এই ছবিতে হিপতাল্লা আছে। মান্টো (নওয়াজ়উদ্দিন), শ্যাম চড্ডা (তাহির রাজ ভাসিন) মদ খেতে খেতে ‘চিয়ার্স’ করার ভঙ্গিতে হিপতাল্লা বলছেন। 

আর একটা দৃশ্যে চোখে জল এসে যায়। একটু বাদে করাচির জাহাজ ছাড়বে। ওই জাহাজেই চিরতরে পাকিস্তান চলে যাবেন মান্টো। দুই বন্ধু শেষ বারের মতো গলায় ব্র্যান্ডি ঢালে, ‘হিপতাল্লা’। শ্যাম বলেন, ‘সোয়াইন’! মান্টো হাসেন, ‘পাকিস্তানি সোয়াইন’। জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে হিন্দু শ্যাম বলেন, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। আর পাকিস্তানগামী মান্টো জানান, ‘ভারত জিন্দাবাদ’। জাতীয়তাবাদের বাজারে এই ছবি তাই জরুরি ছিল।

বছর তিনেক আগে পাকিস্তানের পরিচালক সারমাদ খুসত মান্টোর জীবন নিয়ে একটি ছবি করেছিলেন। সেখানে পাকিস্তানে মান্টোর নিঃসঙ্গতা ও মদ্যপানই বড় করে দেখানো হয়েছিল। চল্লিশের মুম্বই, ইসমত চুগতাই, অশোককুমার, মান্টোদের হিপতাল্লা ছিল না।

হিপতাল্লা শব্দটা আছে মান্টোর লেখাতেই। তখন সিনেমার গল্প লেখেন। এক দিন কাগজে ক্রিকেটের খবর পড়ছিলেন। ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে স্থানীয় এক ম্যাচের বিবরণ। সেখানে এক ক্রিকেটারের নাম হিপতাল্লা।

এই নামের মানে? খবরের কাগজ ভুল করে হবিবুল্লা নামের কাউকে হিপতাল্লা বলে ছেপেছে? স্টুডিয়োতে সে দিন থেকেই শুরু হয়েছে নতুন রসিকতা। কামাল আমরোহী চিত্রনাট্যের সিকোয়েন্স লিখে এনেছেন। নায়ক অশোককুমার জিজ্ঞেস করলেন, ‘মান্টো, ঠিক আছে?’ মান্টো উত্তর দিলেন, ‘না, কোথায় যেন হিপতাল্লা নেই।’ মানে না জেনেও সবাই বুঝে গেল, কী বলা হচ্ছে। হিপতাল্লাই এই ছবির প্রধান শক্তি। এবং প্রধান দুর্বলতা। ভাল ভাবে মান্টো পড়া না থাকলে দর্শকের কাছে অনেক মজাই হারিয়ে যাবে।

যেমন, ছবির শুরুতে দেখা যায়, একটি বাচ্চা মেয়ে। তার বাবা টাকা গুনে নিচ্ছে, কয়েকটি ছেলে গাড়িতে তুলে তাকে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার পরেই মান্টো ও তাঁর স্ত্রী। অতঃপর হঠাৎ খাপছাড়া আর এক কোলাজ। ঈশ্বর সিংহ দাঙ্গা করতে গিয়ে এক মুসলিম মহিলার গয়নাগাটি তার প্রেমিকা কুলবন্তকে এনে দিয়েছিল। কিন্তু কুলবন্তের সঙ্গে সে আর খেলায় মাততে পারে না। দাঙ্গার রাতে মৃত এক মেয়েকে ধর্ষণ করেছিল যে ঈশ্বর! মান্টোর বিখ্যাত গল্প ‘ঠান্ডি গোস্ত’। এসেছে ‘টোবা টেক সিংহ’ও! স্বাধীনতার পরে ঠিক হল, গারদে বন্দি উন্মাদদেরও বিনিময় করবে দুই দেশ। কোন পাগল ভারতে যেতে চায় আর কে পাকিস্তানে। এক পাগল কোত্থাও যেতে চায় না, তার গন্তব্য ‘টোবা টেক সিংহ’। কেউ জানে না, অখ্যাত সেই গ্রাম ভারতে না পাকিস্তানে! লেখকের জীবনের সঙ্গে তাঁর লেখা গল্প এ ভাবে মিশিয়ে দেওয়ায় সাধারণ দর্শকের কাছে ধাক্কা লাগতে পারে। কিন্তু মান্টো-পড়া দর্শকের ভাল লাগবে।

গল্পগুলি পড়া থাক বা না-থাক, এই ছবি দেখতে গেলে হৃদয় দিয়ে উর্দু ভাষার অন্যতম সেরা গল্পকারকে বুঝতে হবে, যাঁর বিরুদ্ধে ছয় বার অশ্লীলতার মামলা হয়েছিল, পাকিস্তানে চলে গিয়েও যিনি দেশভাগ মেনে নিতে পারেননি, মদ্যপানে নিজেকে শেষ করে দিয়েছেন। পরিচালক এই অভিমানী, আত্মঘাতী যাত্রা ধরতে চেয়েছিলেন। তাই ছবি শুরু হয় চল্লিশের মুম্বইয়ে। শেষে মান্টোর মৃত্যুও দেখানো হয়নি। সাহিত্যে যিনি আজও অমর, তাঁর মৃত্যু দেখানো যায় নাকি? গল্পের সঙ্গে জীবন মিশিয়ে দেওয়ার এই মস্তানি দরকার ছিল।

আর এই ছকভাঙা, বেপরোয়া খেলায় পরিচালকের তুরুপের তাস নওয়াজ়উদ্দিন সিদ্দিকি। চশমার আড়ালে গভীর চোখ, আশাভঙ্গের বেদনা সব মিলিয়েই তিনি অসাধারণ! মান্টোর স্ত্রী সাফিয়ার চরিত্রে রসিকা দুগ্গলও যথাযথ। ছোট্ট দু’টি চরিত্রে ঋষি কপূর ও পরেশ রাওয়াল নজর কাড়েন। রীতা ঘোষের প্রোডাকশন ডিজ়াইনিং এক জায়গায় নজর কাড়ে। মুম্বইয়ের পাট শেষ করে মান্টো তখন লাহৌরে। বিবর্ণ সেট, ভোরবেলা রাস্তায় বেরিয়ে মান্টো খবর পান, নয়াদিল্লিতে গাঁধী নিহত... 

সমালোচনায় ইচ্ছে করেই নম্বর দেওয়া হল না। মান্টো তো প্রথা ভাঙতেই চেয়েছিলেন। দাঙ্গা নিয়ে তাঁর অজস্র গল্পে কখনওই নিহত বা আততায়ীদের নামধাম বলা জরুরি ভাবেননি। পাঠককে বুঝে নিতে হবে। ‘পরিচ্ছন্নতা’ নামের একটি ছোট্ট স্কেচ যেমন! দাঙ্গাবাজরা ট্রেনে উঠে জানতে চায়, বিধর্মী কে আছে? সবাই চুপ। উশখুশ করে এক যাত্রী বলে ফেলে, ‘বাথরুমে দ্যাখো।’ বিধর্মীকে সেখান থেকে টেনে বার করে এনে গলায় ছুরি ধরা হয়। এক দাঙ্গাবাজ বলে,‘আরে, এই পরিষ্কার কামরা নষ্ট করিস না। ওকে প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে কোতল কর।’

এই প্রতিবাদী জীবনকে পর্দায় নিয়ে আসার জন্যই নম্বরহীন হিপতাল্লা!