মধ্যরাত।
অঝোর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে সামসিং চা-বাগান। বৃষ্টি ছাপিয়ে চা-বাগানের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ছায়ামূর্তি। সাহেবি বাংলোর লাগোয়া কবরস্থানে। শ্যুটিংয়ে টানা চার দিন রাত ন’টার পর একটা নির্দিষ্ট সময় ক্যামেরা থেকে আলো চলে যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বাংলোর সব বৈদ্যুতিক সংযোগও। ইতিমধ্যে প্রোডাকশনের অনেকেই চা-বাগানে, জঙ্গলের রাস্তায় দেখে ফেলেছেন সাদা ভূত। কেউ বা অনুভব করেছেন ভূতের নিশ্বাস!

জঙ্গলে ও কে!
বৃষ্টি থামার পর সেই ছায়াকে ধরতে রাত সাড়ে তিনটেয় ইউনিটের একদল লোক জঙ্গল অভিযান চালিয়েছিলেন। অজানা সব পাখির ডাক শুনতে শুনতে হঠাৎই তাঁদের চোখে পড়ে স্যান্ডো গেঞ্জি পরা এক অবয়ব। সকলে ধরে নিয়েছিলেন সেই অবয়ব বুঝি কোনও এক জঙ্গলরক্ষীর। সকালে জানা গেল গতকাল রাতে ওই জায়গায় কোনও জঙ্গলরক্ষীই ছিল না! হচ্ছেটা কী? ‘‘মানুষ খরচা করে ভয় পেতে ভালবাসে। এমন এক ভয়, যে ভয়ে নিরাপত্তা আছে। এই সেফ ফিয়ারটাই সারা ইউনিটে ছড়িয়ে গিয়েছে। এতে ইউনিটের স্পিরিটটা বোঝা যায়,’’ বললেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। এই বাংলোতেই বেশ কয়েক দিন ধরে কৌশিক শ্যুটিং করছেন তাঁর পরবর্তী ছবি ‘বাস্তু শাপ’-এর। 

 

শুকনো লঙ্কার ধোঁয়া

এই আজগুবি সব কাণ্ডকারখানার মাঝেই শ্যুটিং ব্রেকে আড্ডা দিচ্ছিলেন পরমব্রত-রাইমা-আবীর-চূর্ণী-কৌশিক। সঙ্গী মুড়ি, চানাচুর, ঘুগনি। রাইমা মায়ের কথামতো গ্রিন টি খেতে খেতে আলুকাবলি খাওয়ার বায়না ধরলেন। এক বাটি আলুকাবলি তাঁর এক্ষুনি চাই। রাইমার ঘ্যানঘ্যানানি বন্ধ করতে পরমব্রত বলে উঠলেন, ‘‘যেখানে রাইমা থাকবে, সেখানে ভূত আসবেই। ও এতটাই এন্টারটেনার যে সাহেব ভূতদেরও ওকে দরকার হয়ে পড়েছে। সাহেবরা বরাবরই ডিসিপ্লিন পছন্দ করে।
আমরা সারা রাত শ্যুট করছি। সেটা ওরা মেনে নেবে কেন? তাই ওদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। টুকটাক উপদ্রব চলছে।’’

কয়েক দিন আগেই হোটেলে পাখার ব্লেডে পরমব্রতর আঙুল কেটে গিয়েছে। ব্যান্ডেড বাঁধা আঙুল লুকিয়েই শট দিতে হচ্ছে তাঁকে। ইউনিটের যদিও অনেকেই এটাকে ভৌতিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, কিন্তু পরমব্রত মানতে নারাজ।

ভূত যেখানেই থাকুক না কেন, রাইমা শুকনো লঙ্কা পুড়িয়ে ভূতের নজর থেকে এ যাত্রায় বাঁচতে চাইছেন। ধবধবে সাদা নাইটি, খোলা চুলে হঠাৎই যেন ভ্যানিশ হয়ে গেলেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল রান্নাঘরে লঙ্কা পোড়াতে গিয়েছেন। এক বাটি আলুকাবলি হাতে, কালো কাজ করা সালোয়ার কামিজ আর ভরাট কাজল-চোখ নিয়ে ফিরলেন রাইমা।

গ্রিনটাচ এন্টারটেনমেন্ট প্রযোজিত এই ছবিতে তাঁর চরিত্রের নাম বন্যা। আবীরের স্ত্রী। একটা ক্লাসি লুক দেওয়া হয়েছে তাঁর চরিত্রকে। নিজের জন্য দারুণ সাজছেন তিনি এ ছবিতে। লঙ্কা পুড়িয়ে ততক্ষণে বুঝে ফেলেছেন রাইমা ভূত হোক কী মানুষ সকলেরই নজর তাঁর দিকে। ভাবছেন রাতে ভূতের সঙ্গে প্ল্যানচেটে আলাপ জমাবেন।

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের রান্নাঘর

শুধু শ্যুটই নয়, রান্নার বিষয়েও এক শটে ‘ওকে’ করতে চান কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। থিম অনুযায়ী, মুড অনুযায়ী, এখানে মেনু ঠিক হয়। জামাইষষ্ঠীতে আবীর যাতে তাঁর শাশুড়িকে একটুও মিস না করেন, সে কথা ভেবেই এই ভয়াল জঙ্গলে কচি পাঁঠার ঝোল রান্না হয়েছিল। শুধুই কি কচি পাঁঠা? কোনও দিন দেশি মুরগির পাতলা ঝোল, কোনও দিন বৃষ্টি দেখে গলা খিচুড়ি আর ডিমভাজা। বলা যায় না এ সবের গন্ধ আর স্বাদেই হয়তো ভূতেদের আনাগোনা বেড়েছে।

দেড়শো লোকের ইউনিট— ঠিক যেন জমজমাট এক পিকনিক। পোড়ো বাংলোকে পুরোদস্তুর হেরিটেজ হাউসের চেহারা দিতে কলকাতা থেকে ছয় ট্রাকভর্তি অ্যান্টিক আসবাব এসেছে। কী নেই সেখানে! ম্যাট ফিনিশ ওয়াল ম্যাট থেকে অ্যান্টিক টেলিস্কোপ, গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, সেগুন কাঠের কারুকাজ করা বইয়ের র‌্যাক। সেখান থেকে উঁকি মারছে সুকান্ত সমগ্র। ট্রেজার আইল্যান্ডও। আছে অজস্র পুরনো পেন্টিং আর বাঁধাই করা ফ্যামিলি অ্যালবাম।

 

হিংস্র বাঘের মুখ

এই ছবিতে থ্রিলারের আবহে ভালবাসার গল্প বলছেন কৌশিক। ছবিটির প্রযোজক শ্যামসুন্দর দে। ছবিতে বাড়িটাই যেন একটা দ্বীপ। আজকের পাহাড়ি বাড়ির সঙ্গে তার অনেক তফাত। সেই বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে হিংস্র বাঘের মুখ। কোথাও রাখা বন্দুক। কোথাও বা রুপোর ক্রকারি, পুরনো মদের পেয়ালা। কেমন যেন অস্বস্তি হতে থাকে... ‘‘এই অস্বস্তিটা ছবির সম্পর্কের মধ্যেও আছে। এখানে প্রত্যেক মানুষ সুখের খোঁজে। আজকের বিচ্ছেদ, অশান্তি, অবিশ্বাসের দুনিয়ায় মানুষ ভালবাসার কাঙাল। সেই ভালবাসাকেই পাঁচটি চরিত্রের মধ্যে দিয়ে খোঁজা হয়েছে। সমতলের মানুষ পথের পাকদণ্ডী বেয়ে বেয়ে উঠেছে পাহাড়ে। আর সেই উচ্চতা থেকে সম্পর্কগুলোকে ফিরে দেখাতে চাইছি আমি এই ছবিতে। দীনতা, মলিনতা মুছে ফেলে মানুষ চাইলেই সুন্দর থাকতে পারে। এর জন্য কোনও লাফিং বুদ্ধের প্রয়োজন হয় না,’’ শটের ফাঁকে বলেন কৌশিক।

ঝুপ করে সন্ধে নামল। পরমব্রত একথালা ফল নিয়ে বসলেন। আর আবীর ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘‘অপুদার ছবি আসছে। নাম ‘ব্ল্যাক কফি’।’’ সদ্য একটা শট দিয়ে এসে পরমব্রত শার্টের ক্রিজ ঠিক করে দিচ্ছিলেন আবীরের। উল্টো দিকে আবীর হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘‘পরম, ডায়লগটা এ ভাবে বল, দারুণ জমে যাবে।’’

শ্যুটিংয়ের ফাঁকে পাঞ্জা-ব্রেক

পরমের বাউন্সার আবীরের ইয়র্কার

‘২২শে শ্রাবণ’-এর পর পরমব্রত-আবীর আবার মুখোমুখি। অভিনয় করতে করতে কেউ বাউন্সার দিচ্ছেন, তো কেউ ইয়র্ক করছেন। ‘‘আমি তো আমার চোখের সামনে দু’জন অসাধারণ অভিনেতাকে ডুয়েল লড়তে দেখছি। পরম-আবীর খুব কাছের বন্ধু। একে অপরকে সাহায্যও করছে। কিন্তু অভিনয়ের সময় কেউ কাউকে জায়গা ছাড়ছে না। এই হেলদি কম্পিটিশনটা খুব এনজয় করছি,’’ ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক করতে করতে বললেন কৌশিক।

রাত সাড়ে বারোটা। মোনোলগের মতো একটানা সংলাপ বলে গেলেন আবীর। এক শটেই ‘ওকে’।

কেমন লাগছে? জানতে চাইলে পরমব্রত বলেন, ‘‘আবীর আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। আজও ক্রিকেট খেলার ইচ্ছে হলে ওকেই ফোন করি। আজও আমি কোনও ছবি না করলে সেটা আবীরই করে। আবার উল্টোটাও হয়। তবে এই বন্ধুত্ব নিয়ে খুব বেশি মাখামাখি নেই আমাদের।’’ আবীর যোগ করলেন, ‘‘পরমের সঙ্গে যেটুকু লড়াই, তা শুধুমাত্র পর্দায়।’’ হঠাৎই বললেন, ‘চল্ লড়ি আমরা।’ টেবিলে পাঞ্জা লড়লেন দু’জন।

লড়াইয়ে উৎসাহ দিতে চলে এলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। যেন চেকভের নাটকের জমাটি দৃশ্য।

টেলিস্কোপে চোখ রাখলেন রাইমা সেন

ফেসবুক হোয়াটস্অ্যাপে প্রেমপর্ব

শুধু নিজের অভিনয় নয়, প্রত্যেকটা শটের ফ্রেম দেখছেন পরমব্রত। যেন নিজেরই ছবি। বললেন, ‘‘কৌশিকদার ইউনিটটাই এমন। স্পটবয় থেকে প্রোডাকশন ম্যানেজার সকলেই ভাবে এটা তাঁদের নিজেদের কাজ।’’ অন্য দিকে পরমব্রতকে নিয়ে আপ্লুত পরিচালক। ‘‘দু’বছর আগের পরম, আর আজকের পরমের আকাশপাতাল তফাত। আমি অভিনয়টা বুঝি। তাই দায়িত্ব নিয়েই বলছি অভিনয়ের জন্য মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা এই পরমকে দেখে আমার সত্যিই ভাল লাগছে,’’ বলেন কৌশিক। আলুকাবলি দিলেও শুধু ছোলাটা খাচ্ছেন তিনি। রোজ সকালে পাঁচ-ছ’কিমি দৌড় লাগাচ্ছেন। বৃষ্টিকেও কাবু করে ফেলেছেন। বাংলোর বিশাল ঘরগুলোতে হাঁটা লাগাচ্ছেন। এক্সারসাইজ কোনও ভাবেই মিস করা যাবে না। কিন্তু গার্লফ্রেন্ডকে মিস করছেন। হোয়াটস্অ্যাপ আর ফেসবুকে সেরে ফেলছেন প্রেমপর্ব।

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় নিজেও একটি ইন্টারেস্টিং চরিত্রে অভিনয় করছেন এই ছবিতে। পরমব্রত তো বলেই ফেললেন, ‘‘বাঘা চরিত্রটা কৌশিকদা নিজের জন্যই রেখেছে।’’ বাড়িতেও সদ্য একটা নতুন শোকেস তৈরি করেছেন কৌশিক। অগুন্তি পুরস্কার ঠাঁই পেয়েছে সেই শোকেস-এ। শুধু বক্স অফিস নয়, বাড়িতেও কি তা হলে বাস্তুর ছোঁয়া লাগল? ভূত থেকে বাস্তু— কোনও কিছুকেই অস্বীকারের জায়গায় নিয়ে যেতে চান না তিনি। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় মানেই তো জাতীয় পুরস্কারের ছড়াছড়ি। ঘুগনি খেতে খেতে বললেন, ‘‘ওটা তো বোনাস। ও নিয়ে ভাবি না। তবে আমার চরিত্রদের এত সুন্দর দেখাচ্ছে এ ছবিতে, মনে হয় আমার সবচেয়ে সুন্দর ছবিটা বানিয়ে ফেললাম।’’

 

ব্ল্যাক ম্যাজিক আর কিসিং পিজিয়ন

চিনি ছাড়া কফি খেতে খেতে কালো-লাল প্রিন্টেড গাউন আর কোঁকড়ানো লম্বা চুলে একের পর এক শট দিচ্ছেন চূর্ণী। ফোনে খোঁজ রাখছেন ছেলেরও। ছবিতে দেখা যাবে না উজানকে? ‘‘ওর ইচ্ছে হলে নিশ্চয়ই আসবে। আমরা তো ওর ওপর জোর করি না।’’ পাহাড়ের মতোই শান্ত, ধীর তিনি। ‘নির্বাসিত’ খুব শিগ্গির মুক্তি পাবে। চেনা ইউনিটে শুধু অভিনয়ের জন্য এসে বেশ রিল্যাক্সড লাগছিল তাঁকে। শটের ফাঁকে কৌশিকের হাত ধরে বললেন, ‘‘জানো, খুব আরাম লাগছে এবার। অভিনয় আর পরিচালনা দু’টো একসঙ্গে করতে হলে না পাগল-পাগল লাগে।’’ এরই মধ্যে হোয়াটস্অ্যাপ করতে করতে রাইমা চূর্ণীকে বললেন, ‘‘আচ্ছা, হোয়াট ইজ ব্ল্যাক ম্যাজিক? ফিউচার জানা যায়?’’ চূর্ণীর ঠোঁটে হাসির ঝলক। বললেন, ‘‘কেন রে? ইউ ওয়ান্ট টু নো অ্যাবাউট দ্যাট ফেলো?’’ আর্মি ম্যান-এর কোট প্যান্টে চওড়া গোঁফ নিয়ে আবীর পাশ থেকে টিপ্পনী কাটলেন, ‘‘তা ছাড়া আবার কী? রাইমা এখন শুধু তার কথাই জানতে চাইবে।’’ যেই না বলা, আবীরের পিঠে এক চাপড় মেরে রাইমা বললেন, ‘‘জিজ্ঞেস করুন তো ওকে ওর বাড়িতে কিসিং পিজিয়ন আছে কি না? এই যে আবীর, বলো বলো...’’ আবীর বেশ বিরক্ত। চূর্ণী সামলালেন পরিস্থিতি। ‘‘রাইমা, সব কথা ফসফস করে বলতে নেই।’’ সকলেই চুপ। কিসিং পিজিয়ন নিয়ে কী এমন বলে ফেলেছিলেন রাইমা? সেই রহস্য ছবির জন্য থাক।

নিউ লুক-এ চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়

পেটের মধ্যে কেউ মিক্সি চালিয়ে দিয়েছে

শ্যুটিং চলছে। এবার চূর্ণী আর কৌশিক মুখোমুখি। খুব ফর্ম্যাল শট। সেটা ন’বারে ‘ওকে’ হল। কারণ? চূর্ণীর সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে বারবার হেসে ফেলছিলেন কৌশিক। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘‘‘শব্দ’-এর পর আবার চূর্ণীর মুখোমুখি।
এত বছর একসঙ্গে আছি আমরা। তবুও ওর সামনে অভিনয় করাটা আমার কাছে আজও অস্বস্তিকর। আমার হাসি থামছে না। মনে হচ্ছিল পেটের মধ্যে কেউ মিক্সি চালিয়ে দিয়েছে।’’

 ঘন অন্ধকারের রাত। কেমন একটা গা ছমছমে ভাব...

জঙ্গলের রাস্তা পেরিয়ে হোটেলের পথে গাড়িটা হঠাৎ ব্রেক কষল। ছায়ামূর্তি? নাহ্, রাস্তা পেরোচ্ছে ডোরাকাটা ভয়ঙ্কর সাপ।

বাস্তু সাপ?

 

ছবি: কৌশিক সরকার