পুলিশে যেমন সিভিক ভলান্টিয়ার, তেমনই বনরক্ষী বাহিনীতে ওঁরা। তবে ওঁদের নামের আগে ‘ভলান্টিয়ার’ গোছের কোনও শব্দ নেই, নেই সরকারি উর্দিও। খাতায়-কলমে ওঁদের পরিচয় ‘দিনমজুর’ হিসেবে।

বনকর্তারা জানাচ্ছেন, বনরক্ষীর ঘাটতি মেটাতে এই দিনমজুরেরাই এখন দফতরের ভরসা। শুধু কায়িক শ্রম নয়, জঙ্গলে টহল থেকে শুরু করে সমীক্ষা, চোরাশিকারি পাকড়াও করার অভিযান— সব কিছুতেই কাজে লাগানো হয় তাঁদের। ‘‘গ্রামেগঞ্জে, এমনকি শহরতলিতেও পুলিশ যেমন সিভিক ভলান্টিয়ারদের উপরে নির্ভরশীল, একই ভাবে আমরা নির্ভরশীল এই দিনমজুরদের উপরে,’’ বললেন এক বনকর্তা।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট সার্ভিস এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অমল সিংহ জানান, এখন রাজ্যে প্রায় দু’হাজার ‘প্যাকেজড ডেলি লেবার’ এবং প্রায় ৫০০ ‘ডেলি লেবার’ রয়েছেন। ২০১১ সালের আগে যাঁরা বন দফতরে দিনমজুর হিসেবে ঢুকেছিলেন, বাম জমানার শেষে বেতনের ক্ষেত্রে তাঁদের একটি ‘প্যাকেজ’ দেওয়া হয়েছিল। তাতে চাকরির বয়স অনুযায়ী বেতনক্রম, তিন শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা মিলেছে। ৬০ বছর বয়সে অবসরকালীন সুবিধা হিসেবে একসঙ্গে তিন লক্ষ টাকা গ্র্যাচুইটি পান তাঁরা। ওঁরাই হলেন ‘প্যাকেজড ডেলি লেবার’ বা পিডিএল। ২০১১ সালের অগস্টের পরে কাজে নিযুক্তেরা দৈনিক ২৪০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। অন্য কোনও সুবিধা তাঁরা পান না। তাঁরা ‘ডেলি লেবার’ বা ডিএল। 

বনকর্মী সংগঠনের নেতারা জানাচ্ছেন, এই দু’ধরনের শ্রমিকদের কোনও প্রশিক্ষণ নেই। তাঁদের হাতে অস্ত্র ধরানো যায় না। খাতায়-কলমে তাঁদের কাজ বনরক্ষীদের ‘সহকারী’ হিসেবে কায়িক শ্রমদান। কিন্তু এখন তাঁরাই কার্যত বনরক্ষীর দায়িত্ব পালন করেন। রাজ্যের বিভিন্ন বন বিভাগে কর্মরত বহু দিনমজুর জানান, সকাল থেকে বিকেল, কখনও টহল, কখনও জঙ্গল সাফাই, কখনও অন্য কোনও ফরমায়েশি কাজ করতে হয়। কিন্তু তার তুলনায় বেতন খুবই কম। 

এই সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন বিভিন্ন বিট অফিসার, রেঞ্জারও। এক বিট অফিসার বলেন, ‘‘আমার দফতরে বনরক্ষী আছেন মাত্র এক জন। তিনিও অবসরের মুখে। তা হলে এই জঙ্গল রক্ষার কাজটা কাকে দিয়ে করাব?’’ এক রেঞ্জারের স্বীকারোক্তি, এই দিনমজুরেরা আছে বলে তবু জঙ্গলের কিছুটা রক্ষা হচ্ছে। না-হলে সেটুকুও হত না। কাজ করতে করতেই প্রশিক্ষণের প্রাথমিক পাঠটুকু শিখে নিয়েছেন ওঁরা। অনেকে বলছেন, কাজে কোনও বড় ভুলচুক হয়ে গেলে এই মজুরদের দায়ী করা যাবে না।

বন দফতরের প্রবীণ কর্মীরা জানাচ্ছেন, বাম জমানায় বন মজুর ও বন শ্রমিকের পদ তৈরি করা হয়েছিল। তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। উর্দি ছিল, আইনি অধিকার ছিল। অনেকটা পুলিশের হোমগার্ডের মতো। তাঁরা বনরক্ষীদের কাজ সামলাতে পারতেন। কিন্তু সেই পদগুলিতে নিয়োগ বন্ধ আছে। তাই বনরক্ষী বাহিনীর শূন্যতা মেটানোর দায় এই দিনমজুরদের উপরে। ‘‘নিচু তলায় বনশ্রমিকের মতো নতুন পদ তৈরি করে নিয়োগ করতে হবে,’’ বলছেন অমলবাবু।

কর্মী-ঘাটতির কথা মেনে নিচ্ছেন বন দফতরের এক শীর্ষ কর্তাও। তিনি জানান, দিনমজুরেরাও বেশ কিছু ক্ষেত্রে কাজ শিখে নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না-হওয়ায় বিভিন্ন পদের ক্ষেত্রে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। সম্প্রতি আবার নিয়োগ শুরু হয়েছে। বনরক্ষীর সংখ্যা বাড়লে এই দিনমজুরদের কাজের ভার লাঘব করা হবে।

একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বেঘোরে মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্তদের খোঁজে শনিবার রাতে মৈপীঠের গ্রামে গিয়ে আক্রান্ত হন বেশ কিছু বনকর্মী ও অফিসার। চোরাশিকারি ধরার ওই অভিযানে ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডিএফও। সেই হামলার প্রেক্ষিতে কর্মক্ষেত্রে নিচু তলার বনকর্মীদের নিরাপত্তার দাবিতে সোমবার রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপাল নরেন্দ্রনাথ পাণ্ডের কাছে স্মারকলিপি দেয় বনকর্মীদের দু’টি সংগঠন। অমলবাবুর সংগঠনের দাবি, নিচু তলায় কর্মী বাড়াতে হবে। উপযুক্ত অস্ত্র দিতে হবে কর্মীদের।