কলকাতা থেকে মফস্‌সল, ডেঙ্গির দাপট শুরু হয়ে গিয়েছে সর্বত্রই। ঘটছে প্রাণহানিও। একই সঙ্গে উঠছে তথ্য গোপন করার অভিযোগ। মঙ্গলবারেই সাউথ পয়েন্ট স্কুলের এক ছাত্র ডেঙ্গিতে মারা গিয়েছে বলে বেসরকারি হাসপাতালের রিপোর্টে জানানো হয়েছে। অথচ কলকাতা পুরসভার নথি বলছে, চলতি মরসুমে ডেঙ্গিতে এখনও কেউ মারা যাননি!

কলকাতার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের মুরারিপুকুর লেনের কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (কেআইটি) আবাসনের বাসিন্দা কৃষ্ণা হাজরা (৩৫) ফুলবাগানের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি হন ২৪ অগস্ট। উপসর্গ ছিল জ্বর, বমি, পেটে যন্ত্রণা। প্রাথমিক পর্বের পরীক্ষার পরে চিকিৎসকেরা জানান, রোগিণীর অগ্ন্যাশয়ে সমস্যা আছে। চিকিৎসায় ফল না-হওয়ায় রক্ত পরীক্ষা করা হয়। তার রিপোর্টে বলা হয়, ডেঙ্গি হয়েছে কৃষ্ণাদেবীর। সোমবার ওই মহিলার মৃত্যু হয়।

মৃতার ডেথ সার্টিফিকেটে ডেঙ্গি পজিটিভ লেখা থাকলেও মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কলকাতা পুরসভা। ‘‘ওঁর মৃত্যুর পরে প্রেসক্রিপশন এবং রক্তের রিপোর্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। তাতে অগ্ন্যাশয়ের অসুখের রিপোর্টও আছে। আবার ডেঙ্গি পজিটিভও ছিল। তাই পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার,’’ বলেন পুরসভার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা তপনকুমার মুখোপাধ্যায়।

তা হলে আসল রোগটা জানা যাবে কী ভাবে? মেয়র-পারিষদ অতীন ঘোষ বলেন, ‘‘মশাবাহিত রোগে মৃত্যু হলে তা ঘোষণা করার ভার রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর গড়া বিশেষ কমিটির। পুরসভার নয়। তাই সেখানেই সব কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে।’’ মঙ্গলবার মৃত সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছাত্র আরুষ দত্তের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্রও গিয়েছে ওই কমিটির কাছে। তাই তাদের নথি অনুযায়ী চলতি মরসুমে ডেঙ্গিতে কোনও প্রাণহানির খবর নেই বলে দাবি পুরসভার। হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনাতেও ডেঙ্গিতে রোগীর মৃত্যুর পরে স্বাস্থ্য ভবনের কমিটি তাতে সিলমোহর দেয়নি। বেসরকারি সূত্রের হিসেব অনুযায়ী রাজ্যে চলতি মরসুমে ডেঙ্গিতে অন্তত পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য দফতরের হিসেবে সংখ্যাটা এখনও শূন্য!

পুরসভা ও স্বাস্থ্য দফতরের এই গোপনীয়তার আড়ালে রাজ্যে ডেঙ্গি সংক্রমণ আরও তীব্র হবে হবে বলে আশঙ্কা করছেন পরজীবী বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলছেন, কোথায় কোথায় ডেঙ্গি হচ্ছে, সেই বিষয়ে যত তাড়াতাড়ি নিশ্চিত হওয়া যাবে, ততই ভাল। তা হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপরে নজরদারি চালানো যেতে পারে। পরজীবী বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, যে-উপসর্গ নিয়ে মুরারিপুকুর লেনের মহিলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, কয়েক বছর ধরে সেটাই ডেঙ্গির অন্যতম লক্ষণ। ডেঙ্গিতে অন্যান্য অঙ্গের মতো অগ্ন্যাশয়েরও ক্ষতি হয়। তাই ডেঙ্গিতেই যে ওই মহিলার অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি হয়েছে, তা মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়— প্রশ্ন তুলছেন অনেক পরজীবী বিশেষজ্ঞ।

কৃষ্ণাদেবী উত্তর কলকাতার যে-এলাকার বাসিন্দা, সেই মুরারিপুকুর লেনের সাধারণ মানুষ পুর পরিষেবা নিয়ে বেজায় ক্ষুব্ধ। বুধবার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অপরিচ্ছন্ন নর্দমা। জল জমেছে চতুর্দিকে। ন’বছরের স্কুলপড়ুয়া থেকে পঞ্চান্ন বছরের প্রৌঢ় পর্যন্ত অনেক বাসিন্দাই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুরসভায় বারবার খবর পাঠানো সত্ত্বেও কোনও তৎপরতা চোখে পড়েনি। কৃষ্ণাদেবীর স্বামী অধীর হাজরার প্রশ্ন, ‘‘এলাকা সাফাই নিয়েও দড়ি টানাটানি চলে। তার জেরেই স্ত্রীকে হারালাম। এখন সাত বছরের ছেলেকে কী ভাবে সামলাব, জানি না। মৃত্যুর দায় কে নেবেন?’’ অধীরবাবুর অভিযোগ, তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পরে দু’দিন কেটে গিয়েছে। কিন্তু পুরসভার পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেননি।

তবে ওই বরোর স্বাস্থ্য আধিকারিক জানান, ২৩ অগস্ট খবর পেয়ে পরের দিনেই পুরসভার টিম গিয়ে মশা মারা তেল ছড়ায়। এমনকি কৃষ্ণাদেবীদের আবাসনের সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করে ভিতরের জঞ্জাল নিয়ে সতর্ক করে প্রচারপত্র দেওয়া হয়।  মৃতার স্বামীও ২৪ অগস্ট স্বাক্ষর করেছেন পুরসভার কাজের নোটবুকে।