• মধুমিতা দত্ত  ও আর্যভট্ট খান
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘এক দেশ এক পাঠ্যক্রমে নষ্ট হবে শিক্ষার তাগিদ’

education
প্রতীকী ছবি।

দেশ এক। তবে বৈচিত্রকে অঙ্গীকার করেই তো সেই ঐক্য। তা হলে ‘এক দেশ এক পাঠ্যক্রম’ হবে কী ভাবে?

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা অনুমোদিত জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে হাজারো প্রশ্নের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছে এই প্রশ্নটিও। ওই নীতিতে বলা হয়েছে, পাঠ্যক্রম তৈরি হবে কেন্দ্রীয় ভাবে। সেই পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পড়াতে হবে সব রাজ্যকে। প্রশ্ন উঠছে, এই ‘এক দেশ এক পাঠ্যক্রমে’ আদৌ কতটা শিখতে পারবে পড়ুয়ারা? কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, দমন-দিউ থেকে নাগাল্যান্ড যে-বিচিত্রতার সূত্রে বাঁধা, অভিন্ন পাঠ্যক্রমে তা রক্ষিত হবে কী ভাবে? এক পাঠ্যক্রম থেকে পৃথক পৃথক রাজ্যের পড়ুয়ারা শিক্ষাসার আত্মস্থ করবে কী করে?

রাজ্য পাঠ্যক্রম কমিটির চেয়ারম্যান অভীক মজুমদার জানান, সাধারণত পাঠ্যক্রম এমন ভাবে তৈরি করা হয়, যাতে পড়ুয়ারা আগে নিজের রাজ্যকে চেনে। তার পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য রাজ্য এবং বাইরের দুনিয়াকে চিনতে শেখে। বাংলার পড়ুয়াকে যদি প্রথমেই পড়ার বইয়ে অজয় নদকে না-চিনিয়ে যমুনা নদীকে চিনতে বাধ্য করানো হয়, তা হলে নদীমাতৃক বঙ্গের কতটুকু আত্মস্থ করতে পারবে সে? পাঠ্যক্রম আত্মস্থ করতে না-পারলে তাকে মুখস্থ করার উপরে জোর দিতে হবে। ‘‘নতুন শিক্ষানীতিতে মুখস্থ না-করে পড়ার আনন্দে পড়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তো মুখস্থ করার উপরেই জোর দিতে বাধ্য হবে পড়ুয়ারা। এতে অচিরেই পড়ুয়াদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা প্রবল,’’ বলেন অভীকবাবু।
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখিয়েছিল, সারা দেশেই প্রাথমিক শিক্ষার ছবিটা অত্যন্ত বিবর্ণ। সেই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ২৪টি রাজ্যের ২৬টি গ্রামীণ জেলার প্রথম শ্রেণির মাত্র ১৬% পড়ুয়া পাঠ্যবইয়ের বাক্য পড়তে পারে। ৪০% পড়ুয়া অক্ষর ভালমতো চিনতে পারে না। মাত্র ৪১% পড়ুয়া দুই সংখ্যার অঙ্ক চিনতে পারে। কিছু শিক্ষাবিদ প্রশ্ন তুলেছেন, প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র যেখানে এত অনুজ্জ্বল, সেখানে সারা দেশে সকলের জন্য এক পাঠ্যক্রম কতটা কার্যকর হবে? আদৌ কতটুকু শিখতে পারবে পড়ুয়ারা?

রাজ্য শিক্ষা কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সমীর ব্রহ্মচারীর মতে, নিচু ক্লাসে অর্থাৎ প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ‘এক দেশ এক পাঠ্যক্রম’ কাম্য নয়। বিশেষ করে ইতিহাস বা ভূগোলের ক্ষেত্রে দেশ জুড়ে এক পাঠ্যক্রম চালু হলে পড়ুরায়া উৎসাহ হারাতে পারে। সমীরবাবু বলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকে রাজ্যের ইতিহাস এবং ভূগোল জেনে নেওয়াটা বেশি জরুরি। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের কারণ ছোটবেলায় পড়ানো হলে পড়ুয়াকে মুখস্থই করতে হবে।’’

আরও পড়ুন: শিক্ষা: বিস্তর প্রশ্ন মোদীর দাবি ঘিরে

সমীরবাবু এবং কয়েক জন মিলে টেলিফোনের মাধ্যমে পঠনপাঠনের উদ্যোগ ‘সহজপাঠ’ শুরু করেছিলেন। তাঁরা এক সমীক্ষায় দেখেছেন, সব পড়ুয়াকে যদি প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়, তা হলে তার পড়াশোনার মান উন্নত হয়। নতুন শিক্ষানীতিতে অনলাইন প্রশিক্ষণের উপরে জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পরিকাঠামো সর্বত্র পৌঁছে দিতে পারা গিয়েছে কি? সেই পরিকাঠামোর ব্যবস্থা না-করে যদি অনলাইন-পাঠের উপরে জোর দেওয়া হয়, তা হলে সব ছাত্রছাত্রী কিন্তু সুযোগ পাবে না।

প্রতীচী ট্রাস্টের গবেষক সাবির আহমেদ মনে করেন, নয়া পাঠ্যক্রমে বৈচিত্রের কোনও স্থান থাকবে না। জোর করে পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দেওয়া হবে দেশের সব ছাত্রছাত্রীর উপরে। বাধ্য হয়েই মুখস্থবিদ্যার উপরে জোর দিতে হতে পারে পড়ুয়াদের। ‘‘নতুন শিক্ষানীতি তৈরির আগে শিক্ষকদের মতামত নেওয়া হয়েছে কি? সকলের অভিমত নিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরি করলে সেটা পড়ুয়াদের বেশি উপযোগী হত,’’ বলেন সাবির।

শিক্ষাবিদ তথা মডার্ন হাইস্কুল ফর গার্লসের ডিরেক্টর দেবী কর বলেন, ‘‘প্রতিটি রাজ্যের ভাবধারা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আলাদা। সব কিছু এক করে দেওয়া ঠিক নয়।’’ তবে তিনি মনে করেন, নতুন শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার উপরে যে-ভাবে নজরদারি বা মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে, সেটা ভাল। ‘‘মূল্যায়নের নামে শিক্ষা ব্যবস্থা বেশি পরীক্ষা-নির্ভর হয়ে গেলেও কিন্তু সমস্যা হতে পারে। পড়ুয়ারা মুখস্থ করার উপরেই বেশি জোর দিয়ে ফেলতে পারে,’’ বলেন দেবী কর।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন