মান্নাদা বিশ্বজিতের কথা শুনে বললেন, ‘‘আপনার জন্য গাইব কী করে? আমাকে তো পরিচালক-সুরকাররা মেহমুদেরই গায়ক করে রেখেছেন।’’ সব থেকে সুদর্শন নায়ক হিসেবে বিশ্বজিৎ তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে—বিশেষ করে হিন্দি ছবিতে। তখন তার লিপে অধিকাংশ গান গাইছেন হেমন্তকুমার এবং মহম্মদ রফি। একবার বিশ্বজিতের বোম্বের দুর্গাপুজোয় এলেন মান্নাদা। সুযোগ বুঝে বিশ্বজিৎ বলে ফেললেন মনের কথাটা— মান্নাদা কি তার লিপে গাইবেন না?

গত মাসে বিশ্বজিৎ এসেছিলেন কলকাতায়। নেতাজির ওপরে একটা ছবি করছেন। আমরাও ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের ওপর কাজ করছি। গান গুলিকে সংযোগ করে যে ভাষ্য লিখেছি, সেটা পাঠ করলেন বিশ্বজিৎ। রেকর্ডিঙের আগে কয়েকটা সিটিং পার্ক প্লাজা, হোটেল হিন্দুস্থান, ওম স্টুডিওতে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানা গল্প—সেই সময়কার। এখনকার সমস্ত খবর তার নখদর্পণে। বারবার জিজ্ঞাসা করলেন কেমন আছেন তনুবাবু (তরুণ মজুমদার), ঢুলুদা (অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়) এবং অবধারিত ভাবে এল মান্নাদার কথা। হিন্দি ছবিতে মান্নাদার গানে লিপ দিতে না-পারার দুঃখ তার এখনও আছে। ব্যাপারটা একবার ম্যাচিওর করতে করতেও করল না। বিশ্বজিৎ বাংলায় একটা ছবি করেছিলেন ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’। ছবিটা হিন্দিতে করার পরিকল্পনা হল। নাম ‘ছোটা সা সওয়াল’। সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষ। ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’য় একটা গান গেয়েছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। কিন্তু সর্বভারতীয় দর্শকদের কথা মাথায় রেখে সবার ইচ্ছেতে গানটা গাওয়ানো হল মান্না দে-কে দিয়ে। তা নিয়ে এখনও আফশোস বিশ্বজিতের গলায়— ‘গানটা মাঠেই মারা গেল। ছবিটাই হল না।’

অবাক হয়ে দেখছিলাম বিশ্বজিতের ডেডিকেশন। স্ক্রিপ্টটা ভাল করে বুঝে নিলেন। প্রতিটি প্যারাগ্রাফের আগে নোট করে রাখলেন—ইন্ট্রোভার্ট, এক্সট্রোভার্ট, লাউড, স্যাড, নাটকীয়, এমন ভাবে। সতেরোটা নতুন গান। সবক’টি গান শুনলেন। লাঞ্চব্রেকে নিজেই তুললেন মান্নাদার কথা— ‘‘হিন্দিতে না হলেও কয়েকটা বাংলা ছবিতে মান্নাদার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। হয়তো সংখ্যায় কম। কিন্তু গানগুলো দারুণ। মান্নাদাই অমন সুন্দর গাইতে পারেন।’’ সত্যি, ‘স্যরি ম্যাডাম’ ছবিতে মান্নাদার গাওয়া ‘রাধা চলেছে মুখটি ফিরায়ে’ ভোলা যায় না। ‘চৈতালি’ ছবির কথা বলতে বলতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন বিশ্বজিৎ। ‘‘শচীনদা (শচীন দেব বর্মণ) তো বাংলা ছবি বেশি একটা করেননি, এ জন্য চৈতালি ছবিটা ব্যতিক্রম। অনেক রোমান্টিক গানে লিপ দিয়েছি। বলতে দ্বিধা নেই এই ছবিতে মান্নাদার গাওয়া ‘দুটি কথা যেন বলে যায় মোরে’ আমার কাছে অন্যতম সেরা রোমান্টিক গান। গৌরীপ্রসন্নও লিখেছিলেন অপূর্ব।’’

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি। ‘চৈতালি’ ছবির এই অপূর্ব রোমান্টিক গানে সুরের চলন দেখে অনেক সঙ্গীতজ্ঞ মানুষ বলেন, ‘‘হতে পারে সুরকার হিসেবে শচীনদেবের নাম আছে। কিন্তু এটি শুনলে মনে হয় সুরটি যেন মান্না দে-রই’’। ধারণাটা হয়তো সত্যি। এমন তো বারবার হয়েছে।

শুধু নায়ক নন, অত্যন্ত সুগায়ক ছিলেন বিশ্বজিৎ। নচিকেতা ঘোষ, সলিল চৌধুরী, শ্যামল মিত্র, অমল মুখোপাধ্যায়ের সুরে বহু কালজয়ী গান গেয়েছেন। যেমন—যায় যায় দিন, কখনও নদীর তীরে, তোমার চোখের কাজলে, বলাকা ও বলাকা। গানটা ভাল বোঝেন। খুব দুঃখ করলেন যখন তরুণ মজুমদারের ‘অমরগীতি’ ছবির প্রসঙ্গ উঠল। টপ্পার রাজা নিধুবাবুর জীবন নিয়ে ছবি। নিধুবাবুর চরিত্রে সৌমিত্র, একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে বিশ্বজিৎ। সৌমিত্রের লিপে নিধুবাবুর গানগুলি গাইলেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। খুব আপশোস করলেন বিশ্বজিৎ। ‘‘এটা দর্শকরা একদমই নিতে পারল না। রামকুমারবাবু খুবই ভাল গেয়েছিলেন। কিন্তু পুলু (সৌমিত্র)র লিপে মানাল না। পরে সবাই মাথা চাপড়াল। কেন যে গানগুলো মান্নাদাকে দিয়ে গাওয়ানো হল না!’’ গানের ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে মান্নাদা যেমন গান গেয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন, আবার তিনি গাননি বলে অনেক ইতিহাস করুণ অক্ষরে অন্যভাবে লেখা হয়েছে।

মান্নাদার জায়গাটা বরাবরই স্বতন্ত্র। অবধারিত প্রশ্নটা বিশ্বজিৎকে করলাম—‘‘মান্নাদাকে কোথায় রাখবেন?’’ বিশ্বজিৎ হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘আপনার ঠিক এই প্রশ্নটা একবার আশা ভোঁসলেকে করেছিলাম।’’ ‘‘কী বললেন আশাজি?’’ ‘‘খুব সুন্দর বলেছিলেন। বলেছিলেন, পুরুষ কণ্ঠে তিনজনই সেরা—রফি-কিশোর-মান্না। রফি ছিলেন সব নায়কের আদর্শ গায়ক। সুরকারদেরও খুব পছন্দের। তারুণ্যে ভরা কণ্ঠ। নায়ক বুঝে গাইতেন। দারুণ ড্রামা। আর কিশোরদা একদম আনপ্রেডিক্টেবল। জাত প্রতিভা। কখন যে কী করবে, নিজেই জানত না। যাই করত, অসাধারণ হয়ে উঠত। তবে মান্নাদা সবার থেকে আলাদা। উনি হলেন ওস্তাদ গায়ক। সব রকম গান সমান দক্ষতায় গাইতে পারেন। ওর জুড়ি কেউ নেই।’’

মান্নাদা যে একজন আলাদা সঙ্গীত-ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন, তার জন্য প্রতিভা এবং সাধনা যেমন ছিল, সমানভাবে ছিল মান্নাদার দৃষ্টিভঙ্গি। চাইতেন সব কিছু একটা সিস্টেমের মধ্যে হোক। অগোছালো ব্যাপার একদম পছন্দ করতেন না। ‘আমার প্রিয় মনীষী’ গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। অসাধারণ গেয়েছেন মান্নাদা। সাবজেক্টটাও ভাল। বাংলার সব মনীষীকে নিয়ে গান। আমার লেখা আর মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুর। গানগুলির সাফল্যে অডিও কোম্পানির কর্তারা ঠিক করলেন গানগুলির ভিডিও রেকর্ডিং করবেন। মান্নাদাও শুটিঙের জন্য মোটামুটি রাজি। সেলিমপুরের স্টুডিওতে ঘড়ির কাঁটা ধরে পৌঁছে গেলেন মান্নাদা। দু-একটা গানের শুটিং হতেই মান্নাদা বুঝতে পারলেন, পুরো কাজটা হচ্ছে খুব আনঅর্গানাইজড হিসেবে। মান্নাদা সব সময় চাইতেন সঠিক হোমওয়ার্ক। সেটা ঠিক না থাকলে মান্নাদার মুড অফ হয়ে যেত। মান্নাদা কলকাতায় এলে দেখতাম ভিড় লেগে আছে মান্নাদার ইন্টারভিউ নেবার জন্য। ভাগ্য ভাল থাকলে অনেকেই সুযোগ পেতেন। অনেক সময় বিরক্ত হয়ে বলতেন, ‘‘একই কথা বারবার জিগ্যেস করে। একই কথা বলতে আর ভাল লাগে না। একটু পড়াশোনা করে তো আসতে পারে।’’

শুটিঙে একটাই ক্যামেরা। মান্নাদা দু’লাইন গাইছেন। শুট হল। ক্যামেরা অন্য পজিশনে এনে সেট করতে বেশ সময় লাগে। আলোর অ্যাডজেস্টমেন্ট আছে। আবার একই লাইন গাইতে হচ্ছে। মোট বারোটা গান। মান্নাদা দেখলেন যে ভাবে কাজ এগোচ্ছে তাতে আঠারো মাসেও বছর শেষ হবে না। অথচ দুটো ক্যামেরা থাকলে কোনও সমস্যাই হত না। তরতর করে কাজ এগিয়ে যেত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। গানের একটা অন্তরায় শুটিংই শেষ হয় না। স্বভাবতই মান্নাদা বিরক্ত হলেন। বুঝতে পারলেন ওরা খুব একটা হোমওয়ার্ক করেনি। দুটির বেশি গানের শুটিং করা সম্ভব হল না। অথচ সঠিক প্রস্তুতি থাকলে আমরা এক অসাধারণ সৃষ্টি পেতাম মান্নাদার কাছ থেকে। তবু বাংলার অমর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে গাওয়া মান্নাদার ‘এখনো মাটিতে লেগে আছে দ্যাখো কত শহিদের রক্ত’ গানটি যারা দেখেছেন, মুগ্ধ হয়েছেন প্রত্যেকেই।

দু’বছর পরে মান্নাদা ‘ভারততীর্থ’ অ্যালবামের দশটা গানই প্রসন্ন মনে শুটিং করেন। তার একটাই কারণ। পরিচালক প্রদ্যোত ভট্টাচার্যের সঠিক হোমওয়ার্ক। সে গল্প পরে লিখব।