হাত ধরে তাঁকে অভিনয় শিখিয়েছিলেন নাট্যাচার্য গিরিশ চন্দ্র ঘোষ।

১৮৮৪তে ‘চৈতন্য লীলা’য় তাঁর অভিনয় দেখে অভিভূত হয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ।

এবং তাঁর নিজের লেখা, ‘আমার কথা’ এবং ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’ পড়ে বুঝতে অসুবিধা হয় না, সেই সময়ের কলকাতার যাত্রাপাড়ায় তিনি ছিলেন অলিখিত সুপারস্টার।

এতটাই বর্ণময় এবং সিনেম্যাটিক তাঁর জীবন যে, আগেও তাঁকে নিয়ে বাংলা ছবি, সিরিয়াল তৈরি হয়েছে। ১৯৯৪ সালে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও দেবশ্রী রায়কে নিয়ে পরিচালক দীনেন গুপ্ত ‘নটী বিনোদিনী’ বানিয়েও ছিলেন। তাঁর জীবন নিয়ে হয়েছে নানা নাটক, ডকুমেন্টারি। লেখা হয়েছে প্রচুর বই ও প্রবন্ধ।

সেই বিনোদিনী দাসী বা নটী বিনোদিনী এ বার সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবির বিষয়।

ছবির নামও ইতিমধ্যে ঠিক করে ফেলেছেন পরিচালক।

‘সুতানটী’।

এখনও অবধি যা খবর, জুন মাসে প্রসেনজিৎকে নিয়ে কাকাবাবু, তারপর অক্টোবরে আরও একটি ছবি শেষ করে পরের বছর গোড়ার দিকে শুরু হবে ‘সুতানটী’।

এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ইন্ডাস্ট্রিতে একটাই প্রশ্ন, সৃজিতের ছবিতে নটীর চরিত্রে কে অভিনয় করবেন?

‘‘নটী বিনোদিনীর জন্ম ১৮৬২তে এবং মৃত্যু ১৯৪১ সালে। পুরো সময়টাই ধরার প্ল্যান রয়েছে আমার। এবং একই ছবিতে হয়তো চারজন অভিনেত্রীকে দেখা যাবে নটীর চরিত্রে,’’ শনিবার সন্ধেবেলা বলছিলেন সৃজিত।

এখন অবধি কি ঠিক করেছেন কোন চারজন অভিনেত্রী অভিনয় করবেন এই ছবিতে ?

‘‘একটা বেসিক হোমওয়ার্ক তো করেই ফেলেছি। একটু আধটু কথা বলাও শুরু হয়েছে। যে চারজনকে কাস্ট করার ইচ্ছা আছে তাঁরা হলেন রানি মুখোপাধ্যায়, কঙ্কনা সেন শর্মা, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও পাওলি,’’ বলছেন পরিচালক। রানি যদি শেষ পর্যন্ত না করেন, বিকল্প বলিউডের আর এক শীর্ষস্থানীয় নায়িকা। তিনি কি সুস্মিতা? সৃজিত বললেন, ‘‘না। আরও সাম্প্রতিক কেউ।’’

কিন্তু হঠাৎ করে নটী বিনোদিনী করার প্ল্যান কোথা থেকে এল?

‘‘আমি ‘অটোগ্রাফ’ লেখার আগেই একটা স্ক্রিপ্ট লিখেছিলাম। নাম ছিল ‘Naughty বিনোদিনী’। এটা ছিল এমন একটা গল্প যেখানে আজকের সময়ের এক স্ট্রিট থিয়েটার করা মেয়ের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় নটী বিনোদিনীর জীবনের। এই ফর্মটা আমি ‘জাতিস্মর’ ছবিতে ব্যবহার করেছি। তবে তখন ছবিটি বানাতে চাইনি কারণ ‘আবহমান’‌য়ে ‘ফিল্ম উইথইন আ ফিল্মে’ ঋতুপর্ণ ঘোষ কিন্তু ‘নটী বিনোদিনী’ই বানিয়েছিলেন। একই বিষয় হয়ে যাচ্ছে বলে আর এগোইনি। আর দেখুন, নটী বিনোদিনীর জীবনটা আমার কাছে ফ্যাসিনেটিং। এক দিকে গিরিশ ঘোষ, অন্য দিকে শ্রীরামকৃষ্ণ— পরতে পরতে ড্রামা। তবে আমার সব ছবির মতো এই ছবিতেও সমসাময়িক একটা দিক থাকবে। শুধু পিরিয়ড ছবি আমি বানাতে চাই না। তার জন্য তো ডকুমেন্টারি বা উইকিপিডিয়াই রয়েছে,’’ বলছেন সৃজিত।

প্রসঙ্গত, এ বছরের শেষের দিকে নটী বিনোদিনী করার কথা ছিল আরও একজন পরিচালকের। তিনি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। সৃজিত একই বিষয়ে ছবি করাতে কোনও ভুল বোঝাবুঝি হবে না?

‘‘একেবারেই না। আমি শুক্রবার ফোন করে কৌশিকদাকে বললাম আমি নটী বিনোদিনী করতে চাই। খুব আনন্দের সঙ্গেই কৌশিকদা আমাকে ছবিটা করতে বলল,’’ সাফ বলছেন সৃজিত।

ছবির প্রি-প্রোডাকশনের কাজও ইতিমধ্যেই পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। শ্যুটিং হবে কলকাতায়।

এ বিষয়ে কী বলছেন প্রযোজক রানা সরকার?

‘‘আমি আর সৃজিত এর আগে ‘জাতিস্মর’ আর ‘চতুষ্কোণ’ একসঙ্গে বানিয়েছি। ওর সঙ্গে বোঝাপড়াও চমৎকার। দু’জনেই এমন ছবি করতে চাই যার মধ্যে বাঙালির ইতিহাস আছে। বাঙালিয়ানা আছে। এই ছবিতেও সেই ধারারই পুনরাবৃত্তি হবে,’’ বলছেন রানা।

সব মিলিয়ে যা পরিস্থিতি, বিনোদিনী দাসীকে নিয়ে আবার তুমুল শোরগোল শুরু হতে যাচ্ছে টালিগঞ্জে। একই চরিত্রে চার অভিনেত্রী, এমন আগে কখনও দেখেনি টালিগঞ্জ।

যাঁর অভিনয় জীবন ছিল মাত্র বারো বছরের, মৃত্যুর চুয়াত্তর বছর পরেও তাঁকে নিয়ে এই পর্যায়ের কৌতূহল এটা অন্তত স্পষ্ট করে দেয়, নটী বিনোদিনী আজও ‘সুপারস্টার’।