প্রশ্নটা অনেক দিন ধরেই ঘুরছিল ডিভিসি-র অন্দরে। পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে ডিভিসি-র নির্মীয়মাণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকানা কি সত্যিই বদল হতে চলেছে?

বৃহস্পতিবারই কলকাতায় আর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এনটিপিসি-র চেয়ারম্যান অরূপ রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, রঘুনাথপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি শীঘ্রই তাঁরা অধিগ্রহণ করতে চলেছেন। এ নিয়ে সংস্থা কর্তৃপক্ষ তাঁদের পরিচালন পর্ষদের কাছে প্রস্তাব পেশ করতে চলেছেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এ বার একযোগে মাঠে নামল ডিভিসি-র কর্মী ও শ্রমিক সংগঠনগুলি। সংগঠনের সদস্যেরা ডিভিসি-র বিরুদ্ধে রীতিমতো স্লোগান দিলেন, ‘রঘুনাথপুরকে হস্তান্তর করতে গেলে ধোলাই হবে পেটাই হবে’!

প্রথম থেকেই রঘুনাথপুরে ডিভিসি-র নির্মীয়মাণ তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প এনটিপিসি বা অন্য কোনও সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি জানিয়ে এসেছে ডিভিসি-র বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মী-সংগঠনগুলি। এ বার সংগঠনগুলি জোট বেঁধে তৈরি করেছে ‘জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি’। শুক্রবার দুপুরে রঘুনাথপুরের প্রকল্পে বিক্ষোভ-অবস্থান করেন ওই কমিটি সদস্যেরা। এই প্রকল্প কোনও অবস্থাতেই অন্য কোনও সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া যাবে না, এই দাবিতে ডিভিসি-র চিফ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে ওই কমিটি। রাজনৈতিক বিবাদ দূরে সরিয়ে রেখে এই কমিটিতে সামিল হয়েছেন বাম (সিপিএম) প্রভাবিত শ্রমিক সংগঠন সিটু, তৃণমূলের আইএনটিটিইউসি, আরএসএস প্রভাবিত বিএমএস এবং ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। কংগ্রেস প্রভাবিত আইএনটিইউসি এখনও কমিটিতে যোগ দেয়নি।

জমি-জট ও আর্থিক সঙ্কট-সহ নানা কারণে এমনিতেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রঘুনাথপুর প্রকল্প। এই পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রূপায়িত করার কথা ভেবেছে কেন্দ্র। ডিভিসি সূত্রের
খবর, রঘুনাথপুর প্রকল্প অধিগ্রহণ করা যায় কি না, তা বিদ্যুত্‌ মন্ত্রক এনটিপিসি-কে খতিয়ে দেখতে বলেছিল। মে মাসে রঘুনাথপুর প্রকল্প পরিদর্শনে আসে এনটিপিসি-র প্রতিনিধিদল। সম্প্রতি ডিভিসি-র পরিচালন পর্ষদের সভায় প্রকল্প এনটিপিসি-র হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে।

ওই সভার পরেই তড়িঘড়ি রঘুনাথপুরের প্রকল্প ‘বাঁচাতে’ তৈরি হয়েছে ‘জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি’। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে ডিভিসি-র ন’টি প্রকল্পের কর্মী ও শ্রমিকেরা জোট বেঁধেছেন। এ দিন রঘুনাথপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল গেটের বাইরে বিক্ষোভ-অবস্থান করেন ডিভিসির ঝাড়খণ্ডের পাঞ্চেত, মাইথন, বোকারো এবং এ রাজ্যের দুর্গাপুর, মেজিয়া, অন্ডাল প্রকল্পের কর্মীরা। আগের মাসে রঘুনাথপুরে এসে এনটিপিসির আধিকারিকেরা ‘গো-ব্যাক’ স্লোগান শুনেছিলেন ডিভিসি-র কর্মীদের মুখে। এ দিন একধাপ এগিয়ে বিক্ষোভে ডিভিসি-র শীর্ষ কর্তৃপক্ষর বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছে, ‘রঘুনাথপুর বিক্রি করা চবে না। করতে গেলে ধোলাই হবে পেটাই হবে’। বিক্ষোভকারীদের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘গো ব্যাক এনটিপিসি’। একই পোস্টার এ দিন পড়েছে কলকাতায় ডিভিসি-র সদর দফতর ‘ডিভিসি টাওয়ারে’।

অবস্থানে সামিল সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ বাসুদেব আচারিয়া বলেন, ‘‘ডিভিসিকে দেখেই এলাকার বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছেন। তাই এই প্রকল্প ডিভিসিকেই রূপায়িত করতে হবে।” আদ্রায় রেলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বা কাটোয়ায় এনটিপিসি-র প্রকল্পের হাল নিয়ে কটাক্ষ করে তাঁর বক্তব্য, ‘‘দুই জেলায় নিজেদের প্রকল্প রূপায়ণ করতে সমস্যায় এনটিপিসি। রঘুনাথপুর তাদের দিলে সব সমস্যার সমাধান হবে, এটা অবাস্তব চিন্তা।” জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির আহ্বায়ক তথা বিএমএস নেতা বংশীধর পাণ্ডে বলেন, ‘‘রঘুনাথপুর ডিভিসির সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এখান থেকে বাণিজ্যিক ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে ডিভিসি লাভবান হবে। সংস্থার স্বার্থেই এই প্রকল্পের হস্তান্তর রুখতে বদ্ধপরিকর কর্মীরা।’’ তিনি জানান, চলতি মাসে হাজারিবাগে আসার কথা প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কাছেও সিদ্ধান্ত বদলের আবেদন জানানো হবে।

ডিভিসি-র এক পদস্থ কর্তা অবশ্য জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কেন্দ্রের পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি প্রয়োজন। কারণ, ডিভিসি-তে ওই দুই সরকারেরই অংশীদারি রয়েছে। এনটিপিসি কর্তাদের একাংশ জানিয়েছেন, কেন্দ্র বলেছিল বলেই তাঁরা রঘুনাথপুরের প্রকল্প নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এখন যদি এনটিপিসি-র বিরুদ্ধেই কর্মী-বিক্ষোভ শুরু হয়, তাতে তাঁদের কিছু করার নেই।