জলছবি, রংমশাল, স্কুলছুটির হজমিরা,

রূপকথার পায়রাদের গল্প বল/ রামধনূ, ঝালমুড়ি, হাফ টিকিট,আবপুলিশ/ বিটনুন আর চুরমুরের গল্প বল... বন্ধু চল

 

যাঁরা নব্বইয়ের দশকে বড় হয়েছেন, তাঁদের পক্ষে ১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবর তারিখটা সহজে ভোলা সম্ভব নয়। সে দিন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আনন্দবাজারে লিখেছিলেন, ‘এমন অপরূপ সূর্যগ্রহণ দেখতেই যেন পুনর্জন্ম হয়’। সেই সময় বড় হওয়া সব ছেলে-মেয়েরই মনে আছে সকাল সকাল পাড়ায় এক জোট হয়ে এক্স রে প্লেট নিয়ে ডায়মন্ড রিং দেখার মুহূর্তটা।

একই রকম ভাবে গণেশের দুধ খাওয়া থেকে ’৯৪ বিশ্বকাপে গোল করার পর বেবেতোর সেই বিখ্যাত সেলিব্রেশনও বোধহয় কোনও দিন ভুলবে না সেই দশকের কিশোর-কিশোরীরা।

শুধু নব্বইয়ের দশক কেন?

আশির দশকে যাঁরা স্কুলে পড়তেন, তাঁরা তো আজও রাত জেগে পাড়ায় দূরদর্শনে দেখা মারাদোনার বাঁ-পায়ের জাদুর কথা তারিয়ে তারিয়ে বলেন।

তেমনই সত্তরের দশকের ছেলে-মেয়েদের পাড়া থেকে একসঙ্গে জ্যোতিতে ‘শোলে’ দেখতে যাওয়ার সেই দিনটার কথা ভোলা সম্ভব নয়।

আসলে সব দশকেই এমন কিছু কিছু দিন থাকে, সব পাড়ারই একান্ত নিজের কিছু গল্প থাকে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই আপনি থাকুন না কেন, কৈশোরের এমন কিছু মিষ্টি সকাল থাকে, সন্ধের এমন কিছু মায়া থাকে, যা ভাবলে আজ মন অন্যমনস্ক হয়ে যায়।


অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়

এই অন্যমনস্কতাই তাঁর প্রথম ছবি ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ (মুক্তি পাবে পরশু, ১৬ জানুয়ারি)-এ পরতে পরতে ধরেছেন পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।

ছবির প্রেক্ষাপট উত্তর কলকাতা। সময়কাল নব্বই দশকের মাঝামাঝি।

কয়েকজন বন্ধু, তাদের দুষ্টুমি, তাদের প্রেম, তাদের বড় হয়ে পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়া— এই নিয়ে অনিন্দ্যর বায়োস্কোপ।

নস্টালজিয়ার শো রিল।

ফুটকড়াই, অ্যান্টেনা, হাতচিঠি, হাফ প্যাডেল/ আয়না আর জলপরির গল্প বল... বন্ধু চল

যাঁরা উত্তর কলকাতার পাড়া কালচারে বড় হয়েছেন বা অনিন্দ্যর মতো যাঁরা একসময় থাকতেন উত্তর কলকাতা কিন্তু আজকে ‘দক্ষিণপন্থী’, তাঁরা তো এই ছবি দেখে ফোনে পুরনো বন্ধুদের নম্বর খুঁজবেনই। অথবা ফেসবুক মেসেঞ্জারে পুরনো বান্ধবীকে ‘কী রে, কেমন আছিস?’ পাঠাবেনই। ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ আপনার ছোটবেলায় ফিরে যাওয়ার টিকিট।

যা দেখতে দেখতে কখনও সরস্বতী পুজোর দিন অঞ্জলি দেওয়ার সময় লুকিয়ে লুকিয়ে গার্লফ্রেন্ড (তখন তোর ‘ও’ বলা হত) কে দেখার মুহূর্ত আছে। পাড়ায় খারাপ হয়ে যাওয়া গাড়ি ঠেলে দেওয়ার মজা আছে। প্রথম প্রেম চলে যাওয়ার দুঃখ আছে। আকাশে কালপুরুষ দেখার থ্রিল আছে। প্রথম সিগারেট, প্রথম অ্যাডাল্ট ছবি দেখার মধ্যে ‘বড় হয়ে গেছি’ ভাব আছে।

সাপ লুডো, চিত্রহার, লোডশেডিং, শুকতারা/ পাঁচ সিকের দুঃখদের গল্প বল... বন্ধু চল

“নস্টালজিয়া আমরা কে না ভালবাসি! আর এই ছবিতে অনিন্দ্য আউটস্ট্যান্ডিং কাজ করেছে,” সে দিন প্রিভিউ দেখার আগে বলছিলেন এই ছবির প্রযোজক সুজিত সরকার। “এই ছবিটা প্রোডিউস করতে পেরে আমি অসম্ভব গর্বিত। আমরা তো আর লারেলাপ্পা ছবি বানাতে পারব না। আমরা এ রকম সেন্সিটিভ ছবি বানাতে পারলেই খুশি,”  বলছিলেন সুজিত।

হ্যাঁ, সেই সুজিত যিনি ‘ভিকি ডোনর’,  ‘মাদ্রাস ক্যাফে’র পরিচালক। যাঁর ‘অ্যাকশন’ আর ‘কাট’ শুনেই কলকাতার রাস্তায় ‘পিকু’ ছবির জন্য এই ক’দিন আগে সাইকেল চালিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন।

অনিন্দ্যকে পরিচালক হিসেবে ব্রেক দিতে পেরে যেমন খুশি সুজিত, তেমনই অভিভূত ঋদ্ধি সেনের অভিনয় দেখে।

সুজিত ভুল বলেননি। এই ছবির পর থেকে যে কৌশিক সেনের ছেলেকে নিয়ে তুমুল হইচই শুরু হবে, তা এখনই বলে দেওয়া যায়। সে দিন এই ছবির প্রসঙ্গেই শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় বলছিলেন, ঋদ্ধি সেনের হাত ধরে টালিগঞ্জের নতুন জেনারেশন এসে গেল।

সত্যি এসে গেল। রজতাভ দত্ত (দুর্দান্ত) কী পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তীর মতো দুঁদে অভিনেতাদের সঙ্গে সমানে তাল মিলিয়েছেন ঋদ্ধি।


সুজিত সরকার

ঋদ্ধিতে মুগ্ধ পরিচালকও। “ঋদ্ধি ম্যাচিওর্ড অভিনয় করেছে। এবং শুধু ঋদ্ধি কেন, কৌশিক সেন, রজতাভ, সুদীপ্তা সবাই আউটস্ট্যান্ডিং। এমনকী ছোট রোলেও সবাই খুব মন দিয়ে কাজ করেছে। ওদের মতো অভিনেতা পেয়ে আমি সমৃদ্ধ হয়েছি,” বলছিলেন অনিন্দ্য।

আর একজনের উল্লেখ না করলে বোধহয় অন্যায় হবে। ‘ফড়িং’য়ে তাঁর অভিনয় দেখে দর্শক মুগ্ধ হয়েছিল, এই ছবিতে শিক্ষিকার ভূমিকায় তিনি অনবদ্য। সোহিনী সরকার। অদূর ভবিষ্যতে টালিগঞ্জের বহু নায়িকার (যাঁরা মেনস্ট্রিমের বাইরে) ঘুম কেড়ে নেওয়ার সব রসদ আছে সোহিনীর। এ ছাড়াও বলতে হয়, ‘বন্ধু চল’ গানটার কথা। অনিন্দ্যর কথায় শান্তনু মৈত্র বহু দিন পর এত ভাল গান বাঁধলেন।

বন্ধু চল রোদ্দুরে... মন কেমন মাঠ জুড়ে/ খেলব আজ ওই ঘাসে, তোর টিমে তোর পাশে...

সে দিন প্রিভিউ থিয়েটার থেকে বেরোবার আগে সুজিত আর অনিন্দ্যর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা হচ্ছিল।

চা খেতে খেতে সুজিত বলছিলেন, “আমি তো মুম্বইতে থাকি। বাংলা ইন্ডাস্ট্রিটা পুরো বুঝি না। আমি শুধু মন-প্রাণ দিয়ে ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ বানিয়েছি। এ বার দর্শকদের ওপর।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনিন্দ্য সুজিতের কথার রেশ টেনে বলেন, “প্রচণ্ড নার্ভাস লাগছে। প্রথম ছবি। পাস নম্বর পাবো তো রে?”

 দু’জনের কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, এ রকম মন না থাকলে বোধহয় পুরনো পাড়ার ছোট ঘটনাগুলো এত ভাল ভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা যায় না। এ রকম সারল্য না থাকলে বোধহয় ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’  বানানো যায় না।

অনিন্দ্য-সুজিতের বায়োস্কোপ।

নস্টালজিয়ার আন্তরিক শো-রিল।