শেষলগ্নে এসে ভোটের বিষয় হয়ে গেলেন বিদ্যাসাগর! এই নিয়ে তুমুল রাজনৈতিক চাপানউতোরও চলল শাসক, বিরোধী সব দলে। একই সঙ্গে চলল এই ঘটনার বিরোধিকা করে পদযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল। প্রশ্ন ওঠে, বিদ্যাসাগরই বা নিশানা কেন? এই অঞ্চলের অনেক বিশিষ্ট মানুষের মতে, আধুনিক বাঙালির মেরুদণ্ড বিদ্যাসাগর। এই মূর্তি ভাঙাকে তাই তাঁরা বাঙালির মেরুদণ্ডে আঘাত বলেই ব্যাখ্যা করছেন। পাশাপাশি বলছেন, এই ঘটনা একই সঙ্গে লজ্জা, ঘৃণা এবং ভয়, তিনটেই হচ্ছে। 

কথায় বলে, লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, তিন থাকতে নয়। বিশিষ্টজনেরা কেউ কেউ বলছেন, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙায় একাধারে লজ্জা হচ্ছে, ঘৃণা হচ্ছে, আর ভয়ও লাগছে। ‘‘এ কোন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা,’’ প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।  

এ বছরই ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মের দু’শো বছর পূর্ণ হচ্ছে। প্রতিবাদ মিছিলে সেই প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। কোচবিহারের সাগরদিঘির পাড়ে এ দিন বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।  বিদ্যাসাগর জন্ম দ্বিশত বার্ষিকী উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে চরমতম শাস্তির দাবি করে। এআইডিএসও ধিক্কার দিবস পালন করে। বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ জানানো হয়। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, “রাজ্যের বাইরে থেকে ভাড়া করা দুষ্কৃতী এনে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে বিজেপি। বাংলার মানুষ এটা মেনে নেবে না।” বিজেপির কোচবিহার জেলার সভানেত্রী মালতী রাভা বলেন, “সাহস থাকলে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা হোক। এটা ষড়যন্ত্র।” আজ, বৃহস্পতিবার একাধিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিহ সংগঠন আন্দোলন করবে।

বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে বুধবার সকাল থেকেই জলপাইগুড়িতে প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিভিন্ন মহল। এ দিন সকালে জলপাইগুড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের আঙিনায় বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ছাত্র যুবরা। তৃণমূলের ছাত্র নেতারা এ দিন বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার তীব্র প্রতিবাদ জানান। বিকেলে তৃণমূল ও যুব তৃণমূল প্রতিবাদ মিছিলও করেন শহরে। এ দিন দুপুরে বামপন্থী শিক্ষক সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থার সদস্যরাও বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। জলপাইগুড়ি জেলা বামফ্রন্টের তরফে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে ধিক্কার মিছিল হয়েছে। রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির তরফেও মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। মালবাজার এবং ক্রান্তি এলাকায় পৃথক ভাবে প্রতিবাদ করে তৃণমূল। ক্রান্তিতে ব্লক তৃণমূলের উদ্যোগে সন্ধ্যায় ধিক্কার মিছিল আয়োজিত হয়। সেই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্রান্তি ব্লক তৃণমূল সভাপতি শ্যামল বিশ্বাস।  মালবাজারের টাউন যুব তৃণমূলের পক্ষে সন্ধ্যায় ঘড়িমোড়ে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয়। যুব সভাপতি কৌশিক দাসের নেতৃত্বে এই অবস্থান বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়ে পুর চেয়ারম্যান স্বপন সাহা এবং টাউন তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতি অমিত দেরাও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দেন। সিপিএমের মালবাজার এলাকা কমিটির পক্ষ থেকে পথসভা হয়। 

কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে প্রতিবাদে সরব হয়েছে আলিপুরদুয়ারও। এ দিন সকাল থেকেই এর প্রতিবাদে আলিপুরদুয়ার জেলার বিভিন্ন জায়গায় মিছিল শুরু হয়।  আলিপুরদুয়ার জংশনের লিচুতলা থেকে মিছিল বের করে সিপিএম। মিছিলটি যায় আলিপুরদুয়ার জংশন পর্যন্ত। বিকেলে দলের জেলা কমিটির পক্ষ থেকে আলিপুরদুয়ার শহরে একটি মিছিল বের করা হয়। সিপিএম জেলা পার্টি অফিস থেকে কোর্ট মোড় পর্যন্ত যাওয়ার মধ্যে মিছিলটি মিলন সংঘ ক্লাবের সামেন বক্সা ফিডার রোডে দাঁড়ায়। সেখানে বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মাল্যদান করা হয়। ফালাকাটায় এবিটিএ, এবিপিটিএ, লেখক শিল্পী সংঘ-সহ বিভিন্ন সংগঠন একযোগে প্রতিবাদ মিছিল করে। হয় পথসভাও। এবিটিএ-র জেলা সভাপতি অনিন্দ্য ভৌমিক জানান, আজ বৃহস্পতিবারও সংগঠনের তরফে আলিপুরদুয়ারে প্রতিবাদ মিছিল হবে৷ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে তৃণমূলের তরফে সন্ধ্যা থেকে জেলার বিভিন্ন জায়গায় ফ্লেক্স লাগানো শুরু হয়েছে। দলের জেলা সভাপতি মোহন শর্মা বলেন, ফ্লেক্সে বিজেপির কর্মকাণ্ডকে তুলে ধরা হচ্ছে। বিজেপির জেলা সভাপতি গঙ্গাপ্রসাদ শর্মা পাল্টা বলেন, “নিজেরাই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে বিজেপির নাম জড়িয়ে রাজনীতি করছে তৃণমূল।”