কে বলে ইন্ডাস্ট্রির লোকজন একে-অপরের বন্ধু হতে পারে না! শত্রুর মুখে ছাই ফেলে অনেক ভাই-বোনকে খুঁজে পাওয়া গেল, যাঁরা আপনজনের চেয়েও অনেক বেশি। পাতানো অনেক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যার কাছে অনেক সময়েই রক্তের সম্পর্কও হেরে গিয়েছে। ভাইফোঁটা উপলক্ষে এমন কয়েক জন ভাইবোনের অন্দরে পাড়ি জমালে কেমন হয়!  

কখনও শুনেছেন বা দেখেছেন কি, চলন্ত গাড়ি থামিয়ে ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান চলছে! উলু দিয়ে, প্রদীপ জ্বেলে, ধান-দূর্বা সাজিয়ে... না, কোনও ছবি বা ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য নয়, এমনটাই করেছেন মানালি দে ও শুভ্রজিৎ দত্ত। যখন থেকে একে-অপরের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন, তখন থেকেই মানালির কাছে শুভ্রজিৎ ‘দাদাই’। যতই শুটিংয়ের চাপ থাকুক, কোনও বছরই ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান মিস করেননি তাঁরা। এ বছর সিকিমে থাকলেও সফরের মাঝপথ থেকে শুভ্রজিৎ ফিরছেন মানালির জন্যই। অবশ্য মানালির বারুইপুর রাজবাড়িতে ধারাবাহিকের শুটিং থাকায় এ বছরও গাড়িতেই ভাইফোঁটা সারবেন বলে ঠিক করেছেন নায়িকা। না হলে শুভ্রজিতের বাগবাজারের বাড়িতেই জমাটি অনুষ্ঠান হয়। মানালি ছোট হয়েও শুভ্রজিৎকে ‘সাহস’ জোগান আর ‘দাদাই’-এর সব বিষয়ে অতিরিক্ত প্রচেষ্টাই টানে মানালিকে।

‘দিদি-ভাই’য়ের সম্পর্ক যে সব সময়ে সামাজিক প্রথার গণ্ডিতে আটকে থাকে, এমন মনে করেন না দেবলীনা দত্ত ও অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়। নায়িকার সঙ্গে পরিচালকের সম্পর্ক কখন কী করে ‘লাইট সাউন্ড অ্যাকশন’-এর ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, নিজেরা খোঁজেননি তার কারণ। ২০০০ সাল থেকে একসঙ্গে কাজ করছেন। সম্পর্কের বন্ধন পাকা হয়েছিল ‘কবে যে কোথায়’ ধারাবাহিকের তাইল্যান্ড আউটডোরে। দেবলীনার সঙ্গে তাঁর মা ও অগ্নিদেবের গোটা পরিবার হাজির ছিলেন সেখানে। তবে কোনও বছর প্রদীপ জ্বালিয়ে, কপালে চন্দনের ফোঁটা বা পাঁচ রকম মিষ্টি সহযোগে প্রথাগত ভাইফোঁটা পালন করার তাগিদ অনুভব করেননি কখনওই। কিন্তু বাঙালির যে কোনও পার্বণ মানেই অঢেল খাওয়াদাওয়া! আর বাড়ির গৃহিণী পাক্কা রাঁধুনি হলে তো কথাই নেই! অগ্নিদেবের পরিবার থেকে কখন নিমন্ত্রণের বার্তা আসবে, অপেক্ষায় থাকেন দেবলীনা। এমনই এক ভোজ নিয়ে মজার ঘটনার কথা বললেন, ‘‘অনেক বার নানা ধরনের খাবার খেয়েছি ওদের বাড়িতে। কিন্তু এক বার ম্যাকারুনস দিয়ে কেক তৈরি করেছিল সুদীপা। ওটা এতটাই সুস্বাদু ছিল যে, আজও ভুলতে পারিনি। তাই পরিমাণ মতো ম্যাকারুনস টেবিলে সাজানোর পরে নজর করেছিলাম বাকিটা ফ্রিজে রাখা ছিল। আর আমি যত বার পেরেছিলাম, ফ্রিজ খুলে ওই ম্যাকারুনস তুলে চটপট মুখে পুরে নিয়েছিলাম। ওরা খেয়ালই করেনি কতটা পরিমাণ ম্যাকারুনস আমি সাবাড় করেছিলাম সে দিন। আজ হয়তো জানতে পারবে!’’ 

নিজের দিদির চেয়েও অপরাজিতা আঢ্য কখন যে আরও বেশি হয়ে উঠেছেন, তা জানেন না সোহম চক্রবর্তী। তাঁর দিদির প্রিয় বন্ধু অপরাজিতা। সেই সূত্রেই পারিবারিক আলাপ-পরিচয়। তারপর থেকে দুই দিদির মধ্যে কখনও কোনও ফারাক রাখেননি সোহম। আর অপরাজিতার কাছেও সোহম নিজের ভাইটি। ব্যস্ততার পরিসরে ভাইফোঁটার প্রথাগত অনুষ্ঠান পালন হয়নি কোনও বছরই। কিন্তু খাওয়াদাওয়া থেকে আড্ডা সব কিছুই সময়-সুযোগ মতো চলে দেদার। অপাদির মিষ্টি ব্যবহার আর বাড়ির সকলকে জমিয়ে রাখার ক্ষমতা সোহমকে টেনেছিল। আর অপরাজিতা দেখেছেন, ‘বিট্টু’ থেকে ‘সোহম’ হওয়ার লড়াই। সব সম্পর্কের সমীকরণ সব নিয়ম মেনে চলে না। এই দিদি-ভাইটি কাছে না থেকেও অনেক বেশি আপন মনে করেন একে অপরকে।

ভাস্বর-নবমিতার বিয়ের ঘটক ছিলেন ঋতা দত্ত চক্রবর্তী। দুই পরিবারের একমাত্র যোগসূত্র। নবমিতার সঙ্গে ভাস্বরের পূর্বপরিচয় থাকলেও ‘দিদি’ ঋতার কথাতেই ভাস্বর ভাবেন নবমিতাকে নিয়ে। পর্দার জগৎ থেকে সরে এমন অনেক সাহায্য-ভালবাসার আদান-প্রদান হয় দু’তরফেই। ভাই ভাস্বর আদতে দিদির গাইড। অনেক ভুল ধারণা এই পাতানো ভাইয়ের জন্যই তিনি ভাঙতে পেরেছেন বলে অকপটে স্বীকার করলেন। ঋতার কথায়, ‘‘দু’জনে মন খুলে কথা বলি আর অপরের কথা মন দিয়ে শুনি। কোনও ভণিতা নেই, আগ বাড়িয়ে সম্পর্ক দেখানোর কসরত নেই।’’ দিদি-ভাইয়ের সম্পর্কের রসায়নের সূত্রপাত ‘আলো’ ছবির সেটে। তারপর ‘মা’ ধারাবাহিকের বেনারস আউটডোরে গিয়ে জোর করে দিদির ভাইকে বিশ্বনাথের দর্শন করানো, এখনও মনে গেঁথে রয়েছে। আর ‘আমলকি’র মেকআপ রুমে শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা যেন রক্তের সম্পর্ককেও ছাড়িয়ে যায়! 

 ইন্ডাস্ট্রিতে দু’টি মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সম্পর্ক তৈরি হয়ই। কিন্তু ছবি বা ধারাবাহিক শেষ হলে সম্পর্কও সময়ের চোরাস্রোতেই হারিয়ে যায়। কিন্তু তার মধ্যেই এমন কয়েকটি সম্পর্ক বেঁচে থাকে, যার কথা আমরা শুনলাম। হয়তো আরও অনেকেই আছেন এমন সম্পর্কের বাঁধনে। আর এই সব সম্পর্কই হতে পারে যে-কোনও সৃজনশীল মানুষের জিয়নকাঠি!