ঠিক চার মাস ছ’দিন। গত ২৪ জানুয়ারি শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের কর্ণধার শ্রীকান্ত মোহতাকে গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর গ্রেফতারি পরিকল্পিত কি না, সে প্রশ্ন তখনই ছিল। গত কয়েক দিনে রাজ্য রাজনীতিতে যে বিরাট পালাবদল ঘটেছে, তা আরও অনেক প্রশ্ন উস্কে দিচ্ছে। ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের সাম্প্রতিক অবস্থা খুব আশাব্যঞ্জক নয় বলেই ইন্ডাস্ট্রি সূত্রে খবর। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসভিএফ আগের মতোই টলিউডে তাদের দাপট বজায় রাখতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও জোরালো হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ক্ষুদ্র বাজারে এসভিএফ-এরই সবচেয়ে বেশি ছবি রিলিজ় করে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, জানুয়ারির পর থেকে সংস্থা ছবি তৈরি ও রিলিজ় দুটোই কমিয়ে দিয়েছে। পরপর বেশ ক’টি ছবি আটকে গিয়েছে। অঞ্জন দত্তর ‘অপারেশন রাইটার্স’, অরিন্দম শীলের ‘খেলা যখন’ ঘোষণা হওয়ার পরেও ফ্লোরে যায়নি। যদিও সংস্থার বক্তব্য, অঞ্জনের ছবিতে চিত্রনাট্য নিয়ে জটিলতা তৈরির কারণে তা আটকেছে। বাণিজ্যিক ছবি ‘কে তুমি নন্দিনী’র বাজেট কাটছাঁট করা হয়েছিল বলেও শোনা যায়। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের কাকাবাবুর শুটিং বন্ধ হয়েছে। 

শ্রীকান্তের অনুপস্থিতি কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল সংস্থার আর এক কর্তা মহেন্দ্র সোনির কাছে। তাঁর জবাব, ‘‘শ্রীকান্ত ক্রিয়েটিভ কলগুলো নিত। ও না থাকায় প্রভাব তো পড়বেই। কিন্তু তার মানে সংস্থার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গিয়েছে, এমন নয়। আগামী সাত-আটটা ছবির পরিকল্পনা রয়েছে। ‘গুমনামী’র শুটিং শুরু হয়েছে।’’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাকাবাবু বাতিল হয়নি। কেনিয়ায় শুটিংয়ে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ফলে পুজোয় রিলিজ় করা সম্ভব হতো না বলেই ‘গুমনামী’ নিয়ে এগিয়েছেন তাঁরা।

কম ছবি করা ও বাজেট কমানো নিয়েও সংস্থার তরফে কিছু বক্তব্য রয়েছে। বাণিজ্যিক ছবি ভাল চলছে না বলেই তারা ওই ঘরানায় কম বিনিয়োগ করছে। ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়, বিরসা দাশগুপ্তর পরের ছবি নিয়ে কথা চলছে। মহেন্দ্রর কথায়, ‘‘আরও বড় পরিসরে বলিউডে কাজ করার দিকে এগোচ্ছি আমরা।’’

ছোট পর্দায় বকেয়া টাকা আদায় নিয়ে সম্প্রতি আর্টিস্ট ফোরাম একটি বৈঠক করে। সেখানে জানানো হয়, ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে এসভিএফ-এর কোনও পেমেন্ট বাকি থাকার উদাহরণ নেই। যদিও ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে সংস্থার আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে অনেক কথাই শোনা যাচ্ছে। প্রোফেসর শঙ্কুর পেমেন্ট আটকে রয়েছে বলেও খবর। প্রতিটি অভিযোগই অবশ্য উড়িয়ে দিলেন মহেন্দ্র। ‘‘ব্রাজ়িলে শঙ্কুর  শুটিং করেছি। টাকা না দিয়ে ওখান থেকে বেরোতে পারতাম? পেমেন্ট বাকি আছে... কেউ এটা প্রমাণ করতে পারলে তাকে ডাবল পেমেন্ট দেব,’’ জোরালো গলায় দাবি তাঁর।

দু’বছর আগে শুরু হওয়া অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হইচই-এর ভবিষ্যৎ নিয়েও কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও পরপর নতুন প্রজেক্ট লঞ্চ হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও লঞ্চ হয়েছে হইচই। এর মাঝেই হাতবদলের গল্পও শোনা যাচ্ছে। কনটেন্ট এসভিএফ দেবে কিন্তু মালিকানা বদলাবে। ‘‘বছর খানেক ধরেই আমরা হইচই-এর জন্য ইনভেস্টর খুঁজছি। তার মানে সংস্থা বিক্রি করে দেওয়া নয়। জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় হচ্ছে হইচই। এটা নিয়ে আমাদের আরও পরিকল্পনা রয়েছে,’’ বললেন মহেন্দ্র। সিবিআই সম্প্রতি শ্রীকান্ত মোহতা ও এসভিএফ-এর নামে চার্জশিট পেশ করেছে আদালতে। ফলে সংস্থার উপরে প্রত্যক্ষ ভাবে চাপ পড়ছেই। রাজ্যের রাজনীতি যে ভাবে রং বদলাচ্ছে, তার প্রভাব পড়াও অস্বাভাবিক নয়। অনেকে আঁচ করছেন, আর্থিক ভাবেও সংস্থা ধাক্কা খেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংস্থা রং বদলাতে পারে বলেও গুঞ্জন।

এ দিকে এসভিএফ-এর সঙ্গে এত দিন যাঁরা নিয়মিত কাজ করেছেন, এমন কিছু পরিচালক এখন অন্যত্র ছবি করছেন। তাঁদের যুক্তি, সংস্থা যেহেতু ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়েছে, তাই তাঁরা অন্য প্রযোজনায় কাজ করছেন। এসভিএফ-ও তাঁদের বিরুদ্ধে সামনাসামনি অন্তত বিরূপ মত পোষণ করছে না। পুজোয় রিলিজ় টলিউডে একটা বড় বিষয়। প্রতিযোগী প্রযোজকেরা তাঁদের তুরুপের তাস প্রদর্শন করে দিয়েছেন। যে সংস্থা থেকে পুজোয় তিনটি ছবি থাকে, সেই এসভিএফ-ই এখনও সিদ্ধান্ত জানায়নি। এই ঘটনা পরম্পরাগুলোই কি সংস্থার অবস্থা স্পষ্ট করছে না? ‘‘একটা কথাই বলতে পারি, বাংলা ছবির ইতিহাস লিখলে সেখানে আমাদের নাম লিখতেই হবে। অস্বীকার করতে পারবেন না। কুড়ি বছর ধরে আমরাই আছি। আগামী কুড়ি বছর আমরাই থাকব,’’ স্পষ্ট বার্তা মহেন্দ্র সোনির।

এসভিএফ যে টলিউডের অন্যতম বড় প্রযোজনা সংস্থা, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। সিনেমা, ধারাবাহিক, অনলাইন স্ট্রিমিং, ডিস্ট্রিবিউশন... বাইশ বছর ধরে যে সাম্রাজ্যের বিস্তার, তাতে হয়তো এক দিনে ফাটল ধরবে না। কিন্তু যে তরঙ্গ উঠেছে, তার কিছু প্রভাব তো পড়বেই...