ভাগলপুরে ঘোষদের জমিদারি। এই পরিবারের বর্তমান বাস বৈদ্যবাটির নিমাইতীর্থের ঘাট। সেখান থেকেই জমিদারি দেখাশোনা করেন তাঁরা। ঘোষবাড়ির গোঁরাচাদ ঘোষের জন্য সম্বন্ধ এনেছে ঘটক। পাত্রী দেখে ভারি পছন্দ হল সবার। সুন্দরী সুলক্ষণা মেয়ে। নাম তারামণি। এই তারামণিকে বিয়ে করে গোরাচাঁদ ঘোষ সপরিবারে চলে এল চন্দননগরের ফটকগোড়ায়। গঙ্গার ধারে সুন্দর শহর। কিছুদিন আগে পর্যন্তও এখানে  ফরাসি শাসন ছিল। তারপর শুরু হল অন্য ইতিহাস।  ক্লাইভের তোপের আওয়াজ তখনও ভোলেনি শহর।

সে এক অন্যরকম সময়। ফরাসডাঙ্গার দখলদারি যাচ্ছে ইংরেজদের হাতে। শহরটাও যে বদলাচ্ছে। ফরাসি বণিকদের পায়ের চিহ্নের ওপর পা ফেলছে ইংরেজ বণিকরা। গঙ্গা পাড়ের শহর। ব্যবসাবাণিজ্যের সুবিধা এখান থেকে।  বিদেশি বণিক, তাঁদের নানা কারবার আর পণ্যের পসরা। ছবির মত জনপদে বেশ কিছু পাকা বাড়ি। এই বাড়িগুলির স্থাপত্য চোখে পড়ার মত। মাটির বাড়িও রয়েছে বিস্তর। বিবাহসূত্রে গোরাচাঁদবাবু প্রচুর জমিজমা পেয়েছেন ফটকগোড়ায়। তিনি এখানেই থেকে যাবেন স্থির করলেন।

বসবাস শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ির দুপাশে দুটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন। ভবানীশ্বর শিব মন্দির তাদের নাম। শুরু করলেন দুর্গা পুজো। কিছুদিন আগেই কৃষ্ণনগরে শুরু হয়েছে জগদ্ধাত্রী পুজো। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় সেই পুজো শুরু করেছেন। চন্দননগরেও ধূমধাম করে শুরু হয়েছে এই পুজো।

অষ্টমীর পুজোর সময় কল্যাণী পুজো হয়।

চাউলপট্টি কাপড়পট্টির ব্যবসায়ীরা বড় করে এই পুজো করেন। সমৃদ্ধির দেবী জগদ্ধাত্রী। শোনা যায় এই দেবীর পুজো করলে মঙ্গল হয় সকলের। গোরাচাঁদ ঘোষ জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করলেন তাঁর বাড়িতে। এই পরিবারের উত্তর পুরুষ নন্দলাল ঘোষের আমলে সবাই একডাকে চিনত এই পরিবারকে। নামী কবিরাজ ছিলেন তিনি। মানুষ শ্রদ্ধা ভক্তি করত খুব। তাঁর আমলে আরও জমজমাট হল পুজো। এই এলাকার মাঠ পুকুর রাস্তা অনেক কিছুই এখনও তাঁর নামেই। চন্দননগরের বাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম প্রাচীন এই পুজোর বয়স আনুমানিক ২২৫ বছর।

পুরনো প্রথা মেনে কুমোর পাড়া থেকে ঠাকুর আসেন পুজোর কিছু আগে। চন্দননগরের অন্যান্য পুজোর মত শোলার সাজ এই বাড়িতে হয়না। একচালার ঠাকুর থাকেন ডাকের সাজে। ঠাকুরের নিজস্ব গয়না আছে প্রচুর। চৌকিতে আল্পনা দিয়ে ঠাকুর তোলার পর বাড়ির মেয়েরা সেই গয়নাগুলি পরিয়ে দেন ঠাকুরকে। পুজোর সময় ঠাকুরঘর থেকে নারায়ণ এবং ধান্যলক্ষ্মী নামানো হয়। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর পুজো হয় নবমীতে। সারা দিন ধরে পুজো চলে। নবমীর প্রথমভাগে সপ্তমীপুজোর সময় সপ্তমীর ঘট বসিয়ে আরতি এবং অঞ্জলি হয়। অষ্টমীর পুজোর সময় কল্যাণী পুজো হয়।

দুর্গা পুজোর মতই ১০৮টি প্রদীপ সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া হয়।

ঘোষবাড়ির প্রতিটি পরিবারের প্রবীণদের নামে আলাদা আলাদা করে সংকল্প করা হয়। দুর্গা পুজোর মতই ১০৮টি প্রদীপ সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া হয়। নবমীর হোম শান্তি জলের পর পুজোর বিধি শেষ হয়। ঘোষ বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন নিরামিষ খাওয়া হয়। দশমীর দিন বরণ করার আগে মাছ মুখে দিয়ে তবে বরণ করা হয়। পুজোর জন্য বাড়িতে তিন রকমের নাড়ু তৈরি করা হয়। গুড়ের নাড়ু, চিনির নাড়ু এবং তিলের নাড়ু। ঠাকুরকে ভোগে নানারকম ফল, নাড়ু, সন্দেশ, ছানা, চিনি, মিষ্টি মেওয়া দেওয়া হয়। নৈবেদ্যর চাল, আখ, কলা, পানের খিলি দিয়ে সাজিয়ে মাথায়  ত্রিভুজাকৃতি নাড়ুর মত জিনিস দিয়ে দেওয়া হয় একে বলে আগমণ্ডা।

এছাড়াও লুচি, নুন ছাড়া পাঁচ রকমের ভাজা, দই দেওয়া হয়। পুজো শেষে দশমীর বরণের পর সিঁদুর খেলা হয়। সিঁদুর, চাল টাকা দিয়ে ঠাকুর বিসর্জনের সময় কনকাঞ্জলি দেন বাড়ির বড় ছেলে। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা আঁচল পেতে কনকাঞ্জলি নেন। যিনি কনকাঞ্জলি নেন, ঠাকুর বেরোনর আগে পর্যন্ত তিনি আর ঠাকুরের মুখ দেখতে পারেন না। ঠাকুর বাড়ি থেকে বেরনোর পর আবার ঠাকুর দর্শন করতে পারেন তিনি।

এই দুশো বছরে অনেক পাল্টে গিয়েছে চন্দননগর। কখনও ফরাসিদের আধিপত্য কখনও ইংরেজদের। শহরের হাতবদল হয়েছে অনেকবার। এখন চন্দননগর তার সব ঐতিহ্য সঙ্গে নিয়ে এক আধুনিক শহর। এই সব উত্থান পতনের ইতিহাস বুকে নিয়ে প্রাচীন বাড়ির পুজোগুলির ধারা বহমান। তাই  পুজো শুরুর দিনের মত আজও ঘোষবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজো হয় সমান শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে।

আরও পড়ুন: ‘খামোকা টাকা নেব কেন?’, বিয়েতে বরের কাছ থেকে বই পেলেন সানজিদা

আরও পড়ুন: বন্ধুদের উদ্যোগে উদ্ধার অসুস্থ ঘোড়া

ছবি সৌজন্য: ঘোষ পরিবার