রোদে পুড়ে গিয়েছে গায়ের রং। ক্ষয়াটে শরীর। মেয়ের লেখা গল্প পড়াতে তাঁকে বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন জলপাইগুড়ির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর লোপামুদ্রা অধিকারী। পুরোটা পড়তে পারেননি। তার আগেই দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই ভদ্রলোক। তার পরে হঠাৎই বলে ওঠেন, “সত্যি তো, আমি ওকে ভালবাসতেই পারিনি। তবু ও আমার কথা লিখল!’’

এক সময়ে পাড়ার মোড়ে ছোট্ট দোকান ছিল। মেয়ে তখন খুবই ছোট। মেয়েকে কোলে নিয়ে সারাদিন তাঁকে দোকান সামলাতে দেখেছেন বাসিন্দারা। মেয়ের যখন চার বছর বয়স, তখন তাকে নিয়ে স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে যান। সেই মেয়েই এখন জলপাইগুড়ির কাছে গড়ালবাড়ি হাইস্কুলে পড়ে। সেখানকার বাংলার শিক্ষকের নির্দেশে গল্প লিখতে গিয়ে বলে ফেলেছে নিজের জীবনের কাহিনি। গত ন’বছর ধরে মায়ের বাপের বাড়িতে বড় হওয়া সেই মেয়ে লিখেছে, “আমি জানি না বাবার ভালবাসা কাকে বলে। কারণ, কোনও দিন বাবার ভালবাসা পাইনি। আমার ইচ্ছে, বাবা-মা-ভাইবোন মিলে একসঙ্গে থাকি।”

মেয়েটির এই লেখা পড়ার পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট হয়েছেন বাবা এবং মাকে নিয়ে আলোচনায় বসার। কাউন্সিলর লোপামুদ্রা দেবী, তাঁর স্বামী সুবীরবাবুও চাইছেন মধ্যস্থতা হোক। লোপামুদ্রা দেবীর ওয়ার্ডেরই বাসিন্দা মেয়েটির বাবা। তাঁদের ডাকে এ দিন দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি।

মেয়ের বাবার বিরুদ্ধে মেয়ের মায়ের বিস্তর অভিযোগ। মা জানিয়েছেন, আয়ের প্রায় সবটাই লটারির টিকিট কিনে উড়িয়ে দিতেন তাঁর স্বামী। এমনকি, গায়ে হাত তোলার অভিযোগও করেছেন ছাত্রীর মা। জানিয়েছেন, শ্বশুরবাড়িতে বৃদ্ধা শাশুড়ি ছাড়া স্বামীর তিন ভাই ও পরিবারের বাকিরা থাকেন। ছাত্রীর মায়ের কথায়, “আমার স্বামী নিজের আচার-আচরণ না পাল্টালে আমার ওখানে যাওয়া সম্ভব নয়।”

শনিবার সকালে কাউন্সিলরের কাছ থেকে মাথা নিচু করে সব অভিযোগ শুনলেন ছাত্রীর বাবা। তার পর জানালেন, স্ত্রীর প্রতি তাঁরও রাগ-অভিযোগ রয়েছে। জানালেন, স্ত্রী-মেয়ে চলে যাওয়ার পরে বাড়িতে প্রায় থাকেনই না। সকাল আটটার আগে বেরিয়ে যান, ফেরেন, রাত এগারোটায়। তবে স্ত্রী, মেয়ে যদি ফিরতে চান, তা হলে পুরনো সব কথা ভুলে যাবেন তিনি। মেয়ের মুখ চেয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাতেও বসতে রাজি তিনি। বলেন, “এক বার কোর্টের নোটিস পাঠিয়েছিলাম। তবে মেয়েটা বড় হচ্ছে। আর মামলা চাই না। মেয়েকে নিয়ে একসঙ্গে থাকতে চাই।’’