এই পুজোতে একজন মেগাস্টারের নাম নিয়ে একটা ছবি রিলিজ হল। একজন ‘যোদ্ধা’র ছবি মুক্তি পেল। কিন্তু পুজোতে বাঙালি যে জুটিকে নিয়ে হইচই করল সেটা অপর্ণা সেন-চিরঞ্জিত।

অপর্ণা: (হাসি) ‘চতুষ্কোণ’ শুধু আমাদের জন্য চলেছে সেটা বলা ঠিক হবে না। গোটা ছবিটাই মানুষের ভাল লেগেছে। আর সৃজিতের একটা ট্রেডমার্ক ট্যুইস্ট থাকে না সব ছবিতে... এই ছবির ক্ষেত্রেও সেই শেষের ট্যুইস্টটা মানুষের ভাল লেগে গিয়েছে। ওই ভাললাগাটা নিয়েই মানুষ হল থেকে বেরিয়েছে। তাই শুধু অপর্ণা বা চিরঞ্জিত বললে ভুল হবে।

চিরঞ্জিত: আসলে আমাদের দু’জনের ট্র্যাকটাতে একটা রোম্যান্টিক অ্যাঙ্গল ছিল। জনপ্রিয়তাটা হয়তো সে জন্য একটু বেশি।

অপর্ণা: আর দীপক আগেও ছিল এবং আজকেও একজন বড় স্টার। আমার ক্ষেত্রেও তাই। সেটার একটা অ্যাপিল আছে। যদিও আজকে আমাকে অ্যাকট্রেস অপর্ণা সেন বললে আমার বেশ অস্বস্তি হয়।

কিন্তু আজকে তো সবার আসার কথা ছিল এগারোটায়। রিনাদি ঠিক সময়েই এলেন। চিরঞ্জিত এলেন আধ ঘণ্টা পরে। সিনেমার মতো আজকেও তা হলে তৃণাকে ওয়েট করিয়ে রাখল দীপ্ত?

সৃজিত: রিনাদি কিন্তু দীপকদা আসতেই সিনেমার ডায়লগটার মতো বলে দিল, ‘আমি কিন্তু একটায় বেরিয়ে যাব’। (হাসি) আর গত চল্লিশ বছর ধরে বাঙালি সমাজকে অপর্ণা সেন বলে চলেছেন, ‘তোরা একটু টাইমে আয়’। কিন্তু কেউ টাইমে আসেনি।

অপর্ণা: (হাসি) না, আজকে দীপকের মেয়ে চলে যাচ্ছে, তাই ওর আসতে একটু দেরি হল।

 

‘চতুষ্কোণ’ তো সহজ ছবি নয়। সোজাসুজি  গল্প নেই ছবিতে। তাও ছবিটা এত বড় হিট হয়ে যাবে সেটা ভাবতে পেরেছিলেন আপনারা?

অপর্ণা: আমার গল্পের প্রেক্ষাপটটা দারুণ লেগেছিল। চারজন ডিরেক্টরের চারটে গল্প, যেখানে মেন থিম মৃত্যু এই কনসেপ্টটা দারুণ লেগেছিল।

চিরঞ্জিত: এগজ্যাক্টলি। আর অনেক ছবিতে আলাদা আলাদা গল্প থাকে। কিন্তু এখানে তিনটে আলাদা গল্প যেটা লাস্টে মেন গল্পের সঙ্গে লিঙ্কড্ হয়ে যায়  এই কনসেপ্টটা এক্সট্রাঅর্ডিনারি। আমাকে অনেক লোক ফোন করে বলছে তাঁরা ছবিটা দ্বিতীয়বার কী তৃতীয়বার দেখছে কারণ প্রথমবার দেখে তাঁরা অনেক কিছুই ধরতে পারেননি।

 

গৌতমদা কিছু বলবেন?

গৌতম: দেখুন, আমাদের একটা আশঙ্কা ছিল। যেহেতু অনেকগুলো সাব-প্লট, অনেকগুলো ঘটনা একই সঙ্গে চলছে... কিন্তু মানুষের কখন কোনটা ভাল লেগে যায় কেউ বলতে পারে না।

 

এর মধ্যেই এলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিরিশ ঘণ্টার জেট ল্যাগের ক্লান্তি তখনও চোখেমুখে। এসে বললেন, “সরি, সরি। একেবারে পেঁচার মতো অবস্থা। রাতে ঘুম আসছে না আর সারাদিন ঘুমাচ্ছি।”

 

সৃজিত, পরম তো এমনিতে খুব পাঞ্চুয়াল?

সৃজিত: হ্যাঁ, ‘২২শে শ্রাবণ’য়ে পাঞ্চুয়াল ছিল। ‘হেমলক’য়ে দু’দিন দেরি করেছিল।

পরমব্রত: কী বলছ? ঠিক উল্টোটা।

 

সৃজিত মনে করেন এটা পরমের জীবনের সেরা রোল। পরম কি একমত?

সৃজিত: ওয়ান অব দ্য বেস্ট রোল মনে করি তো বটেই।

চিরঞ্জিত: আমি এখানে পরমকে প্রশ্ন করতে চাই। এই ছবিটা যখন তোকে সৃজিত অফার করেছিল, তোর ঠিক কী মনে হয়েছিল? অস্বস্তি হয়েছিল একটা?

পরম: অবশ্যই হয়েছিল। যখন এই রোলটা সৃজিত অফার করে তার আগে এই রোলটা ঋতুদাকে (মে হিজ সোল রেস্ট ইন পিস) আর কৌশিকদাকে অফার করা হয়েছিল। রোলটাও ওই দু’টো মানুষকে ভেবেই লেখা হয়েছিল। আমি সৃজিতকে বলি তোমার তো একটা জোকার ইন দ্য প্যাক চাই, আমি যদি রোলটা একদম অন্য রকম করি তাহলে কি অসুবিধা হবে?

 

অন্য রকম মানে?

পরম: মানে এমন একজন লোক যে ঋতুদা কী কৌশিকদার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যে অরেঞ্জ প্যান্ট পরে। চুলটাকে স্পাইক করে।

চিরঞ্জিত: এবং পরম কতটা আউটস্ট্যান্ডিং সেটা বোঝা যাবে কী ভাবে জানেন? পরমের রোলটা কাউকে ডাব করতে বলা হোক, সে কিছুতেই পারবে না। ওই যে প্রথম থেকে একটা বডি ল্যাঙ্গোয়েজ, একটা ম্যানারিজম তৈরি করেছিল, ইট ওয়াজ ফ্যান্টাস্টিক।

সৃজিত: ইয়েস।

অপর্ণা: এবং আমার যেটা ভাল লেগেছিল যে প্রথম থেকেই পরমকে স্লাইটলি ম্যাড মনে হচ্ছিল।

আই লাইকড দ্যাট।

‘চতুষ্কোণ’ যে এখনও রমরম করে চলছে, মানুষ কথা বলছে এই সাফল্যের আঁচ আপনারা নিজেরা কী ভাবে পাচ্ছেন?

পরম:  আমার বাড়িতে যে মেয়েটি রান্না করে, সে সেদিন রান্না করতে করতে বলছে, ‘দাদা, আপনার নতুন ছবিটা দারুণ হয়েছে। ওপরের কাকিমা দেখতে গিয়েছিল, বলল।’ যখন একটা

ফিল্ম হিট হয়ে যায় সেটার বহিঃপ্রকাশ এ রকম ছোট ছোট ঘটনা দিয়েই হয়।

চিরঞ্জিত: এগজ্যাক্টলি তাই। আমিও দেখছি ফ্ল্যাটের লিফ্টে দেখা হলে মানুষ ‘চতুষ্কোণ’ নিয়েই কথা বলছে। আমার কাছে ব্যাপারটা আরও নতুন কারণ এই ঘরানায় তো আমি ছিলাম না। তাই বোধহয় বেশি বুঝতে পারছি সাফল্যটা।

অপর্ণা: আমিও পার্টি-টার্টিতে গেলে দেখছি মানুষ ‘চতুষ্কোণ’ নিয়েই কথা বলছে। আর তা ছাড়া ফোন কী হোয়াটস্অ্যাপ তো আছেই।

 

সৃজিতের সামনেই প্রশ্নটা করছি। সৃজিতের সাফল্যের ইউএসপি-টা কী?

পরম: আমি বলি প্রথমে?

 

সিওর। আপনি তো ওঁর সঙ্গে অনেকগুলো ছবিতে কাজ করলেন।

পরম: হ্যাঁ, আমার মনে হয় সৃজিতের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে ওর প্যাকেজিং। মানে সেন্সিবল বেঙ্গলি মধ্যবিত্ত দর্শক কী চায় সেটা সৃজিত সবচেয়ে ভাল বোঝে। সেই বিজনেস অ্যাকুমেনটা ওর প্রখর। ও যে কনশাসলি এটা করছে সেটা আমার মনে হয় না কিন্তু ওর ভেতরে এটা আছে। আর আমি বাঙালি মধ্যবিত্ত দর্শক বলতে বোঝাতে চাইছি শহর বা শহরতলির বাঙালি দর্শকদের, গ্রাম-বাংলার দর্শকদের নয়। যে বাঙালি মধ্যবিত্ত দর্শক নিজেদের রুচিশীল মনে করে। যারা আজও আনন্দবাজার পড়ে ছবি দেখতে যায়, সৃজিত এই দর্শকদের মনটা সবচেয়ে ভাল বোঝে।

অপর্ণা: সৃজিতের ইউএসপি হল দু’টো। এক, ওর প্রায় সব ছবিতে শেষে যে ট্যুইস্টটা থাকে সেটা মানুষের দারুণ লাগে। আর দ্বিতীয় যেটা পরম বলল, ও দর্শকদের পালস্টা বোঝে।

চিরঞ্জিত: আমি কিছু বলতে পারি?

 

নিশ্চয়ই।

চিরঞ্জিত: এটা আমার প্রথম কাজ সৃজিতের সঙ্গে। হি ইজ আ ওয়ান্ডারফুল ডিরেক্টর। এবং সেটার প্রধান কারণ ও অসম্ভব পরিশ্রমী। আর যেটা আমার ভাল লাগল সেটা হল ওর ডায়লগ লেখার হাতটা তুখড়। তবে একটাই নেগেটিভ পয়েন্ট। ব্যাটা বড্ড খাটায়। ওরে বাপ রে বাপ। খাটিয়ে মেরে ফেলে প্রায়। কিন্তু লাস্ট রেজাল্টটা যখন এত ভাল হয় তখন সেই খাটনিটা আর গায়ে লাগে না।

 

আচ্ছা ‘চতুষ্কোণ’ সিনেমাতে তো অনেক পুরনো, না জানা গল্প বেরিয়ে পড়ল। ইন্টারভিউতেই সেটা হোক। আজকে তাহলে বলেই দিন রিনাদি, ‘সতী’ ছবির সময় কী ঝামেলা হয়েছিল আপনার সঙ্গে চিরঞ্জিতের?

অপর্ণা: ঝামেলা? শ্যুটিঙয়ের সময় তো কোনও ঝামেলা হয়নি।

চিরঞ্জিত: (হেসে) জোর করে গল্পে ট্যুইস্ট ঢোকানোর চেষ্টা চলছে কিন্তু!

 

কিন্তু ঝামেলার এই গল্পটা তো ছবির পরিচালক সৃজিতই বলেছিলেন।

সৃজিত: না, মানে ঝামেলা নয়, একটা হালকা টিফ্....

অপর্ণা: আমরা পুরনো কথা বলছি কেন বল তো?

 

ওই যে রিল মিটস রিয়েল। যেটা ‘চতুষ্কোণ’য়ের থিম।

অপর্ণা: (হেসে) না, না, কোনও ঝামেলা হয়নি। উই’র বোথ অ্যাডাল্টস্। কী দীপক, কোনও ঝামেলা হয়েছিল নাকি?

কাঁধ ঝাঁকিয়ে মাথা নেড়ে না বলেন ‘চতুষ্কোণ’য়ের দীপ্ত।

 

মানে কোনও ঝামেলাই হয়নি? সব সময়ই ভাব ছিল, সিনেমার ডায়লগ ধার করে বলতে হলে, ‘সমুদ্র কাছেই ছিল... আপনারাই দেখতে পাননি।’

অপর্ণা: বাবা এসব হচ্ছে নাকি! আমি তো কিছু বুঝতে পারিনি।

 

এই ডায়লগটা তো সুপারহিট।

অপর্ণা: তাই?

গৌতম: ডায়লগ সুপারহিট হওয়া কী গান সুপারহিট, কখন হয়ে যাবে কেউ বলতে পারে না। আমার একটা ছবি ছিল ‘দেখা’।

চিরঞ্জিত: ওটার রিভিউ করেছিলাম আমি শনিবারের ‘পত্রিকা’তে।

গৌতম: হ্যা। ‘দেখা’ যে হিট হয়ে গিয়েছে আমাকে প্রথম বলেছিল বুবু মানে সমিত ভঞ্জ। আমি বললাম, কী করে বলছ? বলল, “পাড়ার কিছু ছেলে যারা চ্যাংড়া ছবি দেখে তারা আমাকে বলল, আমরা ‘দেখা’ দেখেছি। কিছুই বুঝিনি কিন্তু ভাল লেগেছে দাদা’।” ‘চতুষ্কোণ’ দেখে যেমন আমার অবাঙালি এক বন্ধু ফোন করে গাইতে শুরু করল, ‘বসন্ত এসে গেছে’... (হাসি) তো কোনটা কখন ক্লিক করে যাবে কেউ জানে না।

 

কিন্তু গৌতমদা, আপনার শেষ দু’টো সাফল্য কিন্তু অভিনেতা হিসেবেই। প্রথমে ‘২২শে শ্রাবণ’। তারপর ‘চতুষ্কোণ’। পরিচালক গৌতম ঘোষ কোথায় গেলেন?

গৌতম: এটার মানে কী? আসলে আমি অভিনয়টা কম করি। দর্শকদের মধ্যে তার একটা নতুনত্ব রয়েছে। এখানে সবাই পেশাদার অভিনেতা, তাদের মধ্যে আমি তিনতাল বাজিয়েছি, সেটাই মানুষের ভাল লেগে গিয়েছে।

অপর্ণা: আমিও তো অনেক দিন পর অভিনয় করলাম।

 

আচ্ছা, ‘চতুষ্কোণ’য়ের নানা সাক্ষাৎকার করে জানতে পেরেছি এই ছবির জন্য পরমের নাম রেকমেন্ড করেছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। দীপকদার নামও সেকেন্ড করেছিলেন তিনি। কিন্তু সাকসেস পার্টিতে তো তাঁকে দেখা গেল না?

পরম: এই প্রশ্নটা কার জন্য?

সৃজিতের জন্য ।

অপর্ণা: এটা কোন পার্টি? যে পার্টির থিম ছিল রেড? সেই রেড পার্টি?

 

হ্যাঁ, রেড পার্টি।

চিরঞ্জিত: খুব কঠিন প্রশ্ন...

সৃজিত: যেই আপনি বললেন সৃজিতের জন্য প্রশ্ন, সবাই কেমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ওই একটা, ‘যাক বাবা, আমি বেঁচে গেছি’ টাইপের। (হাসি) না, বুম্বাদা বলেছিলেন তিনি আসবেন। কিন্তু ‘ফোর্স’য়ের প্রোমোশন নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য আসতে পারেননি। আমাকে বিবিএম করেছিলেন, ‘বাবু আসতে পারছি না কিন্তু তোদের সঙ্গেই আছি’।

 

আচ্ছা পরম, আজকের একজন স্টার হিসেবে আপনি চিরঞ্জিতের এই কামব্যাকটা কী ভাবে দেখেন?

পরম: দেখুন, আমি ওরকম কামব্যাকটাকে ড্রামাটিক ভাবে দেখতে চাই না। আমি ২০০৩-য়ে দীপকদার সঙ্গে টেলিভিশনে একটা কাজ করেছিলাম। দেবাংশু সেনগুপ্তর ‘স্রোত’। সেই সময় থেকেই দীপকদা আমার কাছে সেই মানুষটা যার নানা ইন্টারেস্ট রয়েছে। বিজ্ঞান, ছবি আঁকা, আর্কিটেকচার। লোকে হয়তো ‘চতুষ্কোণ’য়ের চিরঞ্জিতকে দেখে তার আগের ছবির ইমেজটার সঙ্গে মেলাতে পারছে না। তাই হয়তো কামব্যাক বলছে। কিন্তু আমার কাছে দীপ্ত আর দীপকদার কোনও তফাত নেই। তাই কামব্যাক মনে হয় না। আর দীপকদার বডি অব ওয়ার্কটাকে তো আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। আমাদের সেন্সিবিলিটি দিয়ে হয়তো আমরা ওই ছবিগুলো দেখিনি। কিন্তু নিজের নিরিখে সেগুলো ভাল কাজ।

সৃজিত: আরে ভাই, আমরা দুর্গাপুর গিয়েছিলাম ছবি প্রোমোট করতে। ওখানে দীপকদার পপুলারিটি কল্পনা করতে পারবেন না।

গৌতম: হ্যাঁ, কামব্যাক কেন? দীপক সব সময় ভীষণ সেন্সিবল একজন অভিনেতা।

 

সেন্সিবল অভিনেতা আজকে বলছেন আপনি গৌতমদা। কিন্তু  নিজের কোনও ছবিতে তো কাস্ট করেননি চিরঞ্জিতকে।

গৌতম: হ্যাঁ, এখনও করিনি। তবে ভবিষ্যতে দীপককে কাস্ট করতেই পারি।

 

পরম নিজেও ডিরেক্টর। তিনি কি চিরঞ্জিতকে কাস্ট করবেন?

পরম: অফ কোর্স। এখানে আমি আর একটা ব্যাপার বলতে চাই। কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁরা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও সুন্দর হয়ে ওঠেন। দীপকদা সেই রকম।

চিরঞ্জিত: মানে, আমাকে আগে সাউথ ইন্ডিয়ান হিরো মনে হত, এখন ঠিক আছে। (হাসি)

 

‘চতুষ্কোণ’য়ে চিরঞ্জিতের লুকটারও তো প্রশংসা সর্বত্র?

সৃজিত: এখানে আমি একটা কথা বলি বস। ওই ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়ানোর আইডিয়াটা কিন্তু রিনাদি দিয়েছিলেন।

তাই?

অপর্ণা: মানে, আমি বলেছিলাম। আর দেখুন, আমার কাছে ছবিতে একজন চরিত্রের লুকটা হল ফিফটি পারসেন্ট। বাকিটা অভিনয়। এটা আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। ‘ইতি মৃণালিনী’তে যেমন কৌশিক সেন। লুকটাতেই অর্ধেক কাজ হয়ে গিয়েছিল। দীপকের ক্ষেত্রেও তাই।

 

আপনি চিরঞ্জিতের ক’টা ছবি দেখেছেন রিনাদি?

অপর্ণা: আমি ওর বিশেষ ছবি দেখিনি। কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাড়িওয়ালি’ দেখেছিলাম। হি ওয়াজ ‘ফ্যান্টাসস্টিক’।

সৃজিত: কিন্তু ‘বাড়িওয়ালি’তে তো গলাটা ডাবড্ ছিল। সেটাতে পারফরম্যান্সটা ভাগ হয়ে যায় বলেই আমার ধারণা।

অপর্ণা: কিন্তু ঋতু তো ওকে বলেই ডাব করেছিল।

চিরঞ্জিত: সেটা ওকে করতেই হত। সেটা ছাড়া কোনও অপশনও ছিল না।

অপর্ণা: কিন্তু কোন ছবিতে কোন ভয়েস ইউজ হবে, সেটা পুরোটাই ডিরেক্টরের ওপর।

চিরঞ্জিত: সেটা ঠিক। কিন্তু মানুষের একটু অসুবিধে হয়েছিল। সব্যসাচী (চক্রবর্তী) আমাকে বলেছিল ওকে আমার পুরো পারফরম্যান্সটা দেখানো হয়নি। শুধু দু’মিনিট দু’মিনিট করে দেখিয়ে ডাব করানো হয়েছিল। তাই ওর নিজেরও অসুবিধে হয়েছিল।

অপর্ণা: হ্যাঁ, কিন্তু দীপক, ওই যে বললাম, ওটা ডিরেক্টর্স প্রেরোগেটিভ। ঋতু যখন ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’য়ের বিপাশার গলাটা সোহিনীকে দিয়ে ডাব করিয়েছিল, ইট ডিডন্ট ওয়ার্ক ।

 

রিনাদি, এই ছবিতে আপনি ঋতুপর্ণকে  মিস করেছিলেন।

অপর্ণা: ঋতুকে আমি রোজ মিস করি।

 

এই ছবিতে পরমের চরিত্র ঋতুদা করলে কী হত?

অপর্ণা: ছবিটা বেটার হত কি না জানি না। তবে অন্য রকম হত।

গৌতম: এই ছবিটার কথা তো আমাকে আর রিনাকে প্রথম বলে ঋতুই। তবে ঋতু যখন আমাদের বলেছিল তখন এই ছবিটা একটু অন্য রকম ছিল। তখন কথা ছিল আমরা তিনজন সৃজিতকে মেন গল্পটার মধ্যে যে তিনটে ছোট গল্প আছে, সেগুলোকে ডিজাইন করতে সাহায্য করব।

আচ্ছা ‘চতুষ্কোণ’য়ে একটা সাদা-কালো ওয়ার্কিং স্টিল দেখা যায় অপর্ণা সেন ও গৌতম ঘোষের। সেটা কি অ্যাকচুয়াল ওয়ার্কিং স্টিল?

সৃজিত: হ্যাঁ, ওটা আমি গৌতমদার কাছ থেকে নিয়েছিলাম।

গৌতম: আমার সেটে এসেছিল রিনা। এনটি ওয়ানে। ওটা তখনকার।

 

কোন সিনেমার সেটে?

গৌতম: ওই যে মিঠুনের সঙ্গে যেটা করলাম। ‘গুড়িয়া’র সেটে।

 

আচ্ছা রিনাদি, ‘সতী’র ঝামেলা তো আপনি এড়িয়ে গেলেন। ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আয়ার’য়ের সময় তো গৌতমদার সঙ্গেও আপনার বিস্তর ঝামেলা হয়েছিল।

অপর্ণা: ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আয়ার’য়ের সময়? না তো!

গৌতম: কোথায়? আমরা খুব মজা করে শ্যুট করেছিলাম তো ছবিটা।

 

আপনি কিন্তু হাসছেন রিনাদি।

অপর্ণা: (হেসে) দেখুন ফিল্ম বানানোর সময় ও রকম নানা ঝামেলা হয়েই থাকে। আমি গৌতমকে এত দিন ধরে চিনি। আমরা ঝগড়া করলেও সেটা নো হোল্ডস্ বারড্ হয়। ফাটিয়ে ঝগড়া করি। একবার তো ঝগড়া করতে করতে আমি গৌতমকে বললাম, তুই যে এত ঝগড়া করছিস, কোনও রিপোর্টার এটা জানলে কত বড় স্টোরি হবে বল তো। শুনে গৌতম বলল, ‘তাই না! ঠিক আছে ঠিক আছে। চল আর ঝগড়া নয়।’

গৌতম: আসলে ঝগড়া নয়। কী বলুন তো, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আয়ার’য়ের সময় হয়তো ফ্রেম দেখে আমি রাহুল বসুকে বললাম, ‘রাহুল, একটু ডানদিকে দাঁড়াও।’ যখন এটা বলছি, তখন রিনা এসে আমাকে  কানে কানে বলল, ‘গুটি, ছবির ডিরেক্টর কিন্তু আমি।’ এই আর কী! (হাসি)

 

এ রকম ঝামেলা ‘চতুষ্কোণ’য়ে হয়নি?

গৌতম: ঝামেলা নয়, তবে এত দিনকার অভ্যেস তো, ‘২২শে শ্রাবণ’য়ের সময় সেটে ঢুকলেই যেমন আমি সৃজিতকে বলতাম এই লাইটটা কেন? ওই লাইটটার কী দরকার...

সৃজিত: দেখুন, এই মানুষগুলো সবাই লেজেন্ড। মানে অপর্ণা সেন সেটে ঢুকছেন মানে ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গী...’ ঢুকছে। গৌতমদা সেটে আসছে মানে ‘পার’ সেটে আসছে। এই ব্যক্তিত্বরা অসম্ভব ইন্টিমিডেটিং।

পরম: তবে আমি দেখেছি রিনাদি  সাজেশন দিলেও কিন্তু শেষে সৃজিতকে বলত, ‘তোর ব্যাপার, তোর ছবি, তুই যা ঠিক বুঝবি।’

অপর্ণা: (হেসে) হ্যাঁ, তোর মাছ তুই ল্যাজায় কাটবি না মুড়োয় সেটা তোর ব্যাপার।

চিরঞ্জিত: মানে পুরোটাই হল পরস্ত্রী। যাই করো না কেন, হাত দিতে পারবে না। এটাও সেই রকম।

 

আচ্ছা, এই ছবিতে একটা ডায়লগ আছে। চিরঞ্জিত বলছেন গৌতম ঘোষকে, ‘বাংলা ছবি আসলে চলে কাজের লোকেদের পিগি ব্যাঙ্কের টাকায়।’ যখন এই রকম ডায়ালগ বলছেন চিরঞ্জিত, তখন গৌতমদা আপনার খারাপ লাগেনি যে এটা একপ্রকার আপনার ছবির ঘরানাকে ছোট করা হচ্ছে?

গৌতম: না। আমার মনে হয়নি। তারপর তো সেটার একটা এক্সপ্ল্যানেশন আছে।

সৃজিত: হ্যাঁ, এক্সপ্ল্যানেশন তো আছেই যে সব রকম ছবি চললেই ইন্ডাস্ট্রির ভাল হবে।

অপর্ণা: আর দেখুন এই দু’ধরনের ছবি নিয়ে চর্চা আগেও ছিল, আজকেও হবে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

চিরঞ্জিত: হ্যাঁ,  সাহিত্যে আছে। সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও আছে। কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে আমি দেখছি কিছু মানুষ আছেন যাঁরা এই রকম ছবিতে অভিনয় করলেও সেই ঘরানাটাকে ছোট করেন। এ ছাড়া অন্যধারার যে ফিল্ম হয়, সেটায় মেনস্ট্রিম ছবিগুলোকে নানা ভাবে নানা ডায়ালগে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা হয়।

অপর্ণা: এটা ঠিক নয় দীপক। নাসিরের অত ভাল ভাল ছবি আছে। কিন্তু কমার্শিয়ালি মোটিভেটেড ডিরেক্টররা কী বলে? বলে, ‘ছবি ভাল কিন্তু দেখছেন ক’জন?’ ‘১৫ পার্ক অ্যাভিনিউ’য়ে কঙ্কনা দারুণ অভিনয় করেছিল, কিন্তু কর্ণ জোহর বলল, ‘কঙ্কনা ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু কত জন দেখেছে

 

ছবি?’ তাই এটা ঠিক নয় যে, একটা গোষ্ঠী বলে অন্য গোষ্ঠী বলে না। সবাই বলে।

চিরঞ্জিত: লুঙ্গি আর ধুতির তফাতটা থেকেই যাবে।

সৃজিত: হ্যাঁ, সিনেমাতেও আমরা-ওরা আছে।

 

পরম, আপনার মতে ‘চতুষ্কোণ’ কি সৃজিতের বেস্ট ফিল্ম?

পরম: আমার সৃজিতের তিনটে ছবি দারুণ লাগে। ‘২২শে..’, ‘জাতিস্মর’ আর ‘চতুষ্কোণ’। কোনটা ফার্স্ট, কোনটা সেকেন্ড এটা বলা কঠিন।

 

‘চতুষ্কোণ’ হিট। পূর্বজন্ম আর মহামায়া থাকলেও ‘জাতিস্মর’ তো হিট হয়নি।

পরম: সেটা আলাদা একটা আলোচনা। আমি আমার প্রেফারেন্সটা বললাম।

সৃজিত: এবং বেশির ভাগ মানুষই এই তিনটে ছবি বলে। যদিও আমার সবচেয়ে বড় হিট ‘মিশর রহস্য’। কিন্তু কেউ সেটাকে আমার বেস্ট তিনটের মধ্যে রাখে না। সেটা নিয়ে একটা আলাদা তর্ক হতেই পারে।

 

পরম, এই ছবির প্রচারে আপনাকে খুব বেশি দেখা যায়নি। সেটা কেন?

পরম: দেখুন, ছবি রিলিজের ছ’মাস আগে থেকে আমার ইউরোপ যাওয়ার প্ল্যান ছিল। আমি ছবি রিলিজের আগে ২২ দিন ইউরোপে ছিলাম। ওখানে যাওয়ার আগে কিন্তু পাঁচটা টিভি শো করে গিয়েছিলাম। কখনও জোকাতে, কখনও এবিপি আনন্দ-র অফিসে। তাও ফিরে এসে শুনলাম, নানা অভিযোগের মধ্যে এটাও বলা হচ্ছে যে, আমি নাকি ছবিটা প্রোমোট করিনি।

 

এটা কি প্রোডিউসর রানা সরকারের সঙ্গে আপনার ঝামেলার জন্য?

পরম: প্রোডিউসরের সঙ্গে অনেক ব্যাপারেই প্রবলেম আছে আমার। অনেক মিথ্যে অভিযোগ ছোড়া হয়েছে আমার দিকে। নিজেও জানি না কেন উনি এ সব কথা বলেছেন বা তার উদ্দেশ্য কী?

 

শেষ প্রশ্ন। সিনেমায় তো দীপ্ত আর তৃণার ভাব হল। তা হলে কি রিল আর রিয়েল লাইফ মিশে গিয়ে চিরঞ্জিত হ্যাপি দিওয়ালি কী শুভ বিজয়ার এসএমএস পাঠাচ্ছেন অপর্ণা সেনকে?

চিরঞ্জিত: হা হা হা হা।

অপর্ণা: এই যে আপনারা একটা ইমাজিনারি ঝগড়া আর ইমাজিনারি ভাবের গল্প ফাঁদেন মিডিয়াতে... আমি চললাম (হাসি)।

সৃজিত: হা হা হা হা। এই বলে তৃণা মোবাইলটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন...

পরম: ...এবং আমাদের ‘চতুষ্কোণ’য়ের আড্ডা শেষ হল।

 

পুনশ্চ: চতুষ্কোণ’ছবির শেষে যেমন ট্যুইস্ট ছিল তেমনই হোটেলের স্মোকিং লাউঞ্জেও এমনই এক ঘটনা ঘটল। উপস্থিত ছিলেন, পরম, সৃজিত এবং ছবির প্রোডিউসর রানা সরকার।

কী ঘটেছিল সেটা অন্য আর একদিনের জন্য তোলা থাক...

চার জন ডিরেক্টরের চারটে গল্প, যেখানে
মেন থিম মৃত্যু  এই কনসেপ্টটা দারুণ
অপর্ণা সেন

পরমের রোলটা কাউকে ডাব
করতে বলা হোক সে পারবে না
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

এখানে সবাই পেশাদার অভিনেতা,
তাদের মধ্যে আমি
তিনতাল বাজিয়েছি
গৌতম ঘোষ

যারা আনন্দবাজার পড়ে ছবি দেখতে যায়,
সৃজিত এই দর্শকদের মনটা
সবচেয়ে ভাল বোঝে
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়

 

 

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল

লোকেশন সৌজন্য: গেটওয়ে হোটেল