মাটি

পরিচালনা: লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়

অভিনয়: পাওলি, আদিল, সাবিত্রী

৫.৫/১০

 

দেশ বদলায়। বদলায় না ঘর। হিড়হিড় করে টান দেয় ফেলে আসা মাটি, গল্প আর কল্পনার ডালপালার ফাঁকে জেগে থাকা, কখনও চোখে না-দেখা ‘নিজের’ বাড়ি। ডাক পাঠায় ‘পাশের বাড়ির’ বন্ধুও। চিনি কি তাকে?

শিকড়ের খোঁজে বেরোতেই হয় তখন। সঙ্গী হয় কিছু কাগজ। কয়েক দশক প্রাচীন গোটা গোটা অক্ষরগুলো নিয়ে যায় পথ দেখিয়ে।

যেমন ফিরেছিল মেঘলা (পাওলি)। ঝুলিতে ‘ঠাম্মি’ কুমুদিনী দেবীর ডায়েরি নিয়ে। বাংলাদেশের কুতুবদিয়ার মেয়ে জিনিয়া (মনামী) ডায়েরিটা দিয়েছিল মেঘলাকে। দাঙ্গার মুখে স্বামী-সন্তানকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়ে কুমুদিনী (অপরাজিতা) পড়ে ছিল কুতুবদিয়ার চৌধুরীবাড়ি আগলে। সেই শেষ দেখা। জিনিয়ার বিয়েতে বাংলাদেশে গিয়েই বাড়িটা দেখতে চায় মেঘলা। জানতে পারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহিদ মিনার দেখাতে দেখাতে তাকে জিনিয়াদের বাড়ি নিয়ে আসা সপ্রতিভ, অমায়িক জামিলই (আদিল) চৌধুরীবাড়ির বর্তমান ‘দখলদার’।

দলা পাকিয়ে ওঠে দুঃখ, রাগ, কষ্ট, ঘেন্না। হাত ধরে বিস্ময়, ভাললাগাও। এগিয়ে দেয় পরতে পরতে আবিষ্কারের পথে। নিজের শিকড় চেনা, চেনা মানুষকে নতুন করে চেনা কিংবা ফেলে আসা সময়ের হাতে-লেখা দলিল নিয়ে বাংলা ছবি গল্প বুনছে বহু দিন ধরেই। তবু বলতে হয়, লীনা গঙ্গোপাধ্যায় এবং শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালক জুটির প্রথম ছবি ‌‘মাটি’র নিজস্ব গন্ধ আছে। আপনার শিকড় পূর্ববঙ্গে হোক বা না হোক, এ ছবি দেখলে হয়তো ঠকবেন না।

অসংখ্য জনপ্রিয় ধারাবাহিকের চিত্রনাট্যকার লীনা বড় পর্দার গল্পও আগে লিখেছেন। নিজের ছবির গল্পে তিনি অযথা জটিলতা আমদানি করেননি। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, পূর্বপুরুষ নিয়ে ভাবনার খোরাকও রয়েছে তাতে। ‌‘মাটি’ এগিয়েছে মোটামুটি মসৃণ গতি আর ছিমছাম অভিনয়ে ভর করে। মেঘলার ঠাকুর্দার চরিত্রে চন্দন সেনকে প্রথম দেখেই মনে হয়, সত্যিই আশি-ছুঁইছুঁই এক বৃদ্ধ তিনি। আর ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে খেলা ধরে নেন আদিল হুসেন। ‌পাওলি তো ভালই। এ ছবির মেরুদণ্ড তিনিই। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে নতুন করে কী-ই বা বলার! কষ্ট হয় অপরাজিতার জন্য। তাঁর মতো জোরালো অভিনেত্রীর সিংহভাগ সংলাপই কেটে গেল নেপথ্যভাষণ আর ফ্ল্যাশব্যাকের ক্যামেরার সামনে নীরব উপস্থিতিতে।

ভাল হতো যদি বাংলা ধারাবাহিকের ছায়াটা পুরোপুরি এড়াতে পারত ‘মাটি’। সিনেমায় বিয়ে আর গায়ে-হলুদ মানেই কি নাচগান? জামিলের প্রভাতফেরির গানটা শুনতে ভাল হলেও দৃশ্যটাকে কৃত্রিম মনে হয়। আর গানের প্রয়োগ যথাযথ না হলে দেবজ্যোতি মিশ্রের সুরেও মন ভরে না। তা ছাড়া, বিশেষ সম্প্রদায়কে বোঝাতে ‘ট্রেডমার্ক’ পোশাক আর কত দিন? চৌধুরী পরিবারকে দুম করে শত্রু ভাবতে শুরু করে দিল গ্রামের মানুষ। তাদের হৃদয় পরিবর্তনের কোনও ইঙ্গিতই দেয় না চিত্রনাট্য। মেঘলার সামনেই অশান্তি বাধল ভিন্ ধর্মে বিয়ে ঘিরে। কোন জাদুমন্ত্রে জামিল দশ মিনিটে তা মিটিয়ে দিল, কে জানে!

ছোটখাটো হোঁচটগুলো সত্ত্বেও আশা রইল। রইল বাংলার মাটি। যার টানেই ফিরে আসা বারবার।