গত জানুয়ারি মাসে মহম্মদবাজারে ‘অনুমতি না নিয়ে’ সভা এবং উস্কানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে লকেট চট্টোপাধ্যায় সহ বিজেপির ৬ নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক জামিন-অযোগ্য ধারায় মামলা করেছিল পুলিশ। এ বার আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে সেই বক্তব্যের সঙ্গে অভিযুক্তদের গলার স্বর মিলিয়ে দেখতে নমুনা সংগ্রহ করল পুলিশ।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টো নাগাদ সিউড়ির বিচারবিভাগীয় ম্যাজিষ্ট্রেট (ফার্স্ট কোর্ট) সৌম্য চট্টোপাধ্যায়ের এজলাসে জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক কালোসোনা মণ্ডল এবং মহম্মদবাজার অঞ্চলের নেতা সন্তোষ ভাণ্ডারির  স্বরের নমুনা নেওযা় হযেছে। এ কথা জানান মামলার সরকারি আইনজীবী চন্দ্রনাথ গোস্বামী। তিনি বলেন, ‘‘এই মামলায় আরও কয়েক জনের গলার স্বরের নমুনা নেওয়া বাকি। সেই তালিকায় লকেট চট্টোপাধ্যায়ও রয়েছেন।’’

গত ৭ জানুয়ারি মহম্মদবাজার থানার শ্রীকান্তপুরে দলীয় সভায় পুলিশ-প্রশাসন, শাসক দলকে হুমকি দেওয়া ও প্ররোচনামূলক বক্তব্যের অভিযোগ বিজেপির মহিলা মোর্চার রাজ্য সভানেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়, জেলা সভাপতি রামকৃষ্ণ রায়, জেলা সাধারণ সম্পাদক কালোসোনা মণ্ডল-সহ ৬ নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক জামিন-অযোগ্য ধারায় মামলা করে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ।

 দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

পুলিশের অভিযোগ ছিল, ওই জনসভায় কালোসোনাবাবু বলেন, ‘‘পুলিশকে ভাল ভাবে বললে কথা শুনবে না। ওদেরকে মারলে ওরা কথা শুনবে। তাই পুলিশকে মারুন! প্রশাসন কিছু করতে পারবে না।’’ ওই মঞ্চ থেকেই লকেট নাম না করে জেলা তৃণমূলের সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের সমালোচনা করে বলেন, ‘‘জেলার এক দাদা আছে, যে মহিলাদের সম্মান দিতে জানে না। তাকে নাকি সবাইকে মানতে হবে! সব ভেঙে দিন, গুঁড়িয়ে দিন। প্রশাসন কিছু করতে পারবে না। বাঁচার তাগিদে সবাইকে রাস্তায় নেমে অস্ত্র ধরতে হবে।’’ পুলিশের অভিযোগ, ওই সভায় হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন বিজেপি নেত্রী অনামিকা ঘোষও। তিনি বলেছিলেন, ‘‘দাদাগিরি চলবে না। কোনও তৃণমূল কর্মী বিজেপি কর্মীদের চোখ রাঙালে সেই চোখ আমি উপড়ে নেব! কেউ বিজেপি কর্মীদের গায়ে হাত দিলে হাত ভেঙে দেব।’’

ঘটনার পরেই জেলার পুলিশ সুপার শ্যাম সিংহ জানিয়েছিলেন, বিজেপির সভায় বক্তব্যের ভিডিয়ো ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। খতিয়ে দেখে ধারা প্রয়োগ করা হবে। 

অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবী  সোমনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আগেই জজ কোর্ট থেকে আগাম জামিন পেয়েছেন সকলে। পুলিশ তাঁদের মিথ্যা মামালায় ফাঁসিয়েছে বলেই মিলেছে জামিন। মামলার তদন্তকারী অফিসার অভিযুক্তদের  আসল স্বর রেকর্ড করার আর্জি আদালতে জানিয়েছেন। সহযোগিতা করতেই স্বেচ্ছায়  তাঁরা  তাঁদের গলার স্বরের নমুনা দিয়েছেন।’’

বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, সামনের সপ্তাহে  আদালতে একই কারণে হাজির থাকবেন লকেটও। এদিন স্বরের নমুনা দেওয়ার পরে কালোসোনা মণ্ডল বলেন, ‘‘সে দিন যা বলেছি, আইনের মধ্যে থেকেই বলেছিলাম। কোনও অন্যায় করিনি। তা হলে স্বরের নমুনা দিতে সমস্যা কোথায়?’’ 

অনুমতি না নিয়ে সভা এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য পেশের অভিযোগে বিজেপি-র বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিল পুলিশ। হলও তাই। 

মামলা হওয়ার পরে প্রতিক্রিয়া জানতে চেষ্টা করেও লকেটের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় নি। তবে দলের জেলা বিজেপি সভাপতি রামকৃষ্ণবাবুর বক্তব্য, ‘‘আমি সভার শেষ ভাগে পৌঁছেছিলাম। তার পর কাউকে কোনও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে শুনিনি।’’ অন্য দিকে, কালোসোনাবাবুর দাবি, তিনি যা বলেছেন, আইনের মধ্যে থেকেই বলেছেন। তবে তিনি কিছু বললেও যাঁরা কিছুই বলেননি, তাঁদের বিরুদ্ধেও জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করেছে পুলিশ। তাঁর আরও অভিযোগ, ‘‘আসলে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে চাপে রাখতে পারলে মহম্মদবাজার ব্লকের ‘টাই’ হওয়া রামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত হাতে পেতে সুবিধা হবে বলে ধারণা শাসকদলের। পুলিশ দায়িত্ব নিয়ে সেই কাজটাই করেছে। যদিও এ সব করে লাভ কিছু হবে না।’’ 

বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ মানতে নারাজ জেলা পুলিশ। পুলিশকর্তাদের একাংশের কথায়, ‘‘বোমা মারো বলার পরে যদি অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, তা হলে কেন বিজেপি নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে হবে না? উস্কানিমূলক বক্তব্যের অভিঘাত ধরেই ধারা প্রয়োগ হয়েছে।’’ পুলিশের আরও দাবি, অনুমতি  না থাকা সত্ত্বেও শ্রীকান্তপুরে বিজেপি জনসভার আয়োজন করে। 

দলের স্থানীয় নেতা ফণীভূষণ রায়, সন্তোষ ভাণ্ডারি এবং কিছুদিন আগে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করায় অভিযুক্ত সিউড়ির নির্মল মণ্ডলের নামও রয়েছে ওই মামলায়। বিজেপির আপত্তি সেখানেও। তাদের অভিযোগ, যে বা যাঁরা সে দিন মঞ্চে কিছুই বলেননি, তাঁদের নামও মামলায় জুড়ে দেওয়ার পিছনে 

কোনও অভিসন্ধি রয়েছে। যাতে তাঁদের কেউ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে না পারেন।