জামশেদপুর রোড ধরে বলরামপুর চক থেকে বাঁদিকে বড়াবাজারের পিচ রাস্তা ধরে একটু এগোলেই ফের বাঁদিকে ঢালাই রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে সুপুরডির দিকে। ক’বছর আগেও এই রাস্তাটাই ছিল মোরাম বিছনো। ঢালাই রাস্তা পুরো গ্রাম পর্যন্ত যায়নি। কিছু দূর পর থেকেই শুরু হয়ে গেল পুরনো সেই লাল-মাটির সরু ফিতের মত রাস্তা। দু’দিকে রুখা অনাবাদী পাথুরে জমি, আর তার গা ঘেঁষে সোনাঝুড়ি-আকাশমণির জঙ্গল।

গ্রামে ঢোকার রাস্তার দু’পাশে গাছে গাছে গেরুয়া ঝান্ডা। আর তার মধ্যেই রাস্তার ডানদিকে মাঠের উপর প্রায় কোমর সমান উঁচু দুটো বেদি। সাদা-লাল বেদির মাথায় উড়ছে টকটকে লাল কাস্তে-হাতুড়ি তারা ছাপ দেওয়া পতাকা। বেমানান দৃশ্যটা দেখে থমকে যেতেই হল। নেমে বেদির কাছে পৌঁছতেই পিছনের টালির ছাউনি দেওয়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন এক যুবক। কিছু প্রশ্ন করার আগেই সেই যুবক ডানদিকের বেদিটা দেখিয়ে বললেন “এটা বৈকুণ্ঠ মাহাতোর শহিদ বেদি। ২০০৯ সালের ২৩ এপ্রিল মাওবাদীরা খুন করেছিল জ্যাঠাকে।” জানা গেল, পাশের বেদিটা বিভূতি সিং সর্দারের। ওই একই দিন বৈকুণ্ঠের সঙ্গে মাওবাদীদের হাতে খুন হয়েছিলেন তিনি। সিপিএম নেতা বৈকুণ্ঠ ছিলেন পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সদস্য। বিভূতি দলের লোকাল কমিটির সদস্য ছিলেন। বৈকুণ্ঠর ভাইপো বিজয় পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন গ্রামের মাঝখানে ত্রিলোচনের বাড়িতে।

খোলার চালের ছোট্ট একটেরে মেটে বাড়ি। বাড়ির সামনের দাওয়াতেই বসে ছিলেন বাবা হাড়িরাম। চার ছেলের মধ্যে ছোট ত্রিলোচন। সদ্য ১৮ পেরিয়েছিলেন। বলরামপুর কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়ছিলেন। ছেলের অশৌচ পালন করছেন হাড়িরাম। পরনে অশৌচের পোশাক। ছেলের কথা উঠতেই ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “সারা জীবন লোকের দোকানে কাজ করে চার ছেলেকেই লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করলাম। অভাবের সংসারে বাকি তিনজন পড়া শেষ করতে পারল না। ছোটটা চালিয়ে যাচ্ছিল। অনেক আশা ছিল ওকে নিয়ে। কম্পিউটার কিনেছিল। সারাদিন আঁকাআঁকি আর কম্পিউটার নিয়েই থাকত।”

আরও পড়ুন: বন্‌ধের রাস্তায় বিজেপির টহলদারি, থমথমে পুরুলিয়ায় গেলেন লকেট

কত দিন ধরে বিজেপি করছে জিজ্ঞাসা করায় মা পানোর জবাব, “উয় পার্টি কী করবে। সবাই থাকলে সঙ্গে সঙ্গে থাকত। ভাল আঁকতে পারত, তাই পার্টির সবাই ওকে নিয়ে যেত আঁকাতে।” বাড়ির দেওয়ালে নিপুণ হাতে আঁকা একটা পদ্মফুল দেখিয়ে ত্রিলোচনের সেজদাদা শিবনাথ বলেন, “ওটা ওরই আঁকা।” ভাই ত্রিলোচন বিজেপির কতটা সক্রিয় সদস্য ছিলেন তা নিয়ে শিবনাথ বা তাঁর বাবা-মায়ের স্পষ্ট ধারণা না থাকলেও, স্থানীয় যুবক ছোটুলালের দাবি— ত্রিলোচন গ্রামে বিজেপির বুথ রক্ষা কমিটির প্রধান ছিলেন। তাঁর সক্রিয় ভূমিকাই ওই গ্রামে বিজেপি সদস্যের জয় সুনিশ্চিত করেছে।

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন খুন হওয়া ত্রিলোচনের বাবা

ছোটুলালের ওই গ্রামেই বাড়ি। বিজেপির বলরামপুর ব্লকের যুব মোর্চার সভাপতি। তাঁর দাবি, “তৃণমূলের লোকজন সেই কারণেই ওকে অপহরণ করে খুন করেছে। যাতে আর কেউ বিজেপি না করে।” ছোটুলালের রাজনৈতিক জীবনের শুরু এ রাজ্য তৃণমূলের উত্থানের পর থেকে। কিন্তু বছর পঞ্চান্নর রাজকিশোর মাহাতোর তা নয়। এক সময় সক্রিয় ভাবে সিপিএম করতেন। যে দিন বিভূতি মাওবাদীদের হাতে খুন হন, সে দিন তাঁকেও রেয়াত করেনি মাওবাদীরা। প্রাণে বাঁচলেও এখনও কোমরে গুলির চিহ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়ান তিনি। লাল ঝান্ডা ছেড়ে গেরুয়া পতাকা ধরেছেন তিনিও।

যেমন ধরেছেন বৈকুণ্ঠর ছেলে গঙ্গাধর বা ভাইপো বিজয়। তাঁদের অনেকেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন ত্রিলোচনের মৃত্যুতে। পোস্টার এঁটে খুনের এই তারিকা তাঁরা নতুন দেখছেন না। আতঙ্ক যে ছড়িয়েছে তা বেশ মালুম পাওয়া যাচ্ছিল গ্রামের মহিলাদের চোখমুখ দেখলে। মহিলাদের জটলা থেকেই উড়ে এল টুকরো মন্তব্য— “গ্রামের লোক না থাকলে কী বাইরের লোক এসে জোয়ান ছেলেটাকে মেরে ঝুলিয়ে দিতে পারে?” কথাটা শুনেই রাজকিশোরের দিকে তাকাতে তাঁর সংক্ষপ্ত জবাব, “তখন যারা মাওবাদী ছিল, তারাই তো এখন তৃণমূল করছে।” কথাটার রেশ ছড়িয়ে রয়েছে এই লালমাটির দেশের আনাচ-কানাচে।

দুলালের স্ত্রী এবং তিন সন্তান।

সুপুরডি থেকে জামশেদপুর রোড আড়াআড়ি পেরিয়ে মখমলের মত বাঘমুন্ডি রোড ধরে আট কিলোমিটার এগোলেই ডাভা গ্রাম। শনিবারই আরও এক বিজেপি কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রর চেহারা নিয়েছিল এই গ্রাম। সেখানেই দেখা মিলল আজন্ম পঙ্গু পোলিও আক্রান্ত ক্ষুদিরাম কুমারের। আর সবার মত তিনিও এক সময়ে সিপিএম-কেই ভোট দিতেন। কিন্তু এ বারে ভোট দিয়েছেন বিজেপিকে। তিনি বলেন, “ভোটের আগেই এলাকার তৃণমূল নেতারা শাসিয়েছিল, জিতে ফিরে এলে হাত কেটে দেবে।”

মঙ্গলময় সিংহ সর্দার।  এ বার বিজেপির টিকিটে পঞ্চায়েত সমিতিতে জিতেছেন তিনি।

ক্ষুদিরাম তাঁর ক্ষোভের কারণ গোপন করেননি। বহু দরবার করেও এলাকার তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকে প্রতিবন্ধী হিসাবে কোনও ভাতার ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি। যেমন ৭০ বছরের ভোন্দু মাঝির অভিযোগ, তাঁর কাছ থেকে স্থানীয় তৃণমূল নেতা হারাধন ২০০০ টাকা নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পোষা ছাগল বিক্রি করে সেই টাকা দিয়েছিলেন তিনি। সেই টাকা আজও পাননি ভোন্দু। আর তাই, শাসানি উপেক্ষা করে তাঁরা পিছপা হননি বিজেপি প্রার্থী ভূতনাথ কুমারকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনতে। একই ভাবে ভূতনাথও ভয় পাননি। তিনি ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে সিপিএম প্রার্থী হিসাবে পঞ্চায়েতে জিতেছিলেন। এ বার ফের জিতলেন বিজেপির প্রতীকে। ২০০৮ সালে ওই গেড়ুয়া অঞ্চলেই সিপিএমের উপপ্রধান ছিলেন দলদিরি গ্রামের মঙ্গলময় সিংহ সর্দার। তিনিও এ বার বিজেপির টিকিটে পঞ্চায়েত সমিতিতে জিতেছেন।

কেন সিপিএম ছেড়ে বিজেপিতে?

ভূতনাথের উত্তর খুব স্পষ্ট, “২০০৯ সালে ডাভা গ্রামেই মাওবাদীদের হাতে খুন হয়েছিল সিপিএমের লোকাল কমিটির সদস্য শশধর কুমার। সিপিএম পার্টির এক শ্রেণির নেতার দুর্নীতি এবং ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করেছিল। সিপিএম-ও একই ভাবে হাত কেটে দেওয়ার কথা বলত। মানুষ প্রতিরোধ করতেই তারা হারিয়ে গিয়েছে। এখনও মানুষ প্রতিরোধ করছে। তাই আমি বিজেপিতে। মানুষের সঙ্গে থাকতে।” আর বিজেপি যদি শাসক দলের চাপের কাছে পিছু হটে? মঙ্গলময়ের জবাব আরও সংক্ষিপ্ত, “এখানকার মানুষ নিজেদের মত করেই প্রতিরোধ করবে।”

পঞ্চায়েত সদস্য ভূতনাথ কুমার

বিকেল হয়ে এসেছে। বাঘমুণ্ডি-অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। জমি চষে গ্রামে ফিরছেন কৃষকরা। এলাকার রাজনীতির ফসলের ভবিষ্যত্ কী, একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে আবারও দাঁড়িয়ে আছে এই সব গ্রাম। এক বছর পর এলে কী দেখতে পাব এখানে? এই সব ভাবতে ভাবতেই ফেরার রাস্তা ধরা।

—নিজস্ব চিত্র।