নিজেকে ‘আনসোশ্যাল’ বলেন। কিন্তু সাংবাদিক জীবনের স্বল্প অভিজ্ঞতা বলে, শাহরুখ খান এমন এক সেলেব্রিটি যাঁকে যেমন খুশি প্রশ্ন করা যায়। কথাটা বলতেই, ৫২ বছরেও গালে টোল ফেলা সেই দুর্ধর্ষ হাসিটা দিয়ে বললেন, ‘‘নিশ্চয়ই জটিল প্রশ্ন ভেবে এসেছেন।’’ হয়তো ব্যক্তি জীবনে তিনি আনসোশ্যাল। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের তাঁর নাম ধরে চিৎকার করাটা উপভোগ করেন। বলেন, ‘‘আমি এই জীবনটাই বাঁচতে চাই।’’ তাঁর শেষ কয়েকটা ছবি ভাল চলেনি। তাঁর জন্য হয়তো তিনি চাপে। কিন্তু মধ্য কলকাতার অভিজাত হোটেলে সিক্স পকেট প্যান্ট, সাদা টি শার্টের উপর অলিভ রঙের জ্যাকেট পরা সুপারস্টারের মধ্যে সেটা লুকোনোর কোনও প্রচেষ্টা দেখা গেল না।

 

প্র: আপনার ছবি গোটা দেশে যেমন ব্যবসাই করুক, কলকাতায় ভাল ফল করবেই। সেই টানেই কি বারবার এই শহরে আসেন?

উ: শুধু ব্যবসার কথা বললে ভুল হবে। তবে হ্যাঁ, কলকাতার দর্শক আমাকে কখনও নিরাশ করেন না। আপনাদের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তো বছর বছর আসি। মমতাদির কথায় এ বারেও চলে এলাম। কলকাতা ভাল লাগার কারণ ঠিক ব্যাখ্যা করে বলতে পারব না। এই গল্পটা আগে বলিনি হয়তো, এখানে থিয়েটার রোড না কী যেন নাম... শেক্সপিয়র সরণি... সেখানে আমি পারফর্ম করে গিয়েছি। তখন থিয়েটার করতাম। ট্রেনে করে সকলে মিলে এসেছিলাম। আর একটা গল্প বলি, মাস্টার্স ডিগ্রি  করার সময়ে আমি ‘কলকাতা, সিটি অব জয়’ নিয়ে প্রজেক্ট করেছিলাম। মায়ের থেকে টাকা নিয়ে পেনট্যাক্স ক্যামেরা কিনেছিলাম একটা। সেটা নিয়ে গোটা শহর ঘুরে ঘুরে ছবি তুলেছিলাম।

 

প্র: কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আফসোস করছিলেন, আপনার ছবি কোনও ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখানো হয় না বলে...

উ: আরে, ওটা তো মজা করছিলাম! এত দিনে তো আমার সেন্স অব হিউমারের সঙ্গে আপনারা পরিচিত হয়ে গিয়েছেন। আমার  অ্যারোগ্যান্ট সত্তাটা যেমন মনে করে, আমার সব ছবির সব অ্যাওয়ার্ড পাওয়া উচিত (হাসি)! দেখুন, মাল্টিপ্লেক্স, সিঙ্গলস্ক্রিন, টেলিভিশন, মোবাইল সব মাধ্যমেই ছবি দেখা যায়। কিন্তু এক একটা ছবি এক একটা মাধ্যমের জন্য। তেমনই ফেস্টিভ্যালের জন্যও কিছু নির্দিষ্ট ছবি আছে। হার্ডকোর কমার্শিয়াল ছবি যেখানে কাওয়ালি থেকে ক্লাব সং— সবই আছে, সেটা ফেস্টিভ্যালের আওতায় পড়ে না।

 

প্র: ছবির নাম ‘জ়িরো’ রাখার পিছনে কোনও উদ্দেশ্য ছিল?

উ: এখানে ‘জ়িরো’ মানে পরিপূর্ণতা বোঝাচ্ছে। একটা বৃত্ত। জীবনও তো একটা বৃত্তের মতো। আপনি চণ্ডীগড়ে গিয়েছেন কি না জানি না। শহরটা খুব অদ্ভুত ভাবে তৈরি। হাসপাতাল আর শ্মশান একদম পাশাপাশি। জন্ম আর মৃত্যুর সহাবস্থান যাকে বলে। জন্ম, জীবন এবং শেষ— একটা বৃত্তপূরণের মতো।

আরও পড়ুন: পুজো শেষ হলেও ফিল্ম রিলিজ় নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে চাপানউতোর শেষ নয়!

 

প্র: আপনার আগের কয়েকটা ছবি চলেনি। এই রিলিজ়ের আগে কি নার্ভাস লাগছে?

উ: আমি সত্তরটা ছবি করেছি যার অনেক ক’টা চলেনি। এগুলো তো হবেই। আমি নার্ভাসও হই। আর সেটা কাটাতে আরও বেশি করে কাজ করতে থাকি। নতুন ছবির কাজে মন দিই। এখানে যেমন আনন্দকে (পাশে বসা পরিচালক আনন্দ এল রাইয়ের দিকে তাকিয়ে) ধরে নিয়ে এসেছি। ওকে একদম কাছছাড়া করছি না। এটা নার্ভাসনেস থেকেই করছি।

আরও পড়ুন: চলন প্রেডিক্টেবল, তবে বিনোদন রয়েছে

প্র: নতুন পরিচালকদের সঙ্গে এক্সপেরিমেন্ট করছেন। কিন্তু সেটা কি যথেষ্ট মনে হচ্ছে?

উ: আমি নিজের মতো করে চেষ্টা করছি। আপনারা আমাকে বলুন, কী এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে? আমি করে নেব। আমার কাছে যেমন চিত্রনাট্য আসে, আমি তেমনই ছবি করি। যতটা এক্সপেরিমেন্ট করা যায়, করছি। এমন তো হয় না, নিজেই একটা গল্প ঠিক করে নিয়ে বললাম, এটা নিয়ে ছবি করো।

(পাশ থেকে আনন্দ এল রাই বলে উঠলেন, আমরাই বোধহয় শাহরুখকে ঠিক মতো ব্যবহার করতে পারছি না। উনি কিন্তু বিষয় খুঁজে চলেছেন। ব্যর্থতাটা আমারদেরই।)

এই ক’দিনে আনন্দ আমার বন্ধু বা বলতে পারেন ভাইয়ের মতো হয়ে গিয়েছে। কিছু দিন আগে পর্যন্ত আনন্দের কোনও ছবি আমি দেখিওনি। কিন্তু ওর কথা শুনেছিলাম। ওর ছবিগুলোর প্রতিক্রিয়া আমার কাছে ছিল। ইনফ্যাক্ট আমার ফোনে আনন্দের মোবাইল নম্বর এখনও ‘আনন্দ তনু ওয়েডস মনু ডিরেক্টর’ নামেই সেভ করা আছে। তখন থেকেই ওর সঙ্গে কাজ করতে চাইছিলাম। নতুন কিছু করার চেষ্টা তো করতেই হবে। আমাদের মা-বাবা একটা কথা বলতেন, প্রতিটা দিন নতুন। শুনতে খুব ক্লিশে ঠিকই, কিন্তু এটাই সত্যি। জীবনে এমন কোনও দিন নেই যে দিন সমস্যা হয়নি। আবার একটা নতুন দিন আসবে, নতুন সমস্যাও আসবে (হাসি)! সল্‌ভ করতে পারলে ভাল, নয়তো ওটা নিয়ে মন খারাপ করি না। আরে, দিনে একটা ভাল জিনিস তো নিশ্চয়ই ঘটে। সেই কথা মনে করে ভাল থাকার চেষ্টা করি। এটা আমি গৌরীর থেকে শিখেছি। আমি ভাগ্যবান যে, বাড়িতে বাচ্চারা রয়েছে। কোনও দিন রাতে বাড়িতে স্ট্রেসড হয়ে ফিরলে গৌরী বলে, ‘যা হয়েছে বাদ দাও, আব্রামকে দেখো, এ বার শান্তিতে শুতে যাও’। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে দিনের সবচেয়ে ভাল মুহূর্তটা নিয়ে ভাবি। ব্যস, তা হলেই শান্তি।