কসবায় নার্সিংহোমের আইসিইউয়ে শুয়ে এক ব্যক্তি। বয়স বোঝা দায়। কারণ মুখ থেকে গলা পর্যন্ত আগুনে ঝলসে কালো হয়ে গিয়েছে। গলা থেকে বুক, দু’হাতের পুরো অংশ এবং দু’পায়ে ব্যান্ডেজ জড়ানো। তবে জ্ঞান হারাননি বছর বিয়াল্লিশের পুলকানন্দ মাইতি। তখনও জানেন না, শরীরের কত শতাংশ পুড়ে গিয়েছে। একটাই কথা বারবার বলেছেন, ‘‘স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলবেন, যেন ভয় না-পায়।’’

হলদিয়া পেট্রোকেমে শুক্রবার বেলা সওয়া ১১টা নাগাদ ন্যাপথা ক্র্যাকার ইউনিটে আগুন লাগে। স সংস্থার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পুলকানন্দ সেই সময় সেখানে কাজ করছিলেন। ছিলেন প্রসেস মেম্বার সৌগত সামন্ত, শিফট ইনচার্জ পারিজাত ভট্টাচার্য, বিভিন্ন ইউনিটের কিছু কর্মী এবং চুক্তি-শ্রমিকেরা।

হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড বা এইচপিএলের আহত ১৩ জনকে গ্রিন করিডর করে কলকাতায় আনার ব্যবস্থা করা হয়। একের পর এক অ্যাম্বুল্যান্সে করে তাঁদের পাঠানো হয় কলকাতায়। মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মাধ্যমে আগুন লাগার খবর পৌঁছয় দিল্লিতে থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। মমতাই ডিজি-কে নির্দেশ দেন, ঝলসে যাওয়া কর্মীদের হলদিয়া থেকে গ্রিন করিডর করে অ্যাম্বুল্যান্সে তাড়াতাড়ি কলকাতায় আনতে হবে। তৎপরতা শুরু হয়ে যায় হাওড়া ও কলকাতা পুলিশে। মাত্র এক ঘণ্টায় চারটে অ্যাম্বল্যান্সে প্রথম দফায় ছ’জনকে আনা হয় ব্রড স্ট্রিটের একটি বেসকারি নার্সিংহোমে। শরীরের নিম্নাংশ ঝলসে যাওয়া কর্মীরা অ্যাম্বুল্যান্স থেকে পরপর হুইলচেয়ারে বা হেঁটে ভিতরে ঢোকেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের লিফটে করে নিয়ে গিয়েই চিকিৎসা শুরু করে দেন নার্সিংহোম-কর্তৃপক্ষ। পরের দফায় আরও ছ’জনকে এনে ভর্তি করানো হয় কসবার নার্সিংহোমে। একবালপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে এক জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

দুপুরের পরে কসবার নার্সিংহোমে গিয়ে দেখা যায়, ছ’জনের মধ্যে পাঁচ জনের অবস্থা স্থিতিশীল হলেও পুলকানন্দের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এস কে দাউদ আলি নামে এক চুক্তি-কর্মীর দেহ খুব একটা না-ঝলসালেও তাঁর শরীরে হাইড্রোকার্বন গ্যাস ঢুকে গিয়েছে। ফুসফুস কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার পরীক্ষা চলছে। অন্যদেরও এক্স-রে থেকে শুরু করে সব ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়েছে। ব্রড স্ট্রিটের নার্সিংহোমের তরফে জানানো হয়, ছ’জনের শরীর ঝলসে গিয়েছে। সৌগত, পারিজাত ভট্টাচার্য ছাড়াও নারায়ণ মাঝি নামে এক প্রৌঢ়ের অবস্থা বেশ খারাপ।

আহত কর্মী-ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে আসা ওই প্ল্যান্টের আইএনটিইউসি-র সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী ভূপাল সামন্ত জানান, বিকট শব্দে কিছু ফাটার শব্দ হতেই তিনি দেখেন, সামনের ন্যাপথা ক্র্যাকার ইউনিট থেকে কালো গোলার মতো কিছু বেরোচ্ছে। বিস্ফোরণের মতো কিছু হয়েছে বুঝে তিনি ‘ফায়ার অ্যালার্ম’-এর জন্য এমসিভি-বোতামগুলি ভেঙে দেন, যাতে পাশের ইউনিটে আগুন না-ছড়ায়। সারা প্ল্যান্টে আগুন লাগার খবর ছড়াতেই দমকলের ইঞ্জিন পরপর ঢুকতে শুরু করে। তার মধ্যে ঝলসে যাওয়া কর্মীরা নিজেরাই হেঁটে আগুনের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছেন দেখে কিছুটা হলেও স্বস্তির শ্বাস ফেলেন তিনি। ভূপাল বললেন, ‘‘এত বড় আগুন আগে দেখিনি।’’