হাজারিবাগ
স্বাস্থ্যকর জলবায়ু আর সবুজ বনানীর জন্য পর্যটকদের প্রিয় জায়গা হাজারিবাগ। বিশেষ করে যাঁরা অরণ্যপ্রেমী তাঁদের কাছে প্রধান আকর্ষণ হাজারিবাগ জাতীয় উদ্যান।
জনশ্রুতি আছে এক সময়ে এখানে হাজার বাগিচা ছিল। সেই জন্য স্থানটির নামকরণ হয় হাজারিবাগ।
কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে সরাসরি যেতে গেলে হাওড়া স্টেশন থেকে যাচ্ছে— দুন এক্সপ্রেস, হাওড়া-দিল্লি-কালকা মেল, হাওড়া-মুম্বই মেল প্রভৃতি। নামতে হবে হাজারিবাগ রোড স্টেশনে। এ ছাড়াও কলকাতা স্টেশন থেকে ছাড়ছে ১৩১৫১ আপ জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস। কলকাতা স্টেশন থেকে ছাড়ে বেলা ১১-৪৫ মিনিটে এবং হাজারিবাগ রোড স্টেশনে পৌঁছয় ১৮-৩৩ মিনিটে। কলকাতার বাবুঘাট থেকেও বাস যাচ্ছে হাজারিবাগ। ছাড়ে রাত ৯টায়।
কোথায় থাকবেন: ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজমের কমপ্লেক্স (২৩৫১৭৮/০৯৪৩১৮৮২০৯৪)। ডাবলবেড: ১০০০ টাকা থেকে শুরু। এসি: ১৫০০ টাকা। মোটামুটি একই রেঞ্জে আরও কতগুলি হোটেল— উপহার (২২২২৪৬), প্রিন্স (২২২৩৫২), আম্রপালি (২৬৭৮৯৮)। ক্যানারি হিলে আছে ফরেস্ট রেস্ট হাউস (২২২৩৩৯)। বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ : ডিএফও, বনভবন, অরণ্য বিভাগ, হাজারিবাগ (পশ্চিম)। হাজারিবাগের এসটিডি কোড: ০৬৫৪৬।
কী দেখবেন: হাজারিবাগের মূল আকর্ষণ হাজারিবাগ জাতীয় উদ্যান। শহর থেকে মাত্র ১৯ কিমি দূরে। রামগড়ের মহারাজার হাতে ১৯৫৪ সালে এই জাতীয় উদ্যানের সূচনা। আয়তন ১৮৬ বর্গকিমি। এই জঙ্গলে রয়েছে বাঘ, ভাল্লুক, নীলগাই, বুনো শুয়োর, শম্বর, চিতাবাঘ, হরিণ, শজারু, প্যান্থার প্রভৃতি। দশটি ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে অরণ্যের রূপ ও পাখি, বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ রয়েছে। জিপে ঘোরা যায়। এই অরণ্য সারা বছর খোলা থাকলেও এখানে যাওয়ার সেরা সময় অক্টোবর থেকে এপ্রিল।
শহর থেকে জগদীশপুর যাওয়ার পথে পড়ে ক্যানারি হিল বা অবজারভেটরি হিল। এই পাহাড়ের মাথায় চড়ে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখার মজাই আলাদা। রিকশায় চড়ে ঘুড়ে আসা যায় হাজারিবাগ লেক থেকে। পাশেই স্বর্ণজয়ন্তী পার্ক। জাতীয় উদ্যানের পাশেই সলপর্ণী ড্যামের আকর্ষণ কম নয়। এটি একটি পিকনিক স্পটও বটে।

হাজারিবাগ থেকে ৪-৫ কিমি দূরে রাঁচি-পটনা রোডের ধারে আর একটি দারুণ পিকনিক স্পট উপওয়ান। এখানে বোটিংয়ের ব্যবস্থাও আছ। হাতে সময় থাকলে দেখে নিন ৬৫ কিমি দূরের উষ্ণ প্রস্রবণ সুরজ কুণ্ড। ইসকো ভিলেজে পাথরের উপর আঁকা ৮০০০ বছরের প্রাচীন চিত্র ইসকো রক পেন্টিং, বরাকর নদীর জলকে পাহাড়ের পাদদেশে বাঁধ দিয়ে ডিভিসি নির্মাণ করেছে তিলাইয়া ড্যাম। এ ছাড়াও দর্শনীয় ১৪ কিমি দূরের চন্দ্রা ফলস । ভদ্রকালী মন্দির।

রাজরাপ্পা: ঝাড়খণ্ডের একটি পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে দেবী ছিন্নমস্তা ভীষণ জাগ্রত বলে বিশ্বাস স্থানীয় মানুষদের। প্রতিদিন প্রচুর ছাগ বলি হয় এখানে। অবস্থান রামগড় চিত্রপুর রোড। মন্দিরের গা থেকে প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। কথিত আছে, একান্ন সতীপীঠের একটি এই স্থান। দেবীর ছিন্নমুণ্ড এখানে পড়েছিল।

রাঁচি থেকেও গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে নেওয়া যায় রাজরাপ্পা।

 

টাটানগর/জামশেদপুর

জামশেদপুর বা টাটানগরের প্রসিদ্ধি শিল্পনগরী রূপে। জামশেদপুরের রূপকার জামশেদজি টাটা। ১৯০৮ সালে অবিভক্ত বিহারে টাটা-রা গড়ে তোলেন ইস্পাতনগরী। পাহাড়, জঙ্গল আর লেকের সহাবস্থানে সেজে উঠেছে স্বমহিমায়।

কী ভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে ঘাটশিলার সব ট্রেনেই যাওয়া যাচ্ছে টাটানগর। হাওড়া থেকে দূরত্ব ২৫১ কিমি। ঘাটশিলা থেকে টাটা ট্রেনপথে ৩৬ কিমি। বাসে বা গাড়িতেও যাওয়া যায়। সড়ক পথে দূরত্ব ৪৯ কিমি।

কোথায় থাকবেন: থাকার জন্য এই হোটেলগুলি বেশ ভাল। হোটেল মেরিডিয়ান (২২৫৭৬৭) ডাবলবেড ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। হোটেল দ্য বুলেভার্ড (২৪২৫৩২১/২২, ২৪৩৪৪১১) ডাবলবেড ১০০০-৩০০০ টাকা। হোটেল দ্য কা়ঞ্চন (২৪২৮২৯০) ভাড়া ৯০০ থেকে ১৪০০ টাকা। হোটেল সিদ্ধার্থ (২৪৩৩০০৮-০১৪) ভাড়া ৯০০-১৩০০ টাকা।

এ ছাড়াও আছে নটরাজ, দ্য গ্র্যান্ড প্রভৃতি হোটেল। জামশেদপুরের এসটিডি কোড: ০৬৫৭

ডিমনা লেক

কী দেখবেন: দলমা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি/দলমা পাহাড়।

এই সেই দলমা পাহাড়, যেখানকার দামাল হাতির দল মাঝেমধ্যেই স্থানীয় লোকালয়ে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। ৩০৬০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট দলমা পাহাড়ে ১৯৫ বর্গকিমি জুড়ে উঠেছে ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি। হাতি ছাড়াও আছে ময়ূর, হরিণ, লেপার্ড, বার্কিং ডিয়ার, বন্য শুয়োর প্রভৃতি। শহর থেকে চান্ডিলের দিকে যেতে ১৩ কিমি দূরে দলমা।

জুবিলি পার্ক

ডিমনা লেক ও চান্ডিল ড্যাম: দলমা পাহাড়ের পাদদেশে ডিমনা লেক ও চান্ডিল ড্যাম। ৭০ ফুট গভীর, ৭ কিমি লম্বা ও ২ কিমি চওড়া এই লেক থেকেই শহরে জলসরবরাহ করা হয়। আছে বোটিংয়ের ব্যবস্থাও।

জুবিলি পার্ক: ১৯৫৮ সালে ২২৫ একর জমির উপর জামশেদজি টাটা গড়ে তোলেন এই সুন্দর পার্কটি। নানা রকমের ফুল ও অন্যান্য গাছ, নানা প্রজাতির গোলাপ শোভা বর্ধন করেছে পার্কটির। আছে মোঘল গার্ডেন, চিল্ড্রেন গার্ডেন, ফোয়ারা। সন্ধ্যায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের আসর বসে।

এ ছাড়াও অবশ্যই দর্শনীয়: খড়কাই ও সুবর্ণরেখা নদীর সঙ্গমস্থল দো-মোহালি, টাটা স্টিল জুলজিক্যাল পার্ক, হাডকো লেক, স্যার সোরাবজি পার্ক, আর ভি টাটা স্পোর্টস কমপ্লেক্স।

টাটা স্টিল জুলজিক্যাল পার্ক

ঘাটশিলা

ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ ঘাটশিলা বাঙালি পর্যটকদের কাছে বরাবরই আকর্ষণীয়। চারিদিকে অনুচ্চ পাহাড়শ্রেণি, মাঝে আপনবেগে পাগলপারা সুবর্ণরেখা, অন্য দিকে শাল-মহুয়ার জঙ্গল ঘাটশিলাকে ব্যতিক্রমী রূপ দিয়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি। কলকাতা থেকে দূরত্ব ২১৪ কিমি।

কী ভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে প্রতিদিন সকাল ৬-৫৫ মিনিটে ছাড়ছে হাওড়া-তিতলাগড় ইস্পাত এক্সপ্রেস। ঘাটশিলায় পৌঁছয় বেলা ৯-৫৪ মিনিটে। ১২৮৬৫ আপ লালমাটি এক্সপ্রেস মঙ্গল ও শনিবার সকাল ৮-৩০ মিনিটে ছেড়ে ঘাটশিলায় পৌঁছয় ১১-৩৮ মিনিটে। ১২৮১৩ স্টিল এক্সপ্রেস বিকাল ১৭-৩০ মিনিটে হাওড়া ছেড়ে ঘাটশিলায় পৌঁছয় রাত ২০-৩৬ মিনিটে। এ ছাড়াও সকাল ৯-৩০ মিনিটে হাওড়া ছেড়ে একটি লোকাল ট্রেন ঘাটশিলা যাচ্ছে ১৩-৪০ মিনিটে। খড়্গপুর থেকেও ট্রেনে ঘাটশিলা যাওয়া যায়। কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায়।

বুরুডি লেক।

কোথায় থাকবেন: শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে নির্জন পরিবেশে ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজমের হোটেল বিভূতিবিহার (০৯৪৩১৩৮৩৫৮২) ডাবলবেড ৭০০-১০০০ টাকা। সুবর্ণরেখা নদীর পাশে সুন্দর পরিবেশে রয়েছে রিসর্ট অন্বেষা (৯৮৩০৪৫৬১১২/৯৯০৩৩৪৯৯৯৯)। ভাড়া ৬৫০ টাকা-৭৫০ টাকা।

হোটেল আকাশদীপ (৯৫৭০০৫৮৯৬৯) ডাবলবেড ৭৫০ টাকা-৯০০ টাকা। এসি ১২৫০ টাকা। ছয়শয্যা ১৪০০-১৬০০ টাকা। হোটেল রিভারভিউ (৯৪৩১৫৪৩৯৬৮) ডাবলবেড ৬০০- ৭০০ টাকা। ৮ শতাংশ সার্ভস ট্যাক্স অতিরিক্ত। এসটিডি কোড: ০৬৫৮৫

কী দেখবেন: প্রথমেই দেখে নিন সুবর্ণরেখা নদীর পথে দহিগোড়ায় সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত টালির বাড়িটি। সামনের তুলসীমঞ্চটি এখনও আছে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ড সরকার বাড়িটির সংস্কারসাধন করেছে। বাড়ির নাম গৌরীকুঞ্জ।

এখান থেকে চলে যান সুবর্ণরেখার রূপ দেখতে সুবর্ণরেখা ভিউ পয়েন্টে। রাত মোহনার চড়ায় নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট-বড় পাথরের সমাবেশ দিনান্তবেলায় চক্ষু সার্থক করে তোলে। শহর থেকে ২ কিমি দূরে কলকাতা-রাঁচি সড়কের উপর গাছের ছায়াঘেরা মায়াবী ফুলডুংরি পাহাড়। পাহাড় না বলে টিলা বলাই ভাল। শোনা যায়, এখানে বসেই বিভূতিভূষণ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘চাঁদের পাহাড়’ রচনা করেছিলেন। এখানে রয়েছে আদিবাসীদের দেবস্থান। হেঁটে দেখে নেওয়া যেতে পারে দহিগোড়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির, রাজবাড়ি, বিভূতি স্মৃতি সংসদের লাইব্রেরি।

বুরুডি লেক: ঘাটশিলার আর এক আকর্ষণ বুরুডি লেক। শহর থেকে ৯ কিমি দূরে চারিদিকে জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের পাদদেশে বুরুডি লেক। সিজনে বোটিংয়ের ব্যবস্থা আছে।

ধারাগিরি: বুরুডি লেক থেকে ৫ কিমি দূরেই ধারাগিরি ফলস। পাহাড়-অরণ্যের মাঝে অনবদ্য ঝরনা।

রুক্মিণী দেবীর মন্দির: ঘাটশিলা থেকে ১৪ কিমি দূরে গাড়ি বা অটো ভাড়া করে দেখে নিন জাগ্রত এই দেবীমন্দির। স্থানীয় মানুষের অগাধ বিশ্বাস। রাজা ধবলদেব এখানে মা দুর্গার মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিখ্যাত উৎসব বিন্দ মেলা এখানেই হয়।

গালুডি: ঘাটশিলার পরের স্টেশন গালুডি। সুন্দর পরিবেশ। গালুডিকে কেন্দ্র করে ঘুরে নেওয়া যায় সাতগুরুং, শবরনগর ও বরকচা। থাকার জন্য রয়েছে গালুডি ইন (০৯১৯৯৮৬৮৫৪১) ডাবলবেড ৯০০ টাকা-১২০০ টাকা। এসি ১৪০০ টাকা। ১২.৫ শতাংশ প্রমোদকর অতিরিক্ত।