সরস্বতী পুজোয় যেমন বই ছুঁতে নেই, বিশ্বকর্মা পুজোয় আগুন জ্বলে না কামারশালায়। 

এমন নিষেধ অবজ্ঞা করে বিশ্বকর্মার তোপের মুখে পড়লেন কতিপয় কুমোর। ‘কাজ না-করলে খাব কী!’ শুনে বিশ্বকর্মা নাকি রেগে বলেন, ‘‘যে টুকু কাজ করবি, সেটুকুই খাবি। একটুও বাড়তি থাকবে না।’’ মিস্ত্রি-কারিগরেদের মুখে-মুখে ঘোরে, ব্রহ্মা কী কারণে বিশ্বকর্মাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। প্রচলিত কিংবদন্তী-উপকথাতেই মালুম, দেশের শ্রমিকেরা বরাবরই ‘দিন আনি-দিন খাই’। বাণিজ্যে লাভের আশায় থাকা শিল্পপতিদের আরাধ্য গণেশের সঙ্গে দেবশিল্পীর ফারাকটাও এই গল্পে স্পষ্ট। 

এখনকার গার্ডেনরিচ-হাইড রোড থেকে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল জুড়েই বিশ্বকর্মা পুজোর টিমটিমে দশা। দিন কয়েক আগে গণেশপুজোর হই-হুল্লোড়ের পাশে বসালে ভাদ্র শেষের পুজো নিষ্প্রভ। কুমোরটুলির মিন্টু পাল আকর্ণ হাসেন, ‘‘আমার গণপতি এ বার ওয়েস্ট ইন্ডিজ় গেলেন! মায়ের সঙ্গে নয়, একা-একাই।’’ এখনও কলকাতার তাবড় সব দুর্গাপুজোয় নাকতলা থেকে দমদম পার্কে থিম-শিল্পীর কারিগরেরা নিজেদের জন্য ছোটখাটো বিশ্বকর্মা পুজো করেন। শারদীয়ার আগে পটুয়াপাড়ার শিল্পীদের জীবনে তবু খুশির হাওয়া বয়ে এনেছেন সেই গণপতি। টালার পালপাড়ার দেবু পরিখা বলছিলেন, ‘‘ছ-সাত ফুটের গণেশ-বিশ্বকর্মা মাথায় সমান হলেও গণেশের দাম চার গুণ বেশি।’’ কুমোরটুলির জয়ন্ত পাল, মহাদেব পালেদের ঘরে বিশ্বকর্মার কাটতি সিকি ভাগে নেমে এসেছে। তার তিন গুণ পসার ছিল গণেশের। 

উত্তর কলকাতার মন্ত্রীমশাই সাধন পান্ডে এলাহি গণেশপুজো করেছিলেন। বললেন, ‘‘মেয়ে মুম্বইয়ে থাকার সময় থেকেই আমাদের গণেশভক্তি বেড়েছে। ওর ইন্টিরিয়র ডিজ়াইনিংয়ের অফিসে বিশ্বকর্মা পুজোও হয় বটে, তবে ছোটখাটো!’’ বিশ্বকর্মা এখন পাড়ার রিকশা স্ট্যান্ড বা বাসগুমটিতেই টিকে। বাঙালি মহল্লাতেও গণেশপুজোর নতুন-নতুন দল কিন্তু গজাচ্ছে।

জগদ্দলের বন্ধ আলেকজ়ান্ডার চটকলের কেয়ারটেকার বিজয় সিংহের স্মৃতিতে শিল্পাঞ্চলে দু’দশক আগে বিশ্বকর্মার রমরমা। জমাটি জলসা। চন্দননগরের লাইটিং! দেদার মাংসভাত। গার্ডেনরিচের জিইসি, পোদ্দার প্রজেক্ট, মেটালবক্স, বেঙ্গল ইনগটের ‘শবদেহ’গুলিও যেন 

বিষাদমূর্তি। কারখানায় যন্ত্রের আধুনিকীকরণ বা কর্মী ছাঁটাইয়েও বিশ্বকর্মার জৌলুস কমেছে। আসানসোলের তৃণমূল নেতা অনিমেষ দাস তাজ্জব: বাজার থেকে রাজপথ বারোয়ারি গণেশপুজোর রমরমা বেড়েছে হঠাৎই। বিশ্বকর্মা কারখানাবর্তী। 

শহরের বণিকসভাগুলির কর্তারা গণেশ বা বিশ্বকর্মা কাউকেই চটাতে চান না। নির্মাণ-শিল্প মার খেলে তো শ্রমিকদের দেবতার পসার কমবেই। আর গণেশ হলেন সিদ্ধিদাতা, সব কাজ, ব্যবসা, পুজোর সঙ্কল্পেই তাঁকে চাই। দিকে দিকে গণেশের গতি দুর্দমনীয়, তবু বিশ্বকর্মা-সংস্কৃতির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে কয়েক দশক আগে এক আশ্চর্য ভারতবর্ষের হদিস পান ভাস্কর মীরা মুখোপাধ্যায়। ইলোরার বৌদ্ধ গুহা বিশ্বকর্মার নামে। লোকবিশ্বাসের বিশ্বকর্মা কখনও ব্রহ্মা বা রাবণ। আবার গ্রামের পীর বা গাজিসাহেবের শিষ্য বিশ্বকর্মা হজে যান। গাজিসাহেবের নির্দেশেই তিনি ঘুড়ির মহিমা প্রচার করেন। ধর্মঠাকুরের পুজোর বাণাষ বা সমুদ্রমন্থনের অনন্তনাগের মধ্যেও সংস্কৃতিবিদেরা বিশ্বকর্মার ছায়া দেখেছেন। 

পলাশির ছোটকুলবেড়িয়া গ্রামের উজ্জ্বল শেখকেও বিশ্বকর্মায় মাটি-কাটা গাড়িটার পুজো সারতে হবে। স্রেফ ছুতোর-কামারের যন্ত্র নয়, ট্র্যাক্টর, ‘শ্যালোপাম্প’টিও পুজো পাবে।  আবার বিশ্বকর্মাতেই ভক্ত ও ভগবান মিশে যায়। বিশ্বকর্মার উপাসকও লোকমুখে বিশ্বকর্মা আখ্যা পেয়েছেন। গার্ডেনরিচের বাসিন্দা, শ্রমিক রাজনীতিতে পোড়খাওয়া কুশল দেবনাথ বলছিলেন, ‘‘কারখানার সব ধর্মের লোককে মিলিয়ে দিতে বিশ্বকর্মার জুড়ি ছিল না।’’

পুজোয় গণেশের কাছে হারতে পারেন,  ধর্ম-রাজনীতির টানাপড়েনের দিনে বিশ্বকর্মা কিন্তু সম্প্রীতির দেশকেও বহন করছেন।