সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

খালি মনে হত এ-ও ছবি করছে কিন্তু আমার বাবাকে কেউ চান্স দিচ্ছে না

একটা সময় বহু মানুষকে ভুল বুঝতেন। রাগের মাথায় লম্বা লম্বা এসএমএস করতেন আর হিংসে করতেন বাকি পরিচালকদের। আজ তাঁর ছবি রিলিজের আগে বদলে যাওয়া আবেগপ্রবণ বিরসা দাশগুপ্ত-র সামনে ইন্দ্রনীল রায়।

2
ছবি: কৌশিক সরকার।

‘গল্প হলেও সত্যি’ আজ রিলিজ। ব্লাড প্রেশার তো নিশ্চয়ই ১২০/৮০-র বেশি?

না (হেসে), তা বোধহয় নেই। বেড়েছে অবশ্যই।

 

এটার কারণ নিশ্চয়ই আপনার আগের তিনটে ছবি বক্স অফিসে সে রকম চলেনি বলেই?

অবশ্যই হতে পারে তার জন্য। তবে কী জানেন, আমার প্রথম ছবি ‘০৩৩’ রিলিজ করার আগে আমার টেনশনটা সবচেয়ে কম ছিল। একটা ছবি করলে প্রোডিউসরের কথাও ভাবা উচিত, এ সব তখন ভাবিনি একদম। খালি ভাবতাম একটা দারুণ জিনিস বানালে দর্শক দেখবেই। পাবলিসিটি, মিডিয়া, এগুলো তো জানতামই না। আজ ঠেকে শিখেছি।

 

আপনার জন্ম এক ফিল্মের পরিবারে। প্রোডিউসরকে টাকা ফেরত দিতে হবে, এটা মনে হয়নি আপনার?

 সত্যি বলতে সেই সময় মনে হয়নি।

সোহম-মিমি। ‘গল্প হলেও সত্যি।’

‘০৩৩’ ফ্লপ হওয়ার পরে তো মিডিয়া থেকে শুরু করে সবাইকে গালাগালি দিয়েছিলেন। খুব সহজে মেনে নিতে পারননি বোধহয় ফ্লপটা?

না, মানতে পারিনি একেবারেই। যদি দেখে থাকেন, সেই বছরেই কিন্তু ‘অটোগ্রাফ’ রিলিজ করেছিল। সেই ছবির পাবলিসিটি অসাধারণ হল। একটা অন্য লেভেলে ছবিটা রিলিজ করল ভেঙ্কটেশ ফিল্মস। অন্য দিকে আমার ছবিও মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু সেই গ্র্যাঞ্জারটা ছিল না। আজ মনে হয়, আমারও প্রথম ছবির পাবলিসিটি যদি সৃজিতের প্রথম ছবির মতো হত, তা হলে গল্পটা অন্য রকম হত।

 

ঘরোয়া আড্ডায় তো সৃজিত মুখোপাধ্যায় বলেন আপনার নাম হওয়া উচিত ঈর্ষা দাশগুপ্ত। এটা শুনেছেন?

হ্যাঁ, শুনেছি।

 

আপনি কি সত্যি সবাইকে এতটা হিংসে করেন?

একেবারেই না। সৃজিতের অভ্যেস আছে ‘পান’ করার। ওর ছবিতেও দেখবেন নজরুল ইসলাম-রূপম ইসলামের মতো ‘পান’ হামেশাই করছে। এটাও তাই। আমি সৃজিতকে হিংসে করি না। তবে ও আমাকে হিংসে করে কি না জানি না।

 

সৃজিতের সাফল্য অনেক বেশি। ও আপনাকে হিংসে করতে যাবে কেন?

আমার কাছে সৃজিত হল ডেস্টিনিজ চাইল্ড। আমাদের জেনারেশনে ওর মতো সাফল্য কারও নেই। ওর পার্সোনালিটির একটা দিক হল কাউকে যদি ও দেখে ভাল কাজ করতে, ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত জেদ চাপে সেই মানুষটাকে ছাপিয়ে যাওয়ার। ওর সাকসেসের কথা মাথায় রেখেই বলছি, সৃজিত অসম্ভব ভাগ্যবান যে প্রথম ছবিতেই ভেঙ্কটেশ-এর মতো প্রোডিউসর পেয়েছিল।

 

শোনা যায়, আপনি খুব নিন্দুক। কারও কোনও ছবি আপনার ভাল লাগে না। কমার্শিয়াল পরিচালকদের তো বটেই, কমলেশ্বর, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, মৈনাকদের ছবি নিয়েও খালি খুঁত ধরেন?

হ্যাঁ, একটা সময় ছিল যখন ধরতাম। আসলে আমি মুম্বইতে অনুরাগ কশ্যপের সঙ্গে কাজ করেছি। ওই পরিবেশে সবাই সবাইকে ক্রিটিসাইজ করে, ওটাই প্রথা। কলকাতায় ফিরে এসে দেখলাম আমার ক্রিটিসিজমটা কেউ ভাল ভাবে নিচ্ছে না। সে দিক থেকে আজ নিজেকে অনেক বদলে ফেলেছি। এতে মণিদা, শ্রীকান্তদা, দেবালয় ভট্টাচার্যের হাত আছে। কমলদার আমি বড় ফ্যান। ‘চাঁদের পাহাড়’ আমার দারুণ লেগেছিল। কৌশিকদারও সব ছবি আমার ভাল লাগেনি। তবে ‘শব্দ’ আর ‘অপুর পাঁচালী’ দেখার পর কী কথা হয়েছিল জিজ্ঞেস করবেন কৌশিকদাকে।

 

আচ্ছা, এ বার আপনার ছবি ‘গল্প হলেও সত্যি’র ব্যাপারে কিছু বলুন...

এটা একটা থ্রিলার। এই ধারাটা খুব বেশি দেখা যায় না বাংলা ছবিতে। সোহম-মিমি দুর্দান্ত অভিনয় করেছে। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর মিউজিকও অলরেডি হিট। আশা করছি মানুষের ভাল লাগবেই এই ছবিটা।

 

কিন্তু এটা তো রিমেক?

হ্যাঁ, এই ছবিটা তামিল ছবি ‘পিজ্জা’র অফিশিয়াল রিমেক। আমি মনে করি ভারতবর্ষে সবচেয়ে ভাল ছবি হয় তামিল ভাষাতেই। আমি নিজে মণিরত্নমের বিগেস্ট ফ্যান। যখন আমার এক বন্ধু আমাকে এই ছবিটা দেখতে বলে, আমি ক্যাজুয়ালি ছবিটা দেখতে বসি। কিন্তু আই ওয়াজ হুকড্। তার পর আমার প্রোডিউসরদের বলি এই ছবিটা করতে চাই। ওঁরা অফিশিয়াল রাইটস্‌ কেনেন ছবিটার। অরিজিনাল ছবির থেকে এক ধাপ অন্তত এগোতে পেরেছি এই ছবিটায়।

 

কিন্তু লোকে তো অত অফিশিয়াল রিমেক বোঝে না। বলবে টোকা ছবি...

আমাদের এখানে যুগোস্লাভিয়া থেকে টুকলে ঠিক আছে। তামিলের রাইটস্‌ কিনে রিমেক করলে অসুবিধে। অদ্ভুত একটা মাইন্ডসেট।

 

আপনার সঙ্গে কথা বলে দেখেছি আপনি ট্রুফো, ফেলিনি নিয়ে সর্বক্ষণ কথা বলছেন। কিন্তু বানানোর সময় সেই রিমেক?

দেখুন, আমার দাদু হরিসাধন দাশগুপ্তকে বলা হয় ‘ফাদার অব ইন্ডিয়ান ডকুমেন্টারি’। গৌতমদা, রিনাদিকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন আমার দাদুর অ্যাচিভমেন্টস কী পর্যায়ের। নানা ধরনের ফিল্ম ছোটবেলা থেকে দেখেছি। এটা তো আমার দোষ হতে পারে না! তা নিয়ে আলোচনাও দোষের নয়। আমি ‘রোজা’ দেখেছি যখন আমার বাবা রাজা দাশগুপ্ত চেন্নাই থেকে একটা ভিএইচএস নিয়ে এসে আমাকে বলেছিল, এটা দেখ। ‘চিন্না চিন্না আশা’ গানটা শুনে ছিটকে গিয়েছিলাম। তখন বোধহয় কলকাতায় কেউ দেখেনি ছবিটা। সুতরাং আমার প্রশ্নের উত্তর ট্রুফো, ফেলিনি জানি বলে তামিল রিমেক ছবি করা যায় না, তা মানি না।

 

লোকে বলে আপনার প্রথম ছবির রিলিজের আগে গৌতম ঘোষ বা অপর্ণা সেন আপনার সম্বন্ধে নানা জায়গায় দারুণ কথা বলে আপনাকে ম্যাসিভ প্যাম্পার করেছিলেন। আজ কি মনে হয় তাতে আপনার ক্ষতি হয়েছিল বেশি?

দেখুন, গৌতমদা, রিনাদি আমার সম্বন্ধে ভাল কথা বলেছিলেন কারণ ওঁরা আমার ফ্যামিলি হিস্ট্রিটা জানেন। তবে প্রশংসা করা মানেই প্যাম্পার করা এটা বোধহয় ঠিক নয়। আর আমার মনেও হয় না তাতে আমার কোনও ক্ষতি হয়েছে।

 

কিন্তু অত প্রশংসা করেও তো আপনার আর এক ছবি ‘জানি দেখা হবে’ ফ্লপ হল?

হ্যাঁ, ওই একটা ছবি আমি রিগ্রেট করি। আই রিগ্রেট মেকিং দ্যাট ফিল্ম।

 

প্রসেনজিত্‌ চট্টোপাধ্যায় মনে করেন আপনার এত সিনেমা-চর্চা পরিচালক হিসেবে আপনার ক্ষতি করেছে...

(হেসে) বুম্বাদা যখন বলেছেন, নিশ্চয়ই ভেবেই বলেছেন। এটুকু বলতে পারি আমি এত কমপ্লিকেটেড নই। কিন্তু, আমি কমপ্লেক্স।

 

বুঝলাম না?

মানে আমার জীবনটাকে আমি কিন্তু কমপ্লিকেটেড করিনি কোনও দিন। আমি আমার থেকে ৬ বছরের বড় একজনের প্রেমে পড়েছিলাম। লিভ-ইন করে পরে বিয়ে করেছি। আমার স্ত্রী-র আগের সন্তানকে আমার নিজের মেয়ের থেকেও বেশি ভালবাসি। আমি আমার মতো সিনেমা বানিয়েছি। ভাবিনি লোকে কী বলবে। কোনও দিন ডিপ্লোম্যাসি করিনি। বাড়িতে ছোটবেলা থেকে একটু অন্য রকম পরিবেশ ছিল। তাই আমার জীবনটা হয়তো একটু কমপ্লেক্স। কিন্তু আমি মানুষটা কমপ্লিকেটেড নই।

 

বাড়িতে কী রকম পরিবেশ ছিল?

বলছি আজ সবটাই। তা হলে হয়তো বুঝতে পারবেন আমার ফ্রাস্ট্রেশন, জেলাসিটা কোথা থেকে আসে। আমার দাদু এক সময় খুব নামী ফিল্মমেকার হয়েও সেই রকম কদর পাননি।

দাদুর থেকে অনেক কম অ্যাচিভ করা মানুষজনকে নিয়ে অনেক বেশি বাড়াবাড়ি হয়েছে। অনেকেই জানেন, রেনোয়াঁর সেটে অবজার্ভার হিসেবে সত্যজিত্‌ রায়-কে কিন্তু নিয়ে গিয়েছিলেন আমার দাদু। আদুর গোপালকৃষ্ণন থেকে অনুরাগ কশ্যপরা দাদুকে প্রায় পুজো করেন। অন্য দিকে আমার বাবা রাজা দাশগুপ্ত। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। ডকুমেন্টারি থেকে টিভি অনেক ভাল ভাল কাজ করলেও আজ প্রায় ষাট বছর বয়সেও একটা ফিচার ফিল্ম তৈরি করতে পারলেন না। এ রকম একটা পরিবেশে ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে আমাদের সবার একটা চাপা দুঃখ ছিল। মনে হয় লাইফ হ্যাজ বিন আনফেয়ার টু দেম। সব কিছু করলেও একটা দুঃখ তাড়া করত।

যে দাদুর বেভারলি হিলস্‌-এ বাড়ি ছিল, সেই সময় শেভ্রলে গাড়ি ছিল, সেই দাদু শেষ জীবনে শান্তিনিকেতনে থাকতেন। দেখে রাগ হত খুব। অন্য অনেক সিনেমা-করিয়েকে দেখে ভাবতাম এ-ও ছবি করছে। কিন্তু আমার বাবাকে চান্স দিচ্ছে না। আই ফেল্ট ফর মাই ফাদার। আই ফেল্ট ফর মাই গ্র্যান্ডফাদার। সেই ফ্রাস্ট্রেশন থেকে একটা জেলাসি কাজ করত।

 

খুব ভাল উত্তর দিলেন...

সত্যি কথাটাই বললাম। এর আগে কোনও দিন বলিনি এ সব।

 

আজ আপনার ছবি রিলিজ, আপনার ভাই ঋভু দাশগুপ্ত মুম্বইতে অমিতাভ বচ্চন-নাসিরুদ্দিন শাহ্‌-এর মতো অভিনেতার সঙ্গে কাজ করছেন। আজ শ্যুটিং থেকে ফিরে বাবার মুখটা দেখে কি আপনাদের খারাপ লাগে? মনে হয়, আর বাড়ি এসে শ্যুটিংয়ের গল্প করব না... মানুষটার খারাপ লাগবে?

(চোখে জল) হ্যাঁ, মনে হয়। তবে বাবা আমাকে বা আমার ভাইকে বুঝতে দেয়নি নিজের কষ্টটা। নিজেই শ্যুটিংয়ের গল্প জানতে চেয়েছে। কী ভাবে শট নিলাম, সেটা আমাদের বলতে হয়েছে বাবাকে। আমার ভাই রোজ রাতে মুম্বই থেকে বাবাকে ফোন করে বলে ওর ডিরেকশনের কথা। হয়তো আমাদের দু’জনের মধ্যে দিয়েই বাবার ফিচার ফিল্ম ডিরেক্টর হওয়ার স্বপ্নটা পূর্ণ হল।

 

এ বার একটু এই সময়ে ফিরি...

(কফিতে চুমুক দিয়ে) হ্যাঁ, বলুন। সরি, একটু ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম।

 

শুনেছি সবার ব্যাপারে আপনার ওপিনিয়ন আছে...

আবার এ সব কেন?

 

একটা র‌্যাপিড ফায়ার রাউন্ড করি? মৈনাক, কমলেশ্বর, কৌশিক, সৃজিত, রাজ, পরম আর অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীকে এক থেকে পাঁচ র‌্যাঙ্ক করুন।

ওদের আমি র‌্যাঙ্ক করতে চাই না। ওদের ফিল্ম নিয়ে কথা বলতে পারি।

 

তাই বলুন। সৃজিতের কোন ছবি আপনার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে?

 আমার ‘মিশর রহস্য’ ভাল লাগেনি।

 

কমলদার ‘মেঘে ঢাকা তারা’ না ‘চাঁদের পাহাড়’ কোনটা আপনার ফেভারিট?

‘মেঘে ঢাকা তারা’। আর নয়...  

 

মৈনাক ভৌমিক সম্বন্ধে আপনার মত?

মৈনাক খুব ট্যালেন্টেড। কিন্তু ওই একই ধরনের ছবি করছে। ওই জোন থেকে এ বার ওর বেরোনো উচিত।

 

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়?

এক সময় মনে হত কৌশিকদা সব সময় আমাকে নিয়ে মজা করছে। হ্যাটা করছে। পরে ধীরে ধীরে কেজি-কে চিনতে পারলাম। কেজি-র মাথাটাকে আমি হিংসে করি। ওর মতো আইডিয়া আমাদের কারও নেই।

 

রাজ চক্রবর্তী?

আমার ওয়েল উইশার। অসম্ভব ভাল মানুষ।

 

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী?

একটা সময় ভাবতাম হল থেকে ‘০৩৩’ নামিয়ে দিয়েছিল টোনিদা।

 

উনি কী করে নামাবেন একটা ছবি?

ভুল বুঝেছিলাম। পরে যখন মানুষটাকে চিনেছি, আই সেড সরি টু হিম।

 

পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়?

বন্ধু, খুব খুব ভাল বন্ধু।

 

পরমের কথা শুনে রাতে বিরাট বিরাট এসএমএস লেখা কি বন্ধ করেছেন?

হ্যাঁ, অনেক কমিয়েছি। আজকাল অদ্ভুত এসএমএস হয়।

 

যেমন?

সৃজিত হয়তো রাত তিনটের সময় এসএমএস করল, ভাল লাগছে না। চল্‌, ড্রাইভে যাই। আমি লিখলাম আমি আমার দুই মেয়ের মধ্যিখানে শুয়ে গল্পের বই পড়ছি। সৃজিত লিখল, আই এনভি ইউ। এই রকম এসএমএস যেন আমার ও আমার বন্ধুদের মধ্যে চলতে থাকে সারা জীবন। না হলে বেঁচে থাকার মজাটাই যে চলে যাবে।

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন