নিয়মের তোয়াক্কা না-করে একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ঠিকানাকে ‘আপন’ করে নিয়েছে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সংস্থা! 

কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে সরকারের সঙ্গে পিপিপি মডেলে সিটি স্ক্যান সেন্টার চালায় উইনমার্ক ডায়াগনস্টিক সার্ভিসেস নামে একটি সংস্থা। চলতি বছর এপ্রিলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচুর টাকা বকেয়া রাখার অভিযোগ ওঠে। তদন্তে নামে স্বাস্থ্য দফতর। তখনই দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে যাবতীয় ব্যবসায়িক নথিপত্রে নিজেদের রেজিস্টার্ড অফিসের ঠিকানা হিসেবে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ঠিকানা ‘২৪ নম্বর গোরাচাঁদ রোড, কলকাতা ১৪’-কে ব্যবহার করে চলেছে সংস্থাটি।

সংস্থার প্রধান গৌরাঙ্গ রায় নিজেই বলেন, ‘‘২০০২ সালে যখন স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে আমাদের প্রথম চুক্তি হয়, তখন প্রতাপাদিত্য রোডে আমাদের অফিস ছিল। কিন্তু পরে সেই অফিস উঠে যায়। তার পর আর কোনও রেজিস্টার্ড অফিস করা হয়নি। ন্যাশনালের ঠিকানাই ব্যবহার করেছি। তাতে যোগাযোগের সুবিধা হতো।’’ এসএসকেএম, মালদহের মতো কয়েকটি হাসপাতালে দরপত্র জমা দেওয়ার সময় ন্যাশনালের ঠিকানাকেই রেজিস্টার্ড অফিসের ঠিকানা হিসেবে দেখিয়েছিল সংস্থাটি।

ন্যাশনালের সুপার পীতবরণ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘গত সপ্তাহে বিষয়টি জানার পরেই ওই সংস্থাকে শো-কজ করা হয়। তাতে ওরা ভুল স্বীকার করে উত্তর দিয়েছে। গোটা বিষয়টি জানাজানির পর ওদের বাতিল করা হয়েছে।’’ আর গৌরাঙ্গবাবু বলেন, ‘‘ভুল হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে রেজিস্টার্ড অফিসের জন্য আবেদন জমা দিয়েছি।’’

স্বাস্থ্য দফতরের একাধিক কর্তা বলছেন, রেজিস্টার্ড অফিস না-থাকার অর্থ, ওই সংস্থা একপ্রকার ‘অস্তিত্বহীন।’ ফলে কোনও অনৈতিক কাজ করলে খাতায়কলমে তাকে ধরাই মুশকিল হবে। এ দিকে, সরকারের সঙ্গে সংস্থার প্রথম চুক্তির কাগজপত্রও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গৌরাঙ্গবাবুর দাবিমতো মউ স্বাক্ষরের সময় সংস্থার রেজিস্টার্ড অফিস আদৌ ছিল কি না, তা নিয়েও ধোঁয়াশা। স্বাস্থ্যকর্তারা জানিয়েছেন, রাইটার্স থেকে স্বাস্থ্যভবনে স্বাস্থ্য দফতর স্থানান্তরের সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও হয়েছিল। তার ভিতর ওই নথিও থাকতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘‘এই সব বিষয়গুলি মন্ত্রীস্তর অবধি পৌঁছয় না। ফলে এ সব আমার জানার কথা নয়।’’ সেই সময় শীর্ষপদে থাকা বেশিরভাগ স্বাস্থ্যকর্তাই এখন অবসরপ্রাপ্ত। ফলে পুরনো ‘রহস্য’-র আশু সমাধান হওয়া কঠিন।

তবে এত বছর ধরে স্বাস্থ্য দফতর যখন দফায়-দফায় (২০০৭, ২০০৯, ২০০১৩ ও ২০১৫ সালে) সংস্থাটির সঙ্গে চুক্তি নবীকরণ করেছে, তখনও বিষয়টি কেন খতিয়ে দেখা হয়নি, সেই প্রশ্ন উঠেছে। এটা একটা বড় গাফিলতি, মানছেন এখনকার স্বাস্থ্যকর্তারা। তাঁরা বলছেন, টাকা বকেয়া না-রাখলে আরও বহু দিন হয়তো আড়ালেই থেকে যেত এই অনিয়ম।