থায়ী কর্মী দিতে পারছি না, অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করে কাজ চালিয়ে নাও।’’ নিয়োগের সময় হাওড়ায় ৫০টি ওয়ার্ড ছিল। পরে সঙ্গে বালি যুক্ত হওয়ায় আরও ১৬টি ওয়ার্ড বাড়ে। অতিরিক্ত ওয়ার্ডগুলির জন্যই ৪১৯ জনকে নিয়োগ করা হয়েছিল বলে রথীন মমতাকে জানান।

পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম ও প্রশাসনিক শীর্ষ কর্তাদের সামনেই মমতা বলেন, ‘‘যাঁদের নিয়োগ করলে, তাঁরা বেতন না পেয়ে আমার বাড়ি চলে যাচ্ছে। তোমরাই হয়তো পাঠাচ্ছ! ববিকে(ফিরহাদ হাকিমের ডাকনাম) বলছি, পুরসভাগুলোর অডিট করতে হবে।’’ ৪১৯ জন অস্থায়ী কর্মীর বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী নিজে দেখে নেবেন বলে আশ্বাস দেন। তবে রাজ্যের অন্যান্য পুরসভাতেও এ ধরনের নিয়োগসংক্রান্ত ‘ত্রুটি’ থাকলে, সেগুলির নিরসন করা যে সরকারের পক্ষে কার্যত অসম্ভব, তাও বুঝিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘হাওড়ার অস্থায়ী কর্মীদের বিষয়টি দেখে নিচ্ছি। এ বার তো অন্য পুরসভাও একই দাবি করবে। মানবিকতার দিক থেকে সব পছন্দ করি। কিন্তু ব্ল্যাকমেলিং পছন্দ করি না।’’

বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তীর কটাক্ষ, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর মুখের কথাই আইন। এ ভাবেই এই সরকার চলেছে। আর বিপাকে পড়লে মুখ্যমন্ত্রী অস্বীকার করেন।’’ রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুও বলেন, ‘‘যত বেআইনি কাজ মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে যে হয়েছে, তা তো স্পষ্ট।’’

মুখ্যমন্ত্রী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানতে চান, হাওড়ার ওলাবিবিতলায় কেন পাম্পিংস্টেশনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। কেন শহরে পানীয় জলের সমস্যা? জবাবে হাওড়ার পুরকমিশনার বিজিন কৃষ্ণ জানান, ‘‘সরকারের অনুমোদন ছাড়াই কাজটা শুরু হয়েছিল। তাই প্রায় ২২ কোটি টাকার কাজ থমকে গিয়েছে টাকার অভাবে।’’ জবাব শুনে দৃশ্যত ‘ক্ষুণ্ণ’ মুখ্যমন্ত্রী এর পরেই মন্তব্য করেন, ‘‘কলেজ ও পুরসভাগুলি একের পর এক লোক নিচ্ছে। কোনও কথা শুনছে না। অর্থ দফতরের অনুমোদন নিয়েই কাজ করতে হবে। মন্ত্রী, চেয়ারম্যান সবাইকেই এই নিয়ম মেনে চলতে হবে।’’

শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতেই মুখ্যমন্ত্রী উষ্মাপ্রকাশ করে বলেন, ‘‘শিক্ষা দফতর যে আড়াই লক্ষ লোক নিয়েছে, তা নিয়ে ঝামেলার শেষ নেই! আজ এখানে ৪০০, ওখানে ৫০০ জন বসে পড়ছেন। বিক্ষোভ করছেন।’’ শিক্ষা দফতরের জন্য তাঁর নির্দেশ, ‘‘উচ্চশিক্ষা দফতরের অনুমোদন ছাড়া কলেজগুলোকে নিয়োগপত্র দেবে না।’’