ধুলো আর রক্তের ছিটে লাগা যে ব্যাগটা পড়েছিল পালবাড়িতে তার মালিকানা নিয়ে সন্দেহটা থেকেই গিয়েছিল পুলিশের। সপরিবার বন্ধুপ্রকাশ পাল খুনের তদন্তে উৎপল বেহেরাকে জেরার সময়েও আলগোছে জি়জ্ঞাসা করা হয়েছিল,

—‘হ্যাঁ রে, এই ব্যাগটা চিনতে পারছিস?’

আর পাঁচটা প্রশ্নের যেমন সহজ, নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিয়ে আসছিল সে, তেমনই ভাবলেশহীন মুখে এক বার আড়চোখে ব্যাকপ্যাকটি দেখে নিয়ে উৎপল জানিয়েছিল, না। ব্যাগ সে চিনতে পারছে না। তদন্তকারীদের এক জনের সন্দেহ তবুও কাটেনি। 

ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বার কয়েক প্রশ্ন এবং একই উত্তর পাওয়ার পরেও ওই অফিসার নিজের মোবাইলে সেই ব্যাগের ছবিটা তুলে নিয়েছিলেন। তার পরে সেই ছবি তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এগরায় উৎপলের কর্মস্থলে। সেখান থেকে  কিছুক্ষণের মধ্যেই উৎপলের এক সহকর্মীর কাছ থেকে খবর আসে— এ ব্যাগ উৎপল বেহেরার। তখনও জেরা চলছে। পুলিশের কাছে ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে, মিথ্যে বলছে উৎপল। কারণ, তার খানিক আগেই টাওয়ার লোকেশন ধরে পুলিশ জেনে গিয়েছে, দশমীর সকালে জিয়াগঞ্জেই ঘোরাফেরা করেছিল সে। কিন্তু পুলিশকে উৎপল জানিয়েছিল, সে ছিল সাদরগিঘিতে মোবাইলের দোকানে। 

আরও একটি বিষয় পুলিশকে ভাবাচ্ছিল। তা হল পালবাড়িতে পড়ে থাকা এক পাটি চটি। জেরার ফাঁকেই এক অফিসার উৎপলকে চটিটা পরতে বলেন। দেখা যায়, একেবারে মাপে মিলে যাওয়া পা। তদন্তকারীরা খেয়াল করে দেখেন, উৎপলের পায়ে তখন নতুন একজোড়া চটি। দু’য়ে দু’য়ে চার করতে সময় লাগেনি পুলিশের। কড়া ধমক দিয়ে এক পুলিশকর্তা এ বার বলে ওঠেন, ‘অনেক মিথ্যে বলেছিস। এ বার সত্যিটা বল।’ নিমেষে ভেঙে পড়ে উৎপল বেহেরা।  

পুলিশ প্রথম দিকে খুনের ধরন দেখে চমকে উঠেছিল। কোনও পেশাদার খুনি এ কাজ করতে পারে এমন ভাবনা থেকে জিয়াগঞ্জ খুনের মামলায় লালবাগ মহকুমা-সহ জেলার বিভিন্ন এলাকার দুষ্কৃতীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছিল পুলিশ। এমনকি বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এলাকার কয়েক জন কসাইকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। সেই সঙ্গে পরিবারের লোকজন থেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-পরিচিতদের ডেকে ঘটনার পর থেকে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ। এমনকি বন্ধুপ্রকাশের বন্ধু সৌভিক বণিককেও দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের যখন দিশেহারা অবস্থা ঠিক তখনই ব্যাগ, চটি ও টাওয়ার লোকেশনের মতো কয়েকটি বিষয় পুলিশকে দিশা দেখায়।

পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার বলেন, ‘‘পঞ্চমীতে বোনের বাড়ি পোশাক দিতে এবং নবমীতে পুজো দেখতে যাওয়ার কথা বলেছিল উৎপল। কিন্তু দশমীর দিন ওর মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ থাকলেও ও সেদিন সাগরদিঘি থাকার কথা বলেছিল। এই মিথ্যা কথা ছাড়াও উদ্ধার হওয়া ব্যাগ, চপ্পল, রক্তমাখা বিমার কাগজের সূত্র ধরেই আমরা উৎপলকে গ্রেফতার করি।’’ জেরায় উৎপল পুলিশকে জানিয়েছে, দশমীর দিন দরজা খুলে পিছন ফিরে বন্ধুপ্রকাশ দু’পা সামনে এগোতেই ব্যাগ থেকে অস্ত্র বের করে সে কোপ মারতে শুরু করে। বন্ধুপ্রকাশ পড়ে যান। এর পরে অন্য ঘরে গিয়ে সে দেখে, খাটের পাশে বন্ধুপ্রকাশের স্ত্রী বিউটি ও ছেলে অঙ্গন দাঁড়িয়ে আছে। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রথমে বিউটিকে ও পরে অঙ্গনকে কোপাতে থাকে।

পুলিশের দাবি, ঘটনার দিন বিউটির মোবাইল থেকে ১২.০৩ মিনিটে এক জনকে হোয়াটসঅ্যাপ করা হয়েছিলেন। ১২.০৬ মিনিটে ভিডিয়ো কল করা হয়েছিল। এর মধ্যে দুধওয়ালা দরজা টোকা দিয়েও বাড়ির কারও সাড়া না পেয়ে ১২.১১ মিনিটে দুধওয়ালা কল করেছিলেন। কিন্তু সেই ফোন কেউ রিসিভ না করায় দুধওয়ালা বাড়ির জানালা দিয়ে দেখেন, দেহ পড়ে আছে। মোবাইলের এই তথ্য ধরে পুলিশের ধারণা ১২.০৬ মিনিট থেকে ১২.১১— এই পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিন জনকে খুন করা হয়।

বন্ধুপ্রকাশের উপর না হয় রাগ ছিল। কিন্তু তাঁর অন্তসত্ত্বা স্ত্রী ও ছেলেকে খুন কেন? উৎপল জানায়, বন্ধুপ্রকাশকে খুন করার পরে তার মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল। তাই তাদেরও সে খুন করে।