• অত্রি মিত্র
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

চাহিদার চাকা ঘুরতেই লাভের কড়ি নিগমেরও

একই পরিষেবা। দুই চিত্র। এক দিকে, সরকারি নিগমগুলিকে ভর্তুকি দিতে গিয়ে বাজেট বরাদ্দ ছাড়িয়ে যায়। অন্য দিকে, বিলাসবহুল বাস চালিয়ে সরকারি পরিবহণ সংস্থা এখন প্রতি মাসে নিজেরাই জোগাড় করে ফেলছে কর্মীদের বেতনের টাকা।

বিলাসবহুল বাস এই লাভের মুখ দেখছে যাত্রীদের পাল্টে যাওয়া মানসিকতার কারণেই। একটু বেশি মূল্য দিয়ে যাঁদের পছন্দ নির্ঝঞ্ঝাট আরামের যাত্রা। একই পথে দ্রুত পাল্টাচ্ছে সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলা ট্যাক্সির ধুঁকতে থাকা চেহারাও। তবে কি এ বার ভর্তুকি-রাজ শেষ হয়ে বদলাবে রাজ্যের সার্বিক পরিবহণের হাল? প্রশ্ন উঠছে, সরকারি নিগমগুলিই বা কেন মান্ধাতার আমলের পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে আরামের পরিষেবা দিয়ে আয়ের কথা ভাববে না?

কলকাতার বুকে এখন প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ-তরুণী ঝাঁ-চকচকে ‘স্মার্ট’ পরিবহণ পরিষেবা কিনছেন। তাঁদের কথায়, ‘‘আরাম ও নিশ্চিন্ত যাত্রা নিশ্চিত করতে দু’পয়সা বেশি আমরা দিতেই পারি। আপত্তি নেই।’’

যেমন, এক নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী পায়েল সাহা। জানালেন, রোজ উল্টোডাঙা থেকে সেক্টর ফাইভের অফিসে যেতে হতো অটো চালকের হাজার বায়নাক্কা সামলে। ইদানীং মোবাইল অ্যাপেই দেখে নেন কত দূরে আছে বাস। ঝাঁ-চকচকে এসি বাসে আরামের যাত্রার সঙ্গে মেলে বিনামূল্যের ওয়াই-ফাই। হ্যাপা নেই টিকিট কাটারও। তা-ও হয় অ্যাপেই।

সেক্টর ফাইভের পেশাদার শান্তনু ঘোষ তো মনেই করতে পারছেন না অফিসের কাজে শেষ কবে সল্টলেক থেকে নিজের গাড়ি নিয়ে বিবাদী বাগ গিয়েছেন। শান্তনুর কথায়, ‘‘বিবাদী বাগে নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে প্রথম সমস্যা, কোথায় গাড়ি দাঁড় করাব। তার পরে কত পার্কিং ফি দিতে হবে। তার থেকে ওলা বা উবের বুক করলে বড়জোর পাঁচ মিনিট। তার মধ্যে আপনার সামনে গাড়ি হাজির।’’ শান্তনু আরও বললেন, ‘‘দু’দিন আগেই ফিরছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে। ভোর পাঁচটায় হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে বুক করলাম। ট্রেন থেকে নামার সময়েই ফোন এসে গেল, গাড়ি রেডি। পার্কিং লট-এ গিয়ে ২০ টাকা পার্কিং ফি দিয়ে নির্দিষ্ট গাড়িতে রওনা দিয়ে দিলাম বাড়ির দিকে।’’

আর কলকাতাবাসী যতই ‘স্মার্ট’ এবং বিলাসবহুল পরিবহণ পরিষেবায় অভ্যস্ত হচ্ছেন, ততই পাল্টে যাচ্ছে আশপাশের চেনা ট্যাক্সি কিংবা বেসরকারি বাসের মালিকেরাও। ‘‘এটা সময়ের দাবি। আপনি তার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে পিছিয়ে পড়বেন’’— বলছেন বেসরকারি পরিবহণ সংস্থা রয়্যাল ক্রুজারের কর্ণধার ধনঞ্জয় সিংহ। তিনি জানাচ্ছেন, কয়েক মাস ধরেই তাঁরা শহরে চলা বাসের জন্য অ্যাপ চালু করেছেন। তাতে যাত্রীরা গন্তব্যে যাওয়ার জন্য কেটে নিচ্ছেন টিকিটও।

এমনকী, ধুঁকতে থাকা সরকারি পরিবহণ নিগম এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলা ট্যাক্সির চেহারাও চাহিদার চাপে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে।

পরিবহণ দফতরের হিসেবই বলছে, বছরে সরকারি নিগমগুলিকে ভর্তুকি দিতে বাজেট বরাদ্দ হয় ৫০০ কোটি টাকার মতো। কিন্তু বাস্তবে তার খরচ দাঁড়িয়ে যায় ৬২০ কোটির কাছাকাছি। কিন্তু অন্য দিকে গত এক বছরে ২৩৪টি নতুন এসি বাস চালিয়ে কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের (সিএসটিসি) আয় দৈনিক ৩০ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এক পরিবহণ কর্তার কথায়, ‘‘সিএসটিসি-র বেতনের ৭৫ শতাংশ দেয় সরকার। বাকি ২৫ শতাংশ দেয় সিএসটিসি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভর্তুকির পরিমাণ হয়তো কমানো যায়নি। কিন্তু সিএসটিসি কর্মীদের বেতনের টাকাটা জোগাড় করতে পারছে।’’

সরকারি পরিবহণ সংস্থা সিএসটিসি-র তথ্য বলছে, বছরখানেক আগে তাদের ২৩৪টি নতুন এসি বাস এসেছে। তার পরে নিগমের আর্থিক চেহারাটাই পাল্টে গিয়েছে। সংস্থার এক কর্তার কথায়, ‘‘আমাদের ১০৫টি রুট আছে। তার মধ্যে ৩১টি এসি রুট এবং প্রত্যেকটিই লাভজনক। এমনকী, অনেক রুটে কিলোমিটার প্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে, যা সরকারি বাসে দু’বছর আগেও কার্যত ভাবাই যেত না।’’ ওই কর্তার দাবি, ‘‘সিএসটিসি এসি বাস চালিয়ে এখন লোকসান সামাল দিয়ে লাভের কড়ি গোনার পথে। আর যাত্রীদের চাহিদাও এসি বাস। সম্প্রতি আমরা যাত্রীদের পরামর্শ নেওয়ার জন্য ফেসবুকে একটি পেজ খুলেছি। তাতে বেশির ভাগ পরামর্শই হল, আরও বেশি সংখ্যায় ভলভো এসি বাস রাস্তায় নামানোর।’’ রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও বলছেন, ‘‘এখনকার যাত্রীরা উপযুক্ত মূল্য দিয়ে উন্নত মানের পরিষেবা কিনতে পিছপা হন না। তাই আমাদেরও সময় এসেছে নিজেদের ভাবনা পাল্টানোর।’’

পাল্টাচ্ছেন বেসরকারি ট্যাক্সি এবং বাসমালিকেরাও। বেসরকারি ট্যাক্সির জন্য ইতিমধ্যেই অ্যাপ তৈরি কাজ শুরু করেছে সরকার। আর বেসরকারি বাস-মালিকদের একটি সংগঠনের নেতা তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘আমরাও অ্যাপ-এর মাধ্যমে কোন রুটের কোথায় বাস রয়েছে, তা জানাতে চাই। ইতিমধ্যেই তার একটি বিস্তারিত খসড়া পরিবহণ সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সরকার অনুমতি দিলে আমরা ওই অ্যাপ তৈরির কাজ শুরু করে দেব।’’

তত দিনে অবশ্য অ্যাপ-নির্ভর ট্যাক্সি পরিষেবা আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। একাধিক যাত্রীকে একসঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ওলা-উবের ইতিমধ্যেই চালু করে দিয়েছে তাদের নতুন সুবিধা। এমনকী, কলকাতা শহরে বাস চালানোর কথাও ভাবতে শুরু করেছে এই সংস্থাগুলি। উবেরের পক্ষে অশ্বিন ডায়াসের দাবি, ‘‘কলকাতা শহরে ব্যবসা বাড়ানোর ব্যাপারে আমরা খুবই আশাবাদী। কারণ, কলকাতা থেকে শুরুতেই আমাদের যা আয় হয়েছে, তা সিঙ্গাপুর, প্যারিস কিংবা লন্ডনের মতো শহরেও হয়নি।’’

প্রথম বার ক্ষমতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, পাঁচ বছরে লাভের মুখ দেখবে নিগমগুলি। পাঁচ বছরে তা হয়নি। নতুন ‘স্মার্ট’ পরিবহণের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিগমগুলির বেহাল দশা কি ঘুচবে? সেটাই এখন দেখার।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন