কর্মণ্যে বাধিকারাস্তে মা ফলেষু কদাচন...

২০ ডিসেম্বর ২০১৩। ‘চাঁদের পাহাড়’য়ের প্রিমিয়ার শুরু হতে আর পনেরো মিনিট বাকি। আইনক্সে পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে দেখে চেনা-অচেনা মানুষ একটা কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী বুঝছেন? ১৫ কোটির প্রেশার কেমন?”

প্রশ্ন শুনে ইন্ডাস্ট্রির ডাক্তারবাবু একটাই উত্তর দিয়ে চলেছিলেন ক্রমাগত ‘কর্মণ্যে বাধিকারাস্তে মা ফলেষু কদাচন...’

কে জানত সেই ঘটনার চার মাসের মধ্যেই তার পরের ছবির বিষয়বস্তু হবে মহাভারত।

হ্যা।ঁ ১৫ কোটির ‘চাঁদের পাহাড়’য়ের পর কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এ বার মহাভারত বানাচ্ছেন। চিত্রনাট্য লেখার কাজ এই মুহূর্তে চলছে পুরোদমে।

যা পরিস্থিতি তাতে ছবির নাম ও কোন কোন শিল্পী অভিনয় করবেন তার বিশেষ কিছু ঠিক হয়নি শুধু দুটো কাস্টিং বাদে।

শোনা যাচ্ছে ভীষ্মের চরিত্রে অভিনয় করবেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আর কর্ণ বা অর্জুন কোনও এক চরিত্রে দেখা যাবে ঘাটাল কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী দেবকে। তবে ভেতরকার খবর, এই গল্পের যা ব্যাপ্তি তাতে টলিউডের প্রথম সারির সব অভিনেতা-অভিনেত্রীকেই দেখা যেতে পারে এই ম্যাগনাম ওপাসে। প্রত্যেকটি চরিত্রই আধুনিক প্রেক্ষাপটে ফেলছেন কমলেশ্বর।

আজ এই ব্রেকিং নিউজের পরে এই ছবি নিয়ে টলিউডে আলোড়ন শুরু হল ব’লে। এবং এটাও নিদ্বির্র্ধায় বলা যায় এই বছরে  ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের সব চেয়ে ‘অ্যাম্বিশাস’ ছবি হতে চলেছে এই ‘মহাভারত’। স্ক্রিপ্ট লেখার মাঝে আনন্দplus-কেই  খবরটা প্রথম জানালেন কমলেশ্বর।

“হ্যাঁ, আমার পরের ছবি ‘মহাভারত।’ ছবিতে আদিকাণ্ডের মাঝামাঝি থেকে সৌপ্তিক কাণ্ড অবধি থাকবে। কিন্তু পিরিয়ড ড্রামা নয়। একটা আধুনিক সময়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বানানোর চেষ্টা করছি মাত্র। আশা করছি মানুষের ভাল লাগবে,” স্বভাবসিদ্ধ লাজুক ভঙ্গিতে বলেন কমলেশ্বর।

এই মুহূর্তে তিনি ব্যস্ত মহাভারতের পড়াশোনা নিয়ে। এবং সেটা করতে সকাল ন’টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর।

“চেষ্টা করছি যতটা পড়াশোনা করা যায় ততটা করার। রাজশেখর বসুর ‘মহাভারত’ পড়ছি। পড়ছি দেবদূত পট্টনায়কের ‘জয়া।’ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর ‘মহাভারতের অষ্টাদশী’, ‘কৃষ্ণা কুন্তী কৌন্তেয়’ এবং ‘মহাভারতের প্রতিনায়ক’ও পড়ছি। এ ছাড়া রয়েছে সুকুমার ভট্টাচার্যের ‘মহাভারতের চরিত্রাবলী’ ও ভাণ্ডারকর ইনস্টিটিউটের বেশ কিছু লেখাপত্র। এ ছাড়াও আমাকে সাহায্য করেছেন তিন জন। ডা. রঞ্জন ভট্টাচার্য, ডা. শ্রীমন্তী চৌধুরী ও ভাস্কর চৌধুরী,” বলছেন কমলেশ্বর।

কিন্তু মহাভারতকে আধুনিক সময়ে রূপান্তরিত করে তো ১৯৮১ সালে শ্যাম বেনেগল বানিয়েছিলেন ‘কলিযুগ।’ সেই ছবিটার সঙ্গে কি কমলেশ্বরের ছবির কোনও মিল থাকবে?

“না। না। একেবারেই কোনও মিল নেই। এই ছবির পটভূমিকা আর সেই ছবির পটভূমিকার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত,” বলছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’র পরিচালক।

শুধু তা-ই নয়, ভীষ্মর চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে কাস্ট করে বেশ চমকেই দিয়েছেন কমলেশ্বর। 

শোনা যাচ্ছে শ্যুটিংয়ের অনেক আগে থেকেই ভীষ্মর চরিত্রে অভিনয় করার জন্য পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছেন প্রসেনজিৎ।

শনিবার তিনি একদিনের জন্য মুম্বই গিয়েছিলেন। সারা দিন নানা মিটিংয়ের ফাঁকেই কথা বললেন আনন্দplus-এর সঙ্গে।

“দেখুন, এটা একটা মডার্ন গল্প, যেখানে দু’টি পরিবারের মধ্যে ঝামেলা চলছে। আমি সেখানে একটা ফ্যামিলির হেড। চরিত্রটা অনেকটা ‘গডফাদার’-য়ের মার্লন ব্র্যান্ডো বা ‘সরকার’-এর অমিতাভ বচ্চনের মতো। সত্যিই তো এ রকম চরিত্র আমি আগে করিনি। ‘মনের মানুষ’-এর পর আবার একজন বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করব, এটাই আমার কাছে খুব চ্যালেঞ্জিং,” বলছেন প্রসেনজিৎ।

তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, কমলেশ্বর যে ভাবে মহাভারতকে আজকের সময়ের সঙ্গে অ্যাডাপ্ট করেছেন, তাতে মুগ্ধ টলিউডের গডফাদার।

“কমলেশ্বর অসম্ভব ভাল ভেবেছে। এবং দেখুন, মহাভারতের এই আধুনিকীকরণ বহু দিন ধরেই পপুলার কালচারে চলছে। আমাকে বলুন তো, ‘লাওয়ারিস’-য়ের অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘কর্ণ’-র কি কোনও তফাত আছে? এখানেও গল্পটাকে ওই ধাঁচেই বানাচ্ছে কমলেশ্বর। আমি খুব এক্সাইটেড,” জানাচ্ছেন প্রসেনজিৎ।

এখন পর্যন্ত যা ঠিক, তাতে ছবির শ্যুটিং হবে কলকাতাতেই। তবে কিছু অংশের শ্যুটিং আসানসোল ও ধানবাদেও হবে।

এই বিশাল পরিমাপের ছবির শ্যুটিং শুরু  আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে। এখনও অবধি যা খবর, তাতে ছবির বাজেট দশ কোটি ছুঁই ছুঁই।

ছবি সম্পর্কে ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের অন্যতম কর্ণধার শ্রীকান্ত মোহতা কী বলছেন?

“এটা অতি অবশ্যই একটা বড় প্রজেক্ট। এর আগে ‘চাঁদের পাহাড়’য়েও কমলদা প্রচুর হোমওয়ার্ক করেছিল। এই ছবি নিয়েও বিস্তর পড়াশোনা করছে। তবে এখন ছবির অধিকাংশ কাস্টিং এবং লজিস্টিকস নিয়ে কথাবার্তা চলছে। আশা করি খুব তাড়াতাড়ি আমরা সব লক করে নিতে পারব,” রোববার সকালে বলছিলেন শ্রীকান্ত।

 যা পরিস্থিতি তাতে কমলেশ্বরের ‘মহাভারত’ যে এই বছরের সব চেয়ে আলোচিত ছবি হতে চলেছে, তা এই এপ্রিলের সকালেই বলে দেওয়া যায়।