কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটির দূরত্ব কত? মাত্র তিন মাইল।

বারুইপুরের কাছে প্রয়াত পরিচালক যিশু দাশগুপ্তের বিশাল বাগানবাড়িতে আপাতত উঠিয়ে আনা হয়েছে এই দুই গ্রামকে। দুই গ্রামের মধ্যে দূরত্ব বলতে মাঝের একটি দরজা। সার দিয়ে মাটির বাড়ি। মাটির দাওয়া। খড়ের চাল। জানলায় আলপনার আঁকিবুকি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানেই চলছে ‘জগজ্জননী মা সারদা’র শ্যুটিং।

আকাশ আটে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার স্লটে ‘জগজ্জননী মা সারদা’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘পটলকুমার গানওয়ালা’, ‘সোহাগী সিঁদুর’ এবং ‘রাজযোটক’ যা সম্প্রচার হয় অন্যান্য চ্যানেলে।

এমন সব মুখরোচক ধারাবাহিক সরিয়ে ডট কম দুনিয়ার দর্শকেরা কি চোখ রাখবেন এমন ধারাবাহিকে?

‘‘ওই সব ধারাবাহিকের পাশাপাশি ‘মা সারদা’-ও চলবে। একটা অডিয়েন্স আছেই যাঁদের হৃদয়ে বসে আছেন তিনি। না-হলে আমাদের ‘ওম সাঁই রাম’ চলল কী করে?’’ নিশ্চিত প্রযোজক ঈশিতা সুরানা।

পরিচালক সুশান্ত বসু জানালেন ‘‘শুরু থেকেই টিআরপি’র কথাটা মাথায় রাখছি না। তথ্য যাতে ভুলভাল না-হয়, সেটাই দেখছি।’’

‘‘এখানে কাহিনিটি অন্য রকমের। মা সারদাকে অবলম্বন করে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনীতে ঢোকা। চিন্তাভাবনা আর চিত্রনাট্যে গতি দরকার,’’ চিত্রনাট্যকার ঋতমের মন্তব্য। তাঁর মতে, বিষয়ভিত্তিক দৃশ্য বিনোদনের মতো করে দেখাতে হবে। ভাব-ভক্তির নিরিখে দর্শকেরা কোনও সিরিয়াল দেখেন না।

কীসের উপরে ভর করে এগোবে ধারাবাহিকের কালজয়ী কাহিনি? চ্যানেলের ভরসা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ই। যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেব, মা সারদা আর স্বামী বিবেকানন্দের উপরে গত কুড়ি বছরে ধরে তাঁর চর্চা আর   গবেষণার ফসলের উপরে নির্ভর করেই এই কাজে ঝাঁপিয়েছেন প্রযোজক। ‘‘আমি ঠিকঠাক করে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছি ওদের। বাকিটা ওদের  হাতে,’’ জানালেন সঞ্জীববাবু।

সঞ্জীববাবুর  কাছে গিয়ে কী অভিজ্ঞতা হল চিত্রনাট্যকার ফাল্গুনি সান্যালের?

‘‘আমি যখন সঞ্জীববাবুর সঙ্গে বসি, বইও লাগে না ওঁর। যে-ভাবে এক-একটি ঘটনাকে ‘ন্যারেট’ করেন, আমি যেন চোখের সামনে ছবিগুলি দেখতে পাই’’, বলার সময়ে মুগ্ধতা ফাল্গুনির চোখেমুখে।

শ্রীরামকৃষ্ণ চরিত্র নিয়ে কী ভাবছেন অভিনেতা সুমন কুণ্ডু? ‘‘দু’টি উপদেশ আমার মনে দাগ কেটে গিয়েছে। সঞ্জীববাবু  বললেন, দেখো, ঠাকুর তোমার উপরে প্রসন্ন হন কিনা। আর স্বামীজি বললেন, মন থেকে সুন্দর থেকো, পবিত্র থেকো।’’ ঠাকুরের কাছে একটিই প্রার্থনা সুমনের। পর্দায় শ্রীরামকৃষ্ণের ভূমিকায় যাঁরা তাঁর অভিনয় দেখবেন, তাঁরা যেন তাঁকে বিশ্বাস করেন।

এ কথা শুনে কী বলছেন ‘সাধক বামাক্ষ্যাপা’র প্রাণভোমরা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়?  ‘‘শ্রীরামকৃষ্ণ সাধারণ হয়েও অসাধারণ। তাঁর সারল্য আর উপলব্ধি দেখার মতো। অভিনয়ে সুমনকে এই উপলব্ধি আর সারল্যটি নিয়ে আসতে হবে, খুবই কঠিন কাজ!’’

মা সারদার ভূমিকায় তাঁকে অভিনয় করতে হবে শুনেই বেশ ভয় পেয়েছিলেন অর্পিতা মণ্ডল। ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। পার্থিব মাতৃত্ব মা সারদা চাননি। মাতৃত্ব দিয়ে সকলকে আপন করে কাছে টেনে নেওয়ার সাধনায় তিনি অদ্বিতীয়া। এমন এক চরিত্রে অভিনয় করা কি সোজা কথা?

ইংলিশ অনার্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রীর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘মা সারদা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতাম না। চিত্রনাট্যকার ফাল্গুনি জেঠু সারদা মায়ের জীবনী গল্পের মতো করে আমাকে শুনিয়েছেন। চেষ্টা করব কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর আত্মত্যাগ, দায়বদ্ধতা এবং সবার প্রতি তাঁর ভালবাসা ফুটিয়ে তুলতে।’’

মা সারদার ভূমিকায় অভিজ্ঞ কাউকে নিলে ভাল হত না? পরিচালক সুশান্তর তা মনে হয় না। তাঁর ভরসা ‘টিমওয়ার্ক’ আর নতুনরা। বললেন, ‘‘নরম মাটি গড়ে নেওয়া যায়। মুখ্য চরিত্রদের বলেছি, ‘বাই হার্ট’ অনুভব করতে হবে। কঠিন পরীক্ষা। হ্যাঁ, আমার কাছেও।’’ দাবি করলেন, মনামি, সাগ্নিক, দেবলীনা, অপরাজিতা ঘোষ দাসের মতো নতুনদের তিনি সুযোগ দিয়েছিলেন।

মেকআপের পরে সুমন আর অর্পিতার চেহারায় শ্রীরামকৃষ্ণ আর মা সারদার আদল। মনে পবিত্র ভাব আনার জন্য নিয়ম করে সুমন আর তিনি অন্ধকার ঘরে ধ্যানে বসেন।  নিরামিষ খান। 

দক্ষিণেশ্বর অছি পরিষদের কর্তা কুশল চৌধুরী দূরভাষে জানালেন, ‘‘সময় পেলেই বসে দেখি এই ধরনের সিরিয়াল। প্রোডাকশন হাউসকে বলেছি, কাহিনি যেন তথ্যপূর্ণ আর যুক্তিগ্রাহ্য হয়।’’  ‘মা সারদা’র ‘প্রেস কনফারেন্স’ তো দক্ষিণেশ্বরেই হয়েছিল। সাধারণ এক জন মহিলা কী ভাবে জগতের কাছে অসাধারণ হয়ে উঠলেন, সেটি ঠিকঠাক ভাবে   অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

এখন দেখার সেটা কতটা ছোটপর্দায় দেখা যায়।