সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মহিলা ট্রেনে পুরুষের অধিকার, রেল-নির্দেশে রণক্ষেত্র খড়দহ

5
খড়দহে রেল অবরোধ মহিলা যাত্রীদের। ছবি: বিতান ভট্টাচার্য।

মহিলাদের বিশেষ ট্রেন ‘মাতৃভূমি’ লোকালে এ বার থেকে পুরুষ যাত্রীরা উঠতে পারবেন। তবে সব কামরায় নয়, রেলের নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত কয়েকটি কামরাতেই উঠতে পারবেন তাঁরা। সোমবার সকাল থেকেই পরীক্ষামূলক ভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথা জানিয়েছিল রেল। আর তার জেরে এ দিন সকালে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল শিয়ালদহ মেন শাখার খড়দহ স্টেশন। রেল অবরোধ, পুরুষ যাত্রীদের সঙ্গে মহিলা যাত্রীদের গণ্ডগোল, জনতা-পুলিশ খণ্ডযুদ্ধের পাশাপাশি পুলিশের লাঠি চালানো, কাঁদানে গ্যাস ছোড়া থেকে শুরু করে উভয় পক্ষের পাথর ছোড়াছুড়ি— সব কিছুর সাক্ষী থাকল এ দিনের খড়দহ। এমনকী, পুলিশের সামনেই মহিলা যাত্রীদের উদ্দেশ করে কটূক্তি, গালিগালাজ এবং তাঁদের গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগও উঠল পুরুষ যাত্রীদের বিরুদ্ধে। ঘটনায় দু’জন মহিলা যাত্রী-সহ বেশ কয়েক জন পুলিশ কর্মী গুরুতর জখম হয়েছেন। এ সবের জেরে এ দিন সকাল থেকে শিয়ালদহ মেন লাইনে ঘণ্টা তিনেক ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তিন মহিলা-সহ ছয় জনকে আটক করেছে পুলিশ।

দেখুন, খড়দহে খণ্ডযুদ্ধ

ঘটনার সূত্রপাত এ দিন সকালে। রানাঘাট থেকে নির্ধারিত সময়েই ছেড়েছিল ডাউন মাতৃভূমি লোকাল। ট্রেনটি ছাড়ার আগে থেকেই প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা করা হচ্ছিল, ‘আজ থেকে লেডিজ স্পেশ্যালের মাঝের তিনটি এবং দু’পাশের ভেন্ডর কামরা দু’টিতে পুরুষ যাত্রীরা উঠতে পারবেন’। সম্প্রতি মহিলাদের বিশেষ ট্রেনের নির্ধারিত কয়েকটি কামরায় পুরুষ যাত্রীদের ওঠার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় পূর্ব রেল। এ দিন থেকে তা পরীক্ষামূলক ভাবে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এই সিদ্ধান্তের কথা দিন দুয়েক আগে রেলের তরফে সংবাদ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়েও জানানো হয়। দুয়ে মিলে রানাঘাট স্টেশন থেকেই ট্রেনটির রেল-নির্ধারিত কামরায় পুরুষ যাত্রীদের ভিড় ছিল। ট্রেন যত এগোয়, পুরুষ যাত্রীদের ভিড় ততই বাড়ে। আর তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ে মহিলা যাত্রীদের বিরক্তি এবং উষ্মা। আড়ংঘাটার বাসিন্দা সোনা ঘোষ ওই ট্রেনেই রানাঘাট থেকে উঠেছিলেন। পুরুষদের জন্য নির্ধারিত কামরায় সফর করা ওই যাত্রী জানালেন, রানাঘাট থেকেই ওই মহিলা যাত্রীরা রেলের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করছিলেন। তাঁর দাবি, একটা সময়ে ওই কামরায় থাকা পুরুষ সহযাত্রীদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধও বাধে। তবে, খড়দহে এসে গোটা পরিস্থিতিটাই পাল্টে যায়।

স্থানীয় সূত্রে খবর, সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে খড়দহে এসে পৌঁছয় ডাউন রানাঘাট মাতৃভূমি লোকাল। প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটি ঢোকা মাত্রই সামনের কামরা থেকে কয়েক জন যাত্রী নেমে পড়ে লাইনের উপর বসে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েক জন মহিলা। খড়দহ থেকে তাঁদের মাতৃভূমি লোকালে ওঠার কথা ছিল বলে জানিয়েছেন ওই মহিলা যাত্রীরা। খড়দহে প্ল্যাটফর্মগুলির শেষ প্রান্তে (শিয়ালদহের দিকে) রয়েছে একটি রেলগেট। রহড়া বাজার থেকে বিটি রোড সংযোগকারী ওই রাস্তার উপর রেললাইনে বসে পড়েন অবরোধ করেন মহিলারা। তাঁদের অবরোধের জেরে শিয়ালদহ মেন শাখায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় জিআরপি এবং আরপিএফ। অভিযোগ, তারা অবরোধ তোলার কোনও চেষ্টাই করেনি।


রেলের সেই নোটিস। বিস্তারিত দেখতে ক্লিক করুন। 

খড়দহ এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের উপর (শিয়ালদহের দিকে) রয়েছে একটি কেবিন ঘর। সেখান থেকে মাইকে ট্রেন যাতায়াতের ঘোষণা করা হয়। মহিলা অবরোধকারীদের একাংশ সেই কেবিনে উঠে মাইকে ঘোষণা করতে থাকেন তাঁদের দাবি। ‘অবিলম্বে রেলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে’, ‘মহিলাদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ট্রেনে পুরুষ যাত্রীদের উঠতে দেওয়া যাবে না’ বলে দাবি জানাতে থাকেন তাঁরা। এর পরই সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ ব্যারাকপুর কমিশনারেটের পুলিশ কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। খড়দহ থানার আইসি-র নেতৃত্বে তাঁরা অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেন তাঁরা। রেল জানিয়ে দেয়, যাত্রীদের সুবিধার কথা ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অসুবিধা হলে তারা তা খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু, পুলিশের কাছে রেলের এই বার্তা শোনার পরেও মহিলা যাত্রীরা তাঁদের অবস্থান থেকে সরেননি বলে অভিযোগ।

এর পরই পুলিশ কর্মীরা মহিলা যাত্রীদের জোর করে লাইনের উপর থেকে তুলে দেন। তাঁদের নিরাপত্তার বেষ্টনীতে ঘিরে প্ল্যাটফর্মের বাইরে নিয়ে যান তারা। আর সেই সময়েই বিপত্তি বাধে। পুরুষ সহযাত্রীরা এত ক্ষণ ধরে ওই অবরোধকারীদের উদ্দেশে কটূক্তি এবং গালিগালাজ করছিলেন। অভিযোগ, ভিড়ের ভেতর দিয়ে তাঁদের প্ল্যাটফর্মের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় সেই যাত্রীরাই ওই মহিলাদের কারও কারও মাথায় চাটি মারেন। তাঁদের শাড়ি ধরে টানেন। এমনকী, পুলিশের হাত থেকে তাঁদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন বলে অভিযোগ। তাদের লক্ষ্য করে ছোড়া হয় পাথরও। এ সবের মধ্যেই পুলিশ কোনও মতে অবরোধকারীদের বাইরে নিয়ে যায়। আর তার পরেই ওই পুরুষ যাত্রীরা রেললাইনের উপর বসে পড়েন। শুরু হয় ফের অবরোধ।

পুলিশ এসে সেই অবরোধ তুলে দিতে গেলে খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। পুলিশ অবরোধকারীদের দিকে লাঠি নিয়ে ধেয়ে গেলে শুরু হয় পাথরবৃষ্টি। পুলিশও পাল্টা পাথর ছোড়ে বলে অভিযোগ। পাথরের আঘাতে দু’জন মহিলা যাত্রী-সহ বেশ কয়েক জন পুলিশকর্মী গুরুতর জখম হয়েছেন। এর পর পরিস্থিতি সামলাতে আট রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় জনতা। সেই সময়েই উত্তেজিত জনতা ভেঙে দেয় রহড়া বাজারের দিকের রেলগেটটি। এর কিছু ক্ষণ পর বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ অবরোধ উঠে গেলে মেন লাইনে ট্রেন চলাচল ফের শুরু হয়। তবে, এ দিন বিকেল পর্যন্ত তা স্বাভাবিক হয়নি।

পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক রবি মহামাত্র বলেন, ‘‘শিয়ালদহ ডিভিশনের সব ক’টি মাতৃভূমি লোকালে নির্ধারিত কয়েকটি কামরায় পুরুষ যাত্রীরা উঠতে পারবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যাত্রীদের যদি এ বিষয়ে কোনও অভিযোগ থাকে, তবে তা খতিয়ে দেখা হবে। তবে, এ বিষয়ে অবরোধ কোনও ভাবেই মেনে নেবে না রেল।’’ তবে, এ দিন বিকেলে রেলের তরফে জানানো হয়েছে আপ-ডাউন ডাউন মাতৃভূমি লোকালের ক্ষেত্রে সাময়িক ভাবে ওই নির্দেশ প্রত্যাহার করা হল। ওই ট্রেনে আগের মতোই কোনও কামরায় পুরুষ যাত্রীরা উঠতে পারবন না।

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন