বেলগাছিয়া রাজবাড়ির ছাদের ঘরে তখন দুপুরশেষের আলো। এককোণে খাটের উপরে বসে ইরাবতী। দুধে-আলতা শাড়ি, গলাজোড়া হার আর বাঁ হাতে ঘড়ি। শুটিংয়ের ফাঁকে চরিত্রের খোলস ছেড়ে বেরোলেন মনামী ঘোষ।

 

প্র: আপনি কিন্তু আজও একই রকম সুন্দর...

উ: আসলে কোনও এফর্ট দিইনি। মন থেকে খুশি থাকি বলেই হয়তো একই রয়ে গিয়েছি।

 

প্র: বসিরহাট থেকে এসে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হয়নি?

উ: আমি একা এখানে আসিনি। যখন ‘সাতকাহন’ করি, তখন টানা পনেরো দিন শুট হতো। তার পরে বসিরহাটে ফিরে যেতাম। ‘শ্যাওলা’ টেলিকাস্ট হওয়া আমার প্রথম মেগা। এর পরে অনেক অফার আসতে শুরু করল। বাবাই সিদ্ধান্ত নেন, পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় চলে আসার। ফলে আমি যে একা এসে স্ট্রাগল করেছি, সেটা নয়। ইন্ডাস্ট্রিতেও অসুবিধে হয়নি।

 

প্র: ওয়েব কনটেন্টের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে টিভি কি পিছিয়ে প়ড়ছে?

উ: কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই। ইদানীং  মিথলজিক্যাল, রূপকথার গল্প দেখানো হয়। সেগুলোরই টিআরপি বেশি। দর্শকরা সেটাই দেখছেন। আমাদের যেমন বুঝতে হবে যে, বদলানো জরুরি, চ্যানেলকেও বোঝাতে হবে। দর্শকের যদি কোনও ধারাবাহিক দেখে মনে হয়, সেটা পিছিয়ে প়ড়া, তা হলে দেখাই উচিত নয়। কিন্তু যদি কেউ নতুন বিষয় দেন আর দেখা যায় যে রূপকথারই টিআরপি হাই, তা হলে? তাই মেগার বিষয় বদলের দায়িত্ব যতটা টিভির, ততটাই দর্শকেরও। এবং সেটা ফেসবুকে লিখে নয়, বোঝাতে হবে টেলিকাস্ট না দেখে।

 

প্র: অনেক সময়ে নতুন বিষয়ও চর্বিতচর্বণেই ফিরে যায়। অভিনেতা হিসেবে বিরক্ত লাগে না?

উ: একটু তো লাগেই। তবে সপ্তাহশেষে যখন জানতে পারি, তিনটে বিয়ে বলে আমারটারই টিআরপি হাই, মনে হয় ঠিকই আছে।

 

প্র: আপনার সঙ্গে যাঁরা কাজ শুরু করেছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই পার্শ্বচরিত্রে। আপনি এখনও লিড করছেন। রহস্যটা কী?

উ: সত্যিই জানি না। আমি লিড দিয়েই শুরু করেছিলাম। মাঝখানে যে দু’-একটা পার্শ্বচরিত্র করিনি, তা নয়। যেমন ‘এক আকাশের নীচে’, ‘একদিন প্রতিদিন’। কিন্তু একটা সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই খারাপ লাগা সত্ত্বেও খুব কাছের হাউসকে ফিরিয়ে দিয়েছি। হয়তো দর্শক এখনও আমাকে লিডে দেখতে চান। হাউস আর চ্যানেলেরও একই বক্তব্য। তাই আমারও সিদ্ধান্ত, লিড ছা়ড়া করব না।

 

প্র: কতটা বদলাল ইন্ডাস্ট্রি?

উ: কাজের ধরনটাই পুরো পাল্টে গিয়েছে। শুটিং বন্ধের ব্যাপারটা তখনকার সময়ে হলে, রিপিট টেলিকাস্ট দিতেই হতো না। অন্তত পনেরো দিনের ব্যাঙ্কিং থাকত। অর্গানাইজ়ড ছিল। এখন অনেক জায়গায় স্ক্রিপ্ট তো নয়ই, গল্পও তৈরি থাকে না। তাই ইদানীং কালের ছেলেমেয়েরা কিন্তু বেশি ট্যালেন্টেড। আমাদের হাতে ধরে শেখানো হতো। এখন যে যার মতো। আমি নিজেই হয়তো ফিরে দেখছি না, অন্য শটটা কেমন হল। সময়ই নেই! তবে মনে হয়, এ বার বদলাবে। ‘ইরাবতীর চুপকথা’ই বদলাচ্ছে। এক বছরের গল্প, ওয়ান লাইনার রেডি। আগে এনটিওয়ান, ইন্দ্রপুরী, টেকনিশিয়ান্স... কয়েকটা জায়গাতেই শুটিং হতো। এখন বড্ড দূরে দূরে যেতে হয়! এত কাজ হয় যে, জায়গায় কুলিয়ে উঠছে না।

 

প্র: আপনার করা ছবির চরিত্রগুলো ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্তটা কি সচেতন ভাবে নেওয়া?

উ: একদমই নয়। অনেক ফিল্মের অফারও যে পেয়েছি, তা নয়। তবে যেটায় আমি হিরোইন, সে রকম গল্প পড়ে মনে হয়নি যে দাঁড়াবে। ‘বেলাশেষে’ও করতে চাইনি। শিবুদা (মুখোপাধ্যায়) ধমকে করিয়েছিল। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ করেছিলাম নাচ ছিল বলেই। পরে দেখলাম সেটাও দারুণ হল। লীনাদির (গঙ্গোপাধ্যায়) সঙ্গে কাজ করার সময়ে আগে থেকেই ‘মাটি’র কথা বলেছিলেন।

 

প্র: আপনার নাচের অনু্প্রেরণা কে?

উ: ছোটবেলায় মাধুরী দীক্ষিতকে খুব দেখতাম। আসলে নাচের জন্য অনুপ্রেরণার দরকার হয় না। তিন বছর বয়স থেকে করছি তো! যা বলতে পারি না, সেটা নাচ দিয়েই ফুটিয়ে তুলতে পারি।

 

প্র: কোনও আক্ষেপ নেই?

উ: মুম্বইয়ে কাজ করা হল না। আক্ষেপ নয়, তবে হলে ভাল হতো। অনুরাগ বসু নিজে ফোন করেছিলেন। তখন কলকাতাতেই গুছিয়ে উঠতে পারিনি। তাই মুম্বই যাওয়ার সাহস পাইনি। পরে রূপাদি (গঙ্গোপাধ্যায়) একতা কপূরকে আমার করা ‘ছয়’-এর একটা অংশ দেখিয়েছিলেন। ওঁদের একটা সিরিয়ালে সিলেক্টও হয়েছিলাম। পর দিন থেকেই শুটিং ছিল। জানলাম, এক মাস ফিরতে পারব না। আবার এখানে একটা রিয়্যালিটি শো সাইন করা ছিল। পর দিনই ফিরে এলাম। তখন এক ইপি বলেছিলেন, ‘‘ইউ আর নট গেটিং হোয়াট ইউ আর গেটিং।’’ এখন বুঝি।

 

প্র: কখনও থিতু হতে ইচ্ছে করেনি?

উ: আমি আসলে থিতু না হয়েও থিতু বলতে পারেন। সম্পর্কে সেটল্‌ড। অবিরাম শিখছি। কোথাও আটকে নেই। নানা জায়গা ঘুরে বেড়াচ্ছি... ভালই তো আছি।