রাষ্ট্র, সমাজ ও মিডিয়ার দেবদূতেরা যেখানে পা ফেলতে সাহস পাননি, সেখানেই ঘা মেরেছে বাংলা ভাষায় লেখা এক উপন্যাস।

গত বছর পয়লা বৈশাখ (১৫ এপ্রিল, ২০১৪) সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, ট্রান্সজেন্ডারদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এঁরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে, ফলে শিক্ষা, জীবিকা ও নানা খাতে সরকার যেন এঁদের সমান সুযোগের বন্দোবস্ত করে। ‘‘তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি কোনও সামাজিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত ইস্যু নয়, মানবাধিকারের প্রশ্ন বলেই বিবেচ্য,’’ জানিয়েছিল বিচারপতি কে এস রাধাকৃষ্ণনের রায়।

তার পর? দরিদ্র কিম্পুরুষদের এখনও রাস্তায় বা ট্রেনের কামরায় তালি বাজিয়ে ভিক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ফর্মে সম্প্রতি তৃতীয় লিঙ্গের অপশন থাকছে ঠিকই। কিন্তু এই বঙ্গে পুজোমণ্ডপ থেকে ভোটমণ্ডপ কোত্থাও নারী-পুরুষের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের লাইন রাখার সাহস কারও হয়নি।

শুধু তৃতীয় লিঙ্গ? সমকামিতা নিয়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাটি ঔপনিবেশিক আমলের বস্তাপচা মানসিকতাপ্রসূত। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, আইনে একটি সংশোধন করলেই হয়ে যাবে। কিন্তু সেই সংশোধনের দায়িত্ব আদালতের নয়, সংসদের। তার পর থেকে আজ অবধি জনপ্রতিনিধিরা কেউ বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার সাহস পাননি। রাষ্ট্রপুঞ্জ তার অফিসে সমকামী দম্পতিদের অন্যদের সমান সুবিধা দিতে চাইলে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় ভারত। সানি লিওনের যৌন আবেদনে ক্ষতি নেই, কিন্তু তামিল লেখক পেরুমল মুরুগান ‘ওয়ান পার্ট উওম্যান’ লিখলে তাঁকে লেখা ছেড়ে দিতে হয়। ফেসবুকে লিখতে হয়, লেখক পেরুমল মুরুগানের মৃত্যু হল। কলকাতায়  আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয় অভিনেত্রীকে।

বচ্ছরভর এই ন্যক্কারজনক ভারতীয় ঘটনাস্রোতে বাঁধ পড়ছে আজ, আর এক পয়লা বৈশাখের সিদ্ধান্তে। স্বপ্নময় চক্রব়র্তীর ‘হলদে গোলাপ’ ১৪২১ সালের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত। এক বাংলা নববর্ষে সুপ্রিম কোর্টের রায়, তার পর সারা দেশের নীরবতা এবং ফিরতি নববর্ষেই রূপান্তরকামী পরিমল, হিজড়ে দুলালীদের নিয়ে লেখা উপন্যাসকে সাহিত্য পুরস্কারের সিদ্ধান্ত।

সিদ্ধান্তের অভিঘাত বাংলা ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় বংশোদ্ভূত অধ্যাপক মিনাল হজরতওয়ালা এ বই পড়েননি। ইংরেজি অনুবাদ না হলে তাঁর পক্ষে পড়া সম্ভবও নয়। ‘‘কিন্তু একটা ব্যাপারে আশাবাদী লাগছে। ভার্নাকুলার ল্যাঙ্গোয়েজেও যদি এ রকম বই সম্মান পায়, সমপ্রেম নিয়ে ট্যাবু ভাঙার দিন এল বলে,’’ ফোনে বললেন তিনি। কয়েক বছর আগে মিনালের সম্পাদনায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ইংরেজিতে লেখা সমকামিতার গল্প নিয়ে ‘আউট! কুয়্অর স্টোরিজ ফ্রম ইন্ডিয়া’ রীতিমতো সাড়া জাগিয়েছিল। মূলধারার যৌনতার বাইরে অন্য পরিসরের কথা বলতে গেলে ‘কুয়্অর’ শব্দটিও আজ বাতিল, ‘এলজিবিটি’ (লেসবিয়ান-গে-বাইসেক্সুয়াল-ট্রান্সজেন্ডার) বলাই বিধেয়। স্বপ্নময়ের উপন্যাস সেই নতুন শব্দবন্ধই ব্যবহার করেছে। বাংলা উপন্যাসে সচরাচর গ্রন্থপঞ্জি থাকে না। স্বপ্নময়ের ৫৯১ পৃষ্ঠার গ্রন্থশেষে এক পৃষ্ঠা জুড়ে সূত্রনির্দেশ হিসেবে বিভিন্ন বই, পত্রপত্রিকা ও ওয়েবসাইটের উল্লেখ। এমনকী ‘হলদে গোলাপ’-এর প্রচ্ছদে নেই কলেজ স্ট্রিটসুলভ ক্যাটক্যাটে হলুদ। আছে এলজিবিটি আন্দোলনের প্রতীক গোলাপি, দড়িতে বাঁধা খড় ও কাঠের পুতুলের মুণ্ডহীন ধড়।

দড়ি কে বাঁধল? পরিবার, সমাজ, আইন না রাষ্ট্রযন্ত্র? উপন্যাস তারই খোঁজে, প্রচ্ছদে শুধু বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মতো  ‘মুণ্ডহীন ধড়গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে।’ কাহিনি যত এগোয়, ধরা পড়ে অনেক কিছু। ডাক্তার কী ভাবে তৈরি করেন রূপান্তরকামী পুরুষের সিলিকন ব্রেস্ট? কাকে বলে লিকম্? বাট্টুখোরই বা কে? নতুন পরিভাষা,  উপন্যাসের প্রকরণ ও জেন্ডার স্টাডিজের মোহনায় দাঁড়ানো সেই বইকেই এ বার আনন্দ-শ্রদ্ধার্ঘ্য।

আর, বাংলা ভাষা না জেনেও এই সিদ্ধান্তে চমৎকৃত ভারতে এলজিবিটি আন্দোলনের পথিকৃৎ, ‘বম্বে দোস্ত’ পত্রিকা ও ‘হামসফর ট্রাস্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা অশোক রাও কবি। গত কয়েক দশক ধরে এই মরাঠি ভদ্রলোকের উপর বারংবার সমাজের খাঁড়া নেমেছে। ফোনে বললেন, ‘‘এই পুরস্কারের দু’টি দিক। এক দিকে রক্ষণশীল বাঙালি সমাজকে এটি আমাদের সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করবে। অন্য দিকে এলজিবিটি সম্প্রদায়কে যে ভাবে একঘরে করে দেওয়া হয়, সেটি হয়তো কমবে। ফলে শুধু বাংলা নয়,  ভারতীয় সাহিত্য পুরস্কারে এ বার আসতে পারে অন্য মাত্রা।’’

অন্য মাত্রার এই বই প্রায় দুই দশকের আগ্রহ ও পরিশ্রমের ফসল। আটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই স্বপ্নময় প্রতিশ্রুতিসম্ভব ছোটগল্পকার। ‘অষ্টচরণ ষোলহাঁটু’, ‘জার্সি গরুর উল্টো বাচ্চা’, ‘ভিডিও ভগবান নকুলদানা’র মতো তাঁর বহু গল্প তখন পাঠকদের মুখে মুখে। তখন তিনি রেডিও-র ট্রান্সমিশন এগজিকিউটিভ। ’৯৫ সালে স্বপ্নময়েরই পরিকল্পনায় আকাশবাণী কলকাতায় শুরু হয় যৌনশিক্ষার প্রোগ্রাম, সন্ধিক্ষণ। সেখানেই এক মহিলার চিঠি: আমার ছেলেটা অসুখে ভুগছে। হোমোসেক্সুয়ালিটি। অথচ আপনারা বলেন, ওটা রোগ নয়। ‘‘ওটাই ছিল বীজ। তার পর নিজের আগ্রহে বিভিন্ন জনের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন পত্রিকা ঘাঁটা, উপন্যাসের প্লট তৈরি,’’ বলছিলেন লেখক। চাকরিসূত্রে একটি প্রশ্ন ঘিরে আগ্রহ, অতঃপর দেড় দশক ধরে তা জিইয়ে রাখা, আরও অনুসন্ধান, অতঃপর উপন্যাস রচনা— এই বঙ্গভূমে সচরাচর ঘটে না।

যৌনতা নিয়ে ঢাকঢাক-গুড়গুড়ে অভ্যস্ত বাঙালি সমাজে এই বইয়ের উৎসভূমে রয়েছে এক সম্পাদকের নীরব জেদও। বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ হয়ে বিভূতিভূষণ-সুনীল-শীর্ষেন্দুর বেশির ভাগ সাড়াজাগানো উপন্যাসই বেরিয়েছিল পত্রিকায় ধারাবাহিক হিসেবে। স্বপ্নময়ের মাথায় যখন উপন্যাস ঘুরঘুর করছে, তিনি প্রস্তাব দেন ঋতুপর্ণ ঘোষকে। দ্বিচারী বঙ্গসমাজ তখন মাইকেল জ্যাকসন, এল্টন জনে আপ্লুত। অথচ ঋতুপর্ণকে ‘মগা’ বলে ঠাট্টা করে। সেই সম্পাদকের উৎসাহেই ‘সেক্স চেঞ্জ’ নিয়ে ধারাবাহিক উপন্যাস এবং তাঁর মৃত্যুর পরও বই হিসেবে তার সম্মাননায় রইল আম-বাঙালির পাপক্ষালন।

এলজিবিটি নামে আম-কাঁঠাল-খেজুর একাকার করে দেওয়া ওই ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ বন্ধনী থেকে বেরিয়ে এলে দেখা যাবে, স্বপ্নময়ের উপন্যাস মুখ্যত রূপান্তরকামীদের নিয়ে। এঁদের ট্রান্সজেন্ডার বলা হবে না ট্রান্সপার্সন, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে এখন হরেক বিতর্ক। লেখক কোনটা পছন্দ করেন? ‘আমার কোনওটাতেই আপত্তি নেই। কিন্তু বাঙালি ওই যে ভিতু হলেই হিজড়ে, নপুংসক বলে গাল দেয়, চুড়ি পরে বসে থাকার পরামর্শ দেয়, এতে আপত্তি আছে,’ বললেন স্বপ্নময়। একদা কবিতা সিংহের ‘পৌরুষ’ উপন্যাসে কার্জন পার্কে শ্রমিক নেতাকে মালিকের গুন্ডাদের মার থেকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সখীসোনা নামের এক হিজড়ে। দিন কয়েক আগে ঢাকায় ওয়াশিকুর নামে ব্লগার খুন হন, সকলে পালিয়ে গেলেও খুনিকে ধরে ফেলেন এক নপুংসক। সাহিত্যের পাশাপাশি সেই সাহসী প্রান্তিক জীবনকেও এ বার আনন্দ-স্বীকৃতি।

এই রকম হিজড়ে চরিত্র নিয়ে কয়েক বছর আগে বেরিয়েছিল কমল চক্রবর্তীর ‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণ’। সেখানে হিজড়েদের প্রার্থনা ছিল, ‘আর জন্মে ছেইল্যা কর হে জগন্নাথ।’ স্বপ্নময়ের গোলাপসন্দর্ভ অন্য: ‘৯০ শতাংশ হিজড়েই ছেলে, মেয়ে সেজে থাকে।’ রতিসুখের কারণে মেয়ে হতে চাওয়া তো মহাভারতীয় চেতনা। অনুশাসনপর্বে ভঙ্গাস্বন নামে এক রাজার কথা আছে। স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের অভিশাপের চক্করে তিনি মেয়ে হয়ে গিয়েছিলেন। পরে ইন্দ্র বর দিতে এলে তিনি মেয়ে হয়েই থেকে যেতে চাইলেন। কারণ, যৌনতায় মেয়েদের আনন্দ পুরুষের চেয়েও বেশি।

ট্রান্সজেন্ডারকে তবু চেনা যায়। কিন্তু কে সমকামী বা উভকামী, বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। নবনীতা দেবসেনের ‘বামাবোধিনী’ এবং ‘অভিজ্ঞান’ দুটি উপন্যাসেই লেসবিয়ান এবং বাইসেক্সুয়াল চরিত্র আছে। বিবাহিতা মহিলা, সন্তানের মা— তিনি হঠাৎ খুঁজে পেলেন কমবয়সী এক শয্যাসঙ্গিনীকে। বিবাহিত পুরুষ সংসার ছেড়ে চলে গেলেন বিদেশে তাঁর পুরুষসঙ্গীর কাছে। ‘গোটাটাই চয়েস। আগে চয়েস পায়নি, বোঝেনি। এমন হতেই পারে,’ বলছেন তিনি। বাঙালির অবদমিত কামই শুধু এ নিয়ে ভাবিত হয়। ডায়ানা এক-এর মতো ভারততত্ত্ববিদ বা বিক্রম শেঠের মতো লেখক এ নিয়ে আপস করেন না।

ট্রান্সজেন্ডারেরা এই বইকে দেখছেন কী ভাবে? সোমনাথ লিঙ্গ পরিবর্তন করে আজ মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় নামে খ্যাত, তিনি নিজে এই বইয়ের চরিত্রও বটে। ‘‘আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে। সারা বইতে ‘ওরা’, ওদের’ ইত্যাদি শব্দ ছড়ানো। লেখক যেন বলতে চান, আমি ওদের কেউ নই। দূর থেকে দেখছি,’’ মন্তব্য তাঁর। সংস্কৃতিবিদ্যার অধ্যাপক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ও একদা এক নিবন্ধে দেখিয়েছিলেন, সকলের মধ্যেই লেসবিয়ান, গে এবং রূপান্তরকামী আকাঙ্ক্ষা আছে। প্রত্যেকেই নিজের শরীরকে অদম্য ভালবাসতে চায়, কিন্তু নিজের কাছে স্বীকার করতে চায় না। সেই জন্যই নিজের জন্য নানা ছাঁদের যৌন-অপর বানিয়ে নেয়।

উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের রূপান্তরকাম এই বইয়ে একাকার। এক দিকে ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরিমল নারী হতে চায়, অন্য দিকে হিজড়ে দুলালী পুজো করে লোকায়ত বহুচেরা মায়ের। গুজরাতে মন্দির তাঁর, উৎসবের দিন ভারতের সব হিজড়ে জমায়েত হয় সেখানে। লিঙ্গচ্ছেদ বা লিঙ্গ পরিবর্তন আজকের ব্যাপার নয়। মহাভারতে শিখণ্ডীর বিয়ে হল। শ্বশুর চেদিরাজ যখন শুনলেন— জামাইটি নপুংসক, ঠকিয়ে তাঁর মেয়েকে বিয়ে করেছে— দ্রুপদের রাজ্য আক্রমণের প্রস্তুতি নিলেন। শিখণ্ডী অরণ্যে পালিয়ে গিয়ে স্থূণাকর্ণ নামে দয়ালু এক যক্ষের সঙ্গে লিঙ্গ বিনিময় করে পুরোদস্তুর পুরুষ হয়ে ঘরে ফিরে এলেন। ভারতীয় এই ধ্রুপদী ঐতিহ্য যাঁরা ভুলে গিয়েছেন, তাঁরাই ‘ঘর ওয়াপসি’ খোঁজেন, সমকামিতা ও রূপান্তরকামিতাকে বিদেশি পাপ গণ্য করেন। হলদে গোলাপের ঘ্রাণে আনন্দ পুরস্কার যেন সেই বার্তাই পৌঁছে দিল।