কথায় বলে ‘সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর এক বার’! মকর সংক্রান্তির এই মহামেলার আয়োজনে প্রতি বছরই কোনও খামতি রাখা হয় না বলে দাবি রাজ্য সরকারের। প্রশাসন সূত্রের খবর, মেলার জন্য সরকারের খরচ হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা! এর মধ্যে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা খরচ করেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক। বাকি ৪০-৪৫ কোটি টাকা খরচ করে সেচ, পূর্ত এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর। বিনিময়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য তারিফ ছাড়া সরকারের প্রাপ্তি থাকে না আর কিছুই। কারণ, প্রণামী বাবদ আয়ের মালিকানা ভিন্‌ রাজ্যের মন্দির কর্তৃপক্ষের। 

সরকারি ভাবে গঙ্গাসাগর মেলার সময়সীমা ১২ থেকে ১৫ জানুয়ারি। কিন্তু পুণ্যার্থী সমাগম শুরু হয়ে যায় ১০ তারিখ থেকেই। তাঁদের জন্য বন্দোবস্তের শুরু কলকাতার উট্রাম ঘাট থেকে। সেখানে পুণ্যার্থীদের থাকা, জল সরবরাহ-সহ একাধিক বন্দোবস্ত করতে হয়। উট্রাম ঘাট থেকে পুণ্যার্থী হয় কাকদ্বীপ-৮ নম্বর লট-কচুবেড়িয়া অথবা নামখানা-চেমাগুড়ি হয়ে গঙ্গাসাগর যান। এই যাত্রাপথে অন্তত ১০টি থাকার জায়গা তৈরি করে প্রশাসন। মুড়িগঙ্গা নদী পারাপারের জন্য ৮ নম্বর লট, নামখানা, কচুবেড়িয়া ও চেমাগুড়িতে তৈরি করা হয় অন্তত ১৮টি জেটি। সেই সব জেটিতে পৌঁছনোর জন্য তৈরি করতে হয় নতুন রাস্তা। আবার কপিল মুনির মন্দির থেকে সমুদ্র সৈকতের দিকে যেতেও অন্তত পাঁচটি রাস্তা তৈরি করে পূর্ত দফতর। একটি হেলিপ্যাড-সহ অন্তত পাঁচটি অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ডও তৈরি হয়। পুণ্যার্থীদের যাতায়াতের জন্য অন্তত ২৫০টি বাসের ব্যবস্থা করে পরিবহণ দফতর। অন্তত দেড়শোটি জলযানের ব্যবস্থা রাখে জেলা প্রশাসন। 

মেলা উপলক্ষে বিশেষ ভাবে ড্রেজিং করতে হয় মুড়িগঙ্গা নদীর। তাতে ভেসল পারাপারের সময় দিনে ১২ ঘণ্টা থেকে বেড়ে ২০ ঘণ্টা হয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত বেসরকারি একটি সংস্থা ড্রেজিংয়ের কাজ করত। তখন খরচ হয়েছিল ২১ কোটি টাকা। এখন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে পাঁচ বছরের জন্য ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। খরচ হচ্ছে বছরে পাঁচ কোটি। 

সরকারি হিসেবে ১৫-২০ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম হয় গঙ্গাসাগরে। তাঁদের সাহায্য করতে কয়েক’শো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নিয়োগ করেন জেলাশাসক। নিরাপত্তার জন্য থাকেন প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশকর্মী এবং দু’হাজার সিভিক ভলান্টিয়ার। আর সামগ্রিক দেখভালের জন্য প্রায় তিন হাজার আধিকারিক উপস্থিত থাকেন মেলায়। এঁদের সকলের যাতায়াত ছাড়াও থাকা-খাওয়ার জন্য বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয় সরকারের। 

গঙ্গাসাগর মেলায় বিদ্যুৎ খরচ বাবদ এ বছর বিদ্যুৎ দফতরকে এখনও পর্যন্ত চার কোটি টাকা দিয়েছে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর। বিদ্যুৎ বিভ্রাট রুখতে আড়াই কোটি টাকা খরচ করে কচুবেড়িয়া থেকে রুদ্রনগর পর্যন্ত নতুন কেবল লাইন বসানো হয়েছে। নিকটবর্তী সাবস্টেশনগুলির সরবরাহ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও খরচ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিষেবা ঠিক রাখতে ৫০ জন সরকারি বিদ্যুৎকর্মী ছাড়াও বাইরে থেকে আনা হবে আরও ১৫০ জনকে। এ ছাড়া, গত কয়েক বছর ধরে সব পুণ্যার্থীর জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা করে বিমার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার প্রিমিয়াম বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা রাজ্যই দেয়।

মেলা থেকে আয়ের অঙ্ক কত? সূত্রের দাবি, ১২ থেকে ১৫ জানুয়ারি, এই চার দিনে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা প্রণামী পড়ে মন্দিরে। যার কিছুই সরকারের তহবিলে যায় না।  অনেকেই বলছেন, গঙ্গাসাগরে প্রচুর জনসমাগমের ফলে দূষণ হয়। তাই পুণ্যার্থীদের উপরে কর বসানো হবে না কেন? মাথাপিছু সামান্য টাকা হলেও কয়েক লক্ষ পুণ্যার্থীর জন্য সামগ্রিক আদায় বেশি হবে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রাক্তন মুখ্য আইন আধিকারিক বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘ভিন রাজ্য থেকে লোকে অনেক টাকা খরচ করে গঙ্গাসাগরে আসে। সামান্য কর দিতে তাঁরা আপত্তি করবেন না। মেলার আগে ও পরে যে পরিমাণে পরিবেশ দূষণ হয়, ওই করের টাকায় সেই পরিবেশ রক্ষা করা যেতে পারে।’’