কথায় বলে, বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না... মুখ না ফুটলেও এখন চলে। ঝড় তুলতে হবে কি-বোর্ডে। আর পোস্ট করতে হবে সোশ্যাল মিডিয়ায়, যাতে আপনার মতামত পৌঁছে যায় বৃহত্তর গোষ্ঠীর সামনে। এতে সমস্যা নেই। তবে মতের অমিল হলেই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম নিয়ে বা নাম না নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের বক্তব্য পোস্ট করেন অনেকে। আর পাঁচ জন সাধারণ মানুষের মতো সেলেবরাও যখন এই ট্রেন্ডে শামিল হন, তখন তা নিয়ে ভাবতে হয় বইকি! 

গত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়ায় জবাব ও পাল্টা জবাবের কাদা ছোড়াছুড়িতে অংশ নিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই। যে সেলেব্রিটি পোস্ট করছেন, তাঁর অনেক ফলোয়ার হয়তো ঘটনার আগা-মাথা জানেন না। শুধুমাত্র সেলেব্রিটির লিখিত বয়ানকে প্রামাণ্য ভেবে সাধারণ মানুষ নিজস্ব মতামত জানাতে থাকেন। এতে কি সেলেব তাঁর যুক্তিকে সত্যি বলে প্রমাণ করতে পারেন? সৃজিত মুখোপাধ্যায়কে জিজ্ঞেস করলে প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু যাঁরা সৃজিতকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলো করেন, তাঁরা জানেন তাঁর সিনেমা (আনন্দ প্লাসে প্রকাশিত বিরসা দাশগুপ্তর সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষিতে) বা ব্যক্তিজীবনকে (হ্যাশট্যাগ মিটুর অভিযোগ) ঘিরে বিরুদ্ধ মত পোষণ করলে, তিনি সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পোস্ট দেন। ‘‘আমি কারও নাম করে কিছু বলিনি। যদি কেউ কিছু বুঝে থাকেন, সেটা তাঁর বিশ্লেষণ। যে বিষয় নিয়ে আমি সরাসরি পোস্ট করি না, সে বিষয় নিয়ে কথা বলব না,’’ বললেন সৃজিত।

বাকি থাকা পারিশ্রমিক, চুক্তির জটিলতা ইত্যাদি বিষয়ে কবীর সুমন ও অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের ফেসবুক তরজায় হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনশট পর্যন্ত পোস্ট করা হয়েছিল। কারও বিরুদ্ধে রাগ-ক্ষোভ-অভিমান থাকতেই পারে। কিন্তু তা নিয়ে ফেসবুকে লম্বা-চওড়া পোস্ট দিলে আদৌ কি জুড়োয় মনের জ্বালা? কী প্রমাণ করার জন্য ফেসবুকে‌ এমন পোস্ট দেন সেলেবরা? উত্তর দিতে চাইলেন না কবীর সুমন।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

এই ট্রেন্ড নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জয়রঞ্জন রাম বললেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়া একটা সার্কাস! মার্ক জ়াকারবার্গ আমাদের হাতে এমন মাইক দিয়েছেন, যেটায় কথা বললে পুরো দুনিয়ায় শোনা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া যেমন নিজের ব্যাপারে জানানোর জন্য, আবার অন্যকে হেয় করার জন্যও ব্যবহার করা হয়। যে যা খুশি বলতে পারে। প্রমাণ করার দায় তো নেই। ভার্চুয়ালি ক্ষোভ উগরে দিলে মনের জ্বালাও খানিক মেটে।’’

‘জ্যেষ্ঠপুত্র’র চিত্রনাট্য বিতর্ক চলাকালীন নানা রূপকের মধ্য দিয়ে নিজের কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছিলেন পরিচালক প্রতিম ডি গুপ্ত। ‘‘ফ্রেন্ডলিস্টের ৯০ শতাংশ মানুষকে আমি চিনি না। তাঁরা নিশ্চয়ই আমার লেখা পড়ে বা সিনেমা দেখে অ্যাড করেছেন। তাই কাজ নিয়ে যদি আমার কোনও বক্তব্য থাকে, তা ফেসবুকে শেয়ার করতে সংকোচ করি না। ভিতরে যখন কোনও জিনিস কামড়াতে থাকে, তার একটা রিলিজ় তো দরকার। ফেসবুকে লেখা আসলে আমার পার্সোনাল ক্যাথারসিস,’’ স্পষ্ট কথা তাঁর।

টলিউডের পাশাপাশি বলিউডেও এই ধারা সমান তালে অব্যাহত। যার পুরোভাগে কঙ্গনা রানাউত। তবে এ ক্ষেত্রে কঙ্গনার চেয়েও দশ কদম এগিয়ে তাঁর বোন রঙ্গোলি। কখনও কর্ণ জোহর, কখনও বা আলিয়া-সোনি রাজদান... নিশানায় যে-ই থাকুন, টুইটারের তরজা তিনিই মূলত চালান। মিডিয়ার সামনে কঙ্গনা যে বক্তব্য রাখেন, তাকে ভার্চুয়ালি জিইয়ে রাখেন রঙ্গোলি।

রামগোপাল বর্মা ও কর্ণ জোহরের টুইটার দ্বন্দ্ব তাঁদের ব্যক্তিসত্তার মতোই রঙিন। বহু বছরের পুরনো এই দ্বন্দ্ব এক কালে তিক্ততায় পূর্ণ হলেও, এখন শুধুই চলে কথার মারপ্যাঁচে। শব্দের আঘাতে কে কাকে ঘায়েল করতে পারে, প্রতিযোগিতা এখন তারই। তবে শব্দ দিয়ে জব্দ করার খেলায় রসবোধে ঘাটতি নেই!

জীবনের যে কোনও মুহূর্ত এখন টাইমলাইনের সম্পদ। পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অব্যক্ত চাপানউতোর কি আর সেই গণ্ডির বাইরে বেরোতে পারে? সময়ের প্রলেপ পড়লে পোস্টগুলো দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো নিজেরাই হাসবেন। তবে মুহূর্তের হাতছানিকে এত সহজে উপেক্ষা করা যায় কি?