• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অর্থ লগ্নি সংস্থা বিতর্কে থাকবে তৃণমূল জমানাও

2
কালো টাকা দেশে ফেরানোর দাবিতে তৃণমূলের ধর্না। সোমবার সংসদ ভবনের বাইরে। ছবি: রমাকান্ত কুশওয়াহা

বিরোধী কংগ্রেসের দাবির কাছে শেষ পর্যন্ত মাথা নোয়াতে হল শাসক তৃণমূলকে।

সারদা-কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তৃণমূল সরকার দাবি করে আসছে, বেসরকারি অর্থ লগ্নি সংস্থার (চলতি কথায় চিট ফান্ড) রমরমা সবই বাম আমলে। সারদা নিয়ে সিবিআই তদন্তে শাসক দলের একের পর এক নেতা, মন্ত্রী, সাংসদের নাম যত জড়িয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ততই পাল্টা সুর চড়িয়ে বলেছেন, বাম আমলের পাপের বোঝা তাঁদের বইতে হচ্ছে।

এর আগে কার্যত গায়ের জোরে বিধানসভায় অর্থ লগ্নি সংস্থার কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনা রুখলেও চলতি বাজেট অধিবেশনে আচমকাই সুর পাল্টে ১৯৮০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত রাজ্যে চিট ফান্ডের কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। সেই প্রস্তাব মতো কাল, বুধবার বিধানসভায় আলোচনা হবে। এবং এ ব্যাপারে আরও সুর নরম করে ফেলেছেন সারদা কেলেঙ্কারিতে কার্যত কোণঠাসা মমতা। বিধানসভার আলোচনা তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত সময়কালেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কংগ্রেসের দাবি মেনে হাল আমল পর্যন্ত আলোচনায় সায় দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। হঠাৎ কেন তাঁর এই মত বদল, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে সব দলের অন্দরেই।

সারদার প্রতারিতদের টাকা ফেরত এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান। তাতে আইনজীবীর ভূমিকা পালন করেছিলেন সিপিএম নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য। সেই মামলার জেরেই সারদা-কাণ্ডে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সারদা নিয়ে সরব বিরোধী পক্ষকে পরিষদীয় সচিব তাপস রায় মারফৎ বিধানসভায় আলোচনার প্রস্তাব দেয় সরকার পক্ষ। তাতে বলা হয়, একটি বেসরকারি প্রস্তাব এনে ১৯৮০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত রাজ্যে যে সব অর্থ লগ্নি সংস্থার কাছে মানুষ প্রতারিত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরতের দাবি নিয়ে আলোচনা করা হবে। প্রস্তাব পেয়ে কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা মহম্মদ সোহরাব আলোচনার সময়সীমা নিয়ে আপত্তি তোলেন। তাঁর দাবি, ‘১৯৮০ সাল থেকে অদ্যাবধি’ আলোচনা করতে হবে। সরকার পক্ষ সেই দাবি মেনে নেয়। কেন? বিশেষ করে যখন ২০১৫ পর্যন্ত আলোচনা হলে তৃণমূলকে চেপে ধরার সুযোগ পেয়ে যাবেন বিরোধীরা?

কেন্দ্রীয় সরকারের কোম্পানি বিষয়ক মন্ত্রকের অধীন সিরিয়াস ফ্রড  ইনভস্টিগেশন অফিস (এসএফআইও) গত বছরের জুন মাসে জমা দেওয়া তাদের রিপোর্টে দেখিয়েছিল ২০০৯ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকে রাজ্যে তৃণমূলের প্রভাব যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে সারদার ব্যবসা। এসএফআইও-র ওই রিপোর্টে মদন মিত্র, রজত মজুমদারেরা কী ভাবে সারদার ব্যবসা বাড়াতে পরোক্ষে সাহায্য করেছিলেন, সেই তথ্যও রয়েছে। বিরোধীরা এসএফআইও, ইডি-র রিপোর্টের সূত্র ধরে তৃণমূলের আমলে সারদার শ্রীবৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় তুললে সরকার পক্ষের কাছে তা যথেষ্ট বিড়ম্বনার হতে পারে।

তা ছাড়া, ডেলো পাহাড়ে মমতার সঙ্গে সারদা-কর্তার বৈঠক নিয়ে কুণাল ঘোষের অভিযোগ, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত লাইব্রেরিগুলিতে সারদা গোষ্ঠী এবং অন্য চিট ফান্ডের সংবাদপত্রগুলি রাখার নির্দেশের মতো ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় নিয়েও বিরোধীরা কথা বলার সুযোগ পাবেন। মদন মিত্রের গ্রেফতারি, সিবিআইয়ের কাছে মুকুল রায়ের স্বীকারোক্তির জল্পনা এবং তার ভিত্তিতে মমতার সঙ্গে মুকুলের সম্পর্কে চিড় এ সব প্রসঙ্গও উঠবে অনিবাযর্র্ ভাবেই। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে যে তা মোটেই সুখকর হবে না, তা মেনে নিচ্ছেন তৃণমূলের বিধায়কদের অনেকেই।

তৃণমূলের অন্দরের বক্তব্য, এই বাস্তব পরিস্থিতি মুখ্যমন্ত্রী বিলক্ষণ জানেন। কিন্তু এখন দলের মধ্যে নানা রকম অস্থিরতা, গোলমাল চলছে। যার জেরে জনমানসে তৃণমূলের ভাবমূর্তি বিপর্যস্ত। তাই তাঁর দল এবং তিনি কতটা গণতান্ত্রিক তা বোঝাতে ঝুঁকি নিয়েও বিরোধীদের প্রস্তাবে সায় দেন মমতা। শাসক দলের প্রবীণ বিধায়কের কথায়, “দলের ভূমিকা উজ্জ্বল করতে কিছু নেতিবাচক অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়, তো হবে!”

তৃণমূল সূত্রের মতে মমতার রাজি হওয়ার আরও একটা কারণ হল, ২৪ ঘণ্টা আগেই মুকুল রায় বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন এবং প্রতারিতদের টাকা ফেরতের দাবিতে সরব হয়েছেন। এর ফলে দলনেত্রীর মনে হয়েছে, মুকুল এ সব বলার কে? মুকুল রবিবার বলেছিলেন, “শুধু সারদা কেন, যে সমস্ত চিট ফান্ডে টাকা রেখে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সকলের বিরুদ্ধেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যারা দোষী শাস্তি পাক।” মমতা সারদা-কাণ্ডে যে ভাবে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন তা নিয়েও মুকুল কটাক্ষ করেছেন। বলেছেন, “রাস্তায় নেমে এর সুরাহা হয় না। আইনি লড়াই লড়তে হয়। যদি তাঁরা আইনি লড়াইয়ে সহযোগিতা চান, আমি করতে রাজি আছি।”

তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য মনে করেন, তাঁদের সরকারই সারদা কাণ্ডে কমিশন করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত গরিব আমানতকারীদের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করেছে। আর সারদা ছাড়া যে সমস্ত অর্থলগ্নি সংস্থা আছে তাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের যে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, তা নেওয়া হয়নি।

সরকারের মত বদল নিয়ে কংগ্রেস সূত্রের ব্যাখ্যা হল, ২০১১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থা নিয়ে যা যা ঘটছে, তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ না-থাকলে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠবে, এটা বুঝেই শাসক দল তাদের আপত্তি মেনে নিয়েছে। কংগ্রেসের এক বিধায়কের কথায়, “সারদা-কাণ্ড নিয়ে সবই তো প্রকাশ্যে এসে গিয়েছে। তাই ওই ঘটনা বাদ দেওয়ার চেষ্টা হলে অহেতুক আলোচনা পণ্ড হবে। এই চাপেই রাজি হয়েছে সরকার পক্ষ।”

বামেরা কিন্তু সরকারের প্রস্তাবে সই করেনি। বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র জানান, আজ মঙ্গলবার বিধানসভার কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সরকার কী প্রস্তাব দেয়, তা দেখেই তাঁরা পদক্ষেপ করবেন। ঘনিষ্ঠ মহলে অবশ্য তিনি বলেন, “সারদা থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই সরকার এই প্রস্তাব আনছে। বাম আমলে সঞ্চয়িতা-সহ বেশ কিছু বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার কথা ওরা তুলতে চাইবে জানি। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সরকার ব্যবস্থা নিয়েছিল। এদের মতো কাউকে আড়াল করার চেষ্টা করেনি।”

অর্থলগ্নি সংস্থা নিয়ে আলোচনার দাবিতে দু’বছর আগেই বামেরা বিধানসভায় বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। সেই বিক্ষোভে তৃণমূল বাধা দিয়েছিল। আলোচনাও করতে দেয়নি। প্রতিবাদ করতে গিয়ে সিপিএম বিধায়ক গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এ বার আলোচনায় বামেরা সে প্রসঙ্গও তুলবে বলে বাম পরিষদীয় দল সূত্রের খবর। বিষয়টি নিয়ে এ দিন আলিমুদ্দিনে দলের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেন সূর্যবাবু। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মমতা যে সিপিএম নেতার বিরুদ্ধে সারদার ব্যবসার প্রসারে সাহায্য করার অভিযোগ তুলেছিলেন, সেই সুজন চক্রবর্তী এ দিন বলেন, “বিধানসভায় কী হবে বাম পরিষদীয় দল তা ঠিক করবে। তবে এখনও মুখ্যমন্ত্রী আমার চারটি প্রশ্নের জবাব দেননি। সারদা থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই ওরা যে বামফ্রন্টের আমলের প্রসঙ্গও টানছে, তা সকলের কাছেই স্পষ্ট।”

তবে ঘটনা হল, অর্থলগ্নি সংস্থার কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনার জন্য সময় বরাদ্দ হয়েছে মাত্র এক ঘণ্টা। ফলে শেষ পর্যন্ত বর্ষণ কতটা হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন