ধূসর আকাশের বধূসাজে রাঙানো আকাশকে সঙ্গী করে কাকভোরে পাহাড়দাঁড়ায়। বর্ষার মানভূমের লালমাটি ভিজেছে চিঁড়ে ভেজার মতো। পুরুলিয়া থেকে আরও একটু উজিয়ে চলে আসা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিভেজা দিনে আমার মতো আরও অনেকেই এসেছেন। মেঘলা, ভাঙা নরম রোদের ফালি বরাভূম স্টেশনের মাটি স্পর্শ করেছে। রেড ব্লাডলাইনের ধারা এখনও সজীব। বনপাহাড়, তিরতিরে নদীর বহতা আর ফিনফিনে ঝর্নার ঝরে পড়া। রূপসী বাংলার এক মায়াময় পিকচার পোস্টকার্ড যেন! মরসুমের নানা রং তার শরীরে। শীতে কুয়াশায় জড়িয়ে থাকে, বসন্তে পলাশের পদাবলী। লালমাটির সরানে বাইপাস টপকে পিচরাস্তার ধারে ধু ধু চাষজমিনে মাঝে মাঝে দু’-একটা কুঁড়েঘর। পথের ধারে আকাশের ঠিকানায় অয্যোধ্যা পাহাড়ের ঢেউ। রসুলডি, জাভা, ভুচুং— আরও কত সব নাম। এই সব গ্রামের পাশ কাটিয়ে চলে এলাম বাঘমুণ্ডির রাস্তায়। কেতাদুরস্ত কলকাতা থেকে অনেক দূরে উন্মুক্ত আদিম প্রকৃতির মাঝে।

গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমার পাশে পাশে ছুটে চলেছে অযোধ্যা পাহাড়ের ঢেউ। মিশকালসিটে ভিজে জবজবে। চাকায় লেগে থাকা রক্তরঙা মাটি। রাস্তার এক পাশে হলদেটে বিস্তীর্ণ টাঁড়। ভিজে জমিনে সবুজের আভাস। দুই পাহাড়ের মাঝে রাজার প্রান্তসীমা। আর একেই বলে দুয়ারসিনি। এখানেই সোনকুপি গ্রাম। সেই মোড় থেকে এ বার গাড়ি ঘুরে গেল। সামনেই সরু গলতা পেরিয়ে এক লহমায় সামনে চলে এল স্কুল। তারপর ধু ধু মাঠ পেরিয়েই এক জঙ্গুলে আভাস পেলাম। শাল, পিয়ালের গভীর জঙ্গল, সঙ্গে এ দিক-ও দিক ছড়িয়ে আছে ঢাউস ঢাউস পাথর। রুখুমাটি মজেছে শ্রাবণের উচ্ছ্বাসে। সব জলটুকু শুষে নিয়েছে। শনশনে ভেজা বাতাসে, সবুজপাতার আন্দোলন।


বাঘমুণ্ডির পথে।

এবড়োখেবড়ো পাথুরে পাহাড়ি পথ এ বারে দ্বিধাবিভক্ত। একটা গিয়েছে জঙ্গলঘেরা পাহাড়ের দিকে। অন্যটি বাঁ পাশের ঢালু জমিতে। যেখানে অজস্র লাল পলাশের গাছ। তা শ’দুয়েক হবে। এখানেই গড়ে উঠেছে সোনকুপি বানজারা ক্যাম্প। এখানেই অজস্র পলাশের মাঝে এক সুন্দর ইকো ক্যাম্প। পরিবেশের সঙ্গে মানানসই টেন্ট। উল্টো দিকে বুক চিতিয়ে পাহারায় সবুজমাখা গজাবুরু। প্রকৃতির মাঝে এক অনবদ্য আয়োজন। এই সময় তেমন বড় কোনও পরব-পার্বণ না থাকলেও আদিবাসীদের ‘করম পরব’-এর চল আছে। সাঁওতাল মাহলি ভূমিজ উপজাতিদের এক জনপ্রিয় লোকউৎসব। গ্রামের পুরোহিতদের সঙ্গে জঙ্গলে গিয়ে করম গাছের ডাল এনে বাড়ির অঙ্গনে বা মাঠের মাঝে পুঁতে দেন গ্রামের কুঁচবরণ কুমারীরা। তার পর নাচগানে মেতে ওঠেন মাদলের তালে তালে। উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। গ্রামের পুরোহিত পাহাড়ঘেরা মাঠের মাঝে করম চারা পুঁতে সূচনা করলেন সাঁওতাল মাহলি ভূমিজ আদিবাসীদের জনপ্রিয় করম পরব। এই উৎসব নতুন ফসলের আবাহনের। দূরদূরান্তের গ্রাম, পাহাড়ের হাতা বেয়ে রঙিন পোশাক  পরা মানুষেরা তাঁদের কুটুম বাড়িতে আসছেন। রুখা শুখা মাটিতে সবুজ ফসলের আশায় এই উৎসবের আয়োজন। নতুন পোশাক পরে তাঁরা নাচে-গানে মেতে ওঠেন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিধারায় লালপেড়ে সফেদ শাড়ি, মিশকালো চুলের খোঁপায় হলুদ গাঁদা ফুলের আভাস, কিশোরী কোমর দুলে ওঠে, পায়ের চলন সামনে পিছনে হয়, মাদলের একটানা দ্রিমি-দ্রিমি-দ্রাম-দ্রামের প্রতিধ্বনির অনুরণনে গেয়ে ওঠে লুপ্তপ্রায় জাওয়া গান। যে গানে লুকিয়ে আছে নারী সমাজের প্রাত্যহিক জীবনচর্চার বেদনামধুর বর্ণনা। কোনও বোঙ্গা (দেবতা), মন্দির, বিগ্রহ ছাড়া শুধুই গাছকে ঘিরে এই পরব।


সোনাকুপি।

সাতসকালে সেজে উঠছে সোনকুপির প্রান্তর। সেই ফাঁকেই বাঘমুণ্ডির আনাচ-কানাচ দেখে নেওয়ার পালা। সামনের গজাবুরু পাহাড়ের মাথায় মিশকালচে মেঘের পরত। সবুজ শালের জঙ্গলে সে কি উচ্ছ্বাস? বাঘমুণ্ডি হয়ে চলে এলাম ঘাগকোচা ফলস। পায়ে চলা জঙ্গুলে পথে শুধুই পলাশের জঙ্গল। না, এখন পলাশের নামগন্ধ নেই, শুধুই সবুজের বাহার। নতুন পাতার সৌরভে আরও নানা বৃক্ষের সমাবেশ। শাল, সজিনা, ভুররু আর সিধার সমাগম। সেই জঙ্গল পেরিয়ে পাথরের মাঝে ছলাৎ ছলাৎ বয়ে আসছে পাগলপারা শীতল জলের ধারা। এমন মেঘলা দিনে সেই জলের কাছে না গিয়ে পারা যায়! সটান জলে নেমে পড়া। শরীর জুড়িয়ে গেল। এ বার কাছাকাছি আরও দুটো ফলস দেখে নিলাম, তুরগা আর বামনী ঝোরা। বামুনকাটা পাহাড় থেকে নেমে এসে ব্রাহ্মণী ঝোরা নাম নিয়েছে বামনী। পুরুলিয়ার সবচেয়ে সুন্দর আর আকর্ষণীয় ঝর্না। দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। আবার স্নান। বেলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খিদে। ফিরে এলাম ক্যাম্পে। তাজা মাছ, খেতের সব্জি, ডাল, চাটনি। জাস্ট অসাধারণ!


ঐতিহ্যের পাতা নাচ।

আকাশে কৃষ্ণকলি মেঘের মিছিলের ফাঁক দিয়ে এক অসাধারণ আলোকচক্র। তত ক্ষণে আকাশের সীমান্তে মেঘের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে একফালি চাঁদের আলো। কুকুবুরুর পায়ের নীচে বুনো গন্ধমাখা রাত হয় নেশাতুর। সকালে করম পরবের রেশ এখনও রয়ে গিয়েছে। আজ এখানে বসেছে পাতানাচের আসর। গ্রামের মেয়ে-মরদের পাতানাচ আরও এক লুপ্তপ্রায় নাচের সাক্ষী থাকলাম। পরদিন চড়িদা গ্রামকে পাশ কাটিয়ে আরও নানা প্রান্তিক গ্রামজীবনের নানা কোলাজ দেখতে দেখতে কড়েং থেকে ডান দিকে ঘুরতেই দেখি পাহাড়ের ছাতের কিনারে আরও পাহাড়ের ঢেউ। তারই মাঝে বিশাল জলাশয়, কৈড়াবেরা ড্যাম। অসাধারণ নিস্বর্গের আভা। শ্রাবণের ধারায় লেকের জল টইটম্বুর, পাহাড়ের কোলে সবুজেরা আরও সবুজ। পাহাড়তলির মন বেসামাল করা সৌন্দর্য ছেড়ে চড়িদা গ্রামে। মুখোশের গ্রাম। নানা দেবদেবীর মুখোশের কদর বিশ্বব্যাপী। এই গ্রাম বিখ্যাত ছো নাচের জন্য। প্রবাদপুরুষ গম্ভীর সিংহ মুড়া চড়িদাকে নিয়ে গিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। তাঁর সেই নৃত্যকলার সুবাদে মহান এই শিল্পী পেয়েছেন পদ্মশ্রী খেতাব। তাঁর সেই স্বপ্ন বয়ে নিয়ে চলেছে আজকের প্রজন্ম। এই গ্রামের সূত্রধরেরা আজও মুখোশ তৈরি করেন। লাঞ্চ সেরে আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম দেখে নিলাম। এ বার ভুচুংদিহি মোড় থেকে প্রায় এক কিমি চলার পর ৮০০ ফুট উচ্চতার মুড়রাবুরু পাহাড় কেটে শিল্পী চিত্ত দে অনুপম শিল্পকলা গড়ে তুলেছেন, যার পোশাকি নাম ‘পাখি পাহাড়’। পাহাড়চুড়োর ছায়ামাখা ‘পারদি ড্যাম’ মন ভরিয়ে দিল। মেঘমাখা আকাশের নীচের জঙ্গল থেকে দু!টি ময়ূর পেখম মেলে বর্ষামাখা প্রকৃতিকে আরও রঙিন করে তুলল।


মহিষাসুর বধ পালা।

এ বার বলরামপুরের দিকে। এ পথের উপচে পড়া সৌন্দর্য অনেকটা এ রকম। রুক্ষ পাহাড়ের মাঝে কাকচক্ষুর মতো ছোট্ট দিঘল দীঘি। ঝাঁজি, জলঘাস, কচুরিপানা, শালুক, শাপলা, পদ্মের সমাহার, যার নালে জড়িয়ে থাকে বিষধর সাপ। এটাই সনাতন বাংলার সহজ সরল ছবি। শাল-পিয়ালের মাঝে লালমাটির পথের শেষে বলরামপুর গ্রাম। গালা শিল্পের গ্রাম। বাংলার এক অনন্য ঐতিহ্য। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ল গালার নানা সামগ্রী। ধূপদানি, পেনস্ট্যান্ড, বালা, পলার উপর নানা পাথরের কারুকাজে ব্যস্ত প্রায় ১৬টি পরিবার। ইচ্ছে হলেই শপিং সেরে নিতে পারেন। লাক্ষা থেকে সংগৃহীত গালার এই অপরূপ শিল্পকর্মের খ্যাতি আজ জগৎজোড়া।


বামনি ফল্‌স।

পুরুলিয়ার তেলেভাজার খ্যাতি আছে। ভাবরা হোল স্পেশাল। বেসন দিয়ে জিলিপির প্যাঁচ। ওতেই কামাল। অসাধারণ স্বাদ। অ্যাসিডিটির বালাই নেই। বাঘমুণ্ডিতে ফিরে দেশি মুরগির ঝোল আর গরম ভাত। উফ, মন ছুঁয়ে গেল। মেঘভাঙা রোদে, আদুরে দুপুরে লালমাটির প্রকৃতি উদার-উদাস। মাটিলেপা কাঁচাঘর, বাঁশবেড়া, খাপরা ছাদ, কুসুমগাছ, পলাশবন পেরিয়ে অযোধ্যা ও বাঘমুণ্ডির জলের আধার খয়েরাবেড়া ড্যামের দিকে। এখানেই তুরগা লেক। ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখির দল সাঁতার কাটে অবলীলায়। মানভূমের অভিমানী টাঁড় সেই লেকের জলে শুধুই স্মৃতির ঝাঁপি রোমন্থন করে। পশ্চিম আকাশ সেজেছে আবিরের রঙে। সন্ধ্যার আকাশে ঝিকিমিকি অজস্র তারার আভাস। পাহাড়ের ওপিঠ থেকে কখন যে কাঁসার চাঁদ উঠে এসেছে তা টের পেলাম না। মহুয়া ফুলের গন্ধে ম ম মানভূমের প্রকৃতি। সোনকুপি-তে রাতে বসেছে ছো-নাচের আসর। সারি সারি হ্যাজাকের আলো জ্বলে উঠল। শুরু হল মহিষাসুর বধ পালা। কার্তিক, গণেশ, দুর্গা, মহিষাসুর-সহ নানা পৌরাণিক চরিত্রের মুখোশ পড়ে অসাধারণ শারীরিক কুশলতায় প্রায় দু’ঘণ্টার পালাগানে শুধুই বুঁদ হয়ে থাকা। পরদিন ফেরার পালা। সেই রাতের ট্রেন। তার আগে মুরগুমা চলে এলাম। শাল-মহুলের ছায়ামাখা লালমাটির আঁকাবাঁকা পথের প্রান্তে সাহারজোর নদীবাঁধের কৃত্রিম লেকের পাড়ে, মুরুগুমা। বিশাল লেকের জলে পাহাড়ঘেরা অসহ্য সবুজের আস্ফালন। দূরে রাখালের বাঁশির মেঠো সুর ভেসে আসে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিধারাকে সঙ্গী করে বহতা গিরগিরা নদীপাড়ের গুড়রাবেড়ার সাঁওতাল গ্রামে লাঞ্চ সারতে সারতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। পুরুলিয়া থেকে রাতের ট্রেনে পরদিন কাকভোরে হাওড়া।

 

প্রয়োজনীয় তথ্য

হাওড়া থেকে পুরুলিয়া আসার নানা ট্রেন আছে। তবে রাত ১১.০৫ মিনিটে আদ্রা-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে চেপে পর দিন ভোরবেলা নেমে পড়ুন বরাভূম স্টেশনে। এখান থেকে সোনকুপি বানজারা ক্যাম্প চলে আসুন গাড়িতে। টেন্টে থাকার নানান প্যাকেজ।যোগাযোগ ০৯২৩১৫৮১১৭৭/০৯৮৩০০৬৩৬৪৩