আমরা পাঁচ ভাই। ১৯৯১ সাল থেকে বাবার অনুমতি নিয়ে আমি আলাদা থাকতে শুরু করি। বাকিরা বাবার সঙ্গেই এক বাড়িতে থাকত। বাবা মারা যান ২০০০ সালে। তার পর বাকি ভাইদের বহুবার অনুরোধ করেছি বাড়ি এবং জমি ভাগ করে নিতে, যাতে ভবিষ্যতে অসুবিধা না-হয়। কিন্তু প্রতিবারই আলোচনা ব্যর্থ হয়। বিশেষত বড়দা বরাবরই বলে এসেছেন খুব তাড়াতাড়ি সেই ব্যবস্থা করা হবে।

এর মধ্যে ভাইরা ২০০৩-’০৪ সাল নাগাদ বাবার বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকতে শুরু করে এবং ওই বাড়ি ব্যবসার জন্য গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। এর মধ্যেই বাড়ি বাজার দর কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০০৮ সালে আমি বড়দাকে জানাই যে সম্পত্তি ভাগ না-হলে আমি আইনি সাহায্য নেব। এর পর কিছু দিন বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাইনি। সম্প্রতি মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে গিয়ে জানতে পারি বাবার ওই বাড়ির আগেকার হোল্ডিং নম্বর বদলেছে। তার বদলে নতুন হোল্ডিং নম্বরও দেওয়া হয়েছে। আর এ সবই হয়েছে বাবার রেখে যাওয়া একটি উইলের প্রোবেট নেওয়ার পরে। জেলা ল্যান্ড রিফর্ম অফিসেও রেকর্ড পরিবর্তন করে নেওয়া হয়েছে। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি,
১) বাবা উইল একটি করেন ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে। যেখানে আমার এক ভাইকে তাঁর সম্পত্তি দিয়ে যান এবং বড় ভাইকে ওই উইলের ‘এগজিকিউটর’ করেন।

২) প্রায় ১২ বছর বাদে ২০০৯ সালে সেটির প্রোবেট হয়। অর্থাৎ আমি আইনের ভয় দেখানোর পর।

৩) অত্যন্ত কম সম্প্রচারিত হয়, এমন একটি সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হয় প্রোবেট সংক্রান্ত নোটিস।

৪) নোটিসটি আমাকে পাঠানো হয় বাবার বাড়ির ঠিকানায় যেখানে আমি থাকতামই না। ফলে পাইনি। মামলাতেও হাজির হতে পারিনি।

৫) অন্য ভাইয়েরা প্রোবেট মামলার নোটিস পেয়েও যায়নি। যে কারণে ওই ভাইয়ের পক্ষে মামলায় এক্স-পার্টে বা একপেশে রায় হয়েছে।

৬) বড়দা কিন্তু এত কিছুর পরেও আমাকে আশ্বস্ত করে বলছে যে তিনি বাড়ির সমান ভাগ করবেন।

৭) আমার সন্দেহ যে, বাবার মৃত্যুর পরে উইল বানানো হয়েছে।

এই অবস্থায় কী করব?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, কোচবিহার

 

আমাদের মতো অনেক পরিবারেই এই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমেই আপনাকে বলার যে, আপনি হয়তো মনে করেছিলেন বাবা ও অন্য ভাইদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারছিলেন। তা সত্যিই থাকলে কিন্তু আজ আপনাকে এই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হত না। তবে এটাও ঠিক, বাবার নিজস্ব সম্পত্তি তিনি তাঁর পছন্দের কাউকে উইল মারফত দিয়ে যেতেই পারেন। আপনি জোর করতে পারবেন না। সেই যুক্তিতে তিনি যদি আপনার অন্য কোনও ভাইকে উইল মারফত দিয়ে যান, কারও কিছু বলার থাকে না। কিন্তু এই অদ্ভুত গোপনীয়তার চেষ্টাই হয়তো আপনার মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা আপনাকে বলছেন যে, সম্পত্তির সমান ভাগ-বাঁটোয়ারা হবে সবার মধ্যে। আবার তাঁরা গোপনে উইলের প্রোবেট নিয়ে নিচ্ছেন। ব্যাপার একটু অদ্ভুত মনে হলেও এমন কিন্তু ঘটে।

১৯৯৭ সালে আপনার বাবা উইল তৈরি করান। ২০০০ সালে তিনি গত হন। ২০০৯ সালে উইলের প্রোবেট হয়। অর্থাৎ জানতে হবে উইল প্রোবেটের জন্য আবেদন কবে করা হয়েছিল বা আপনার বাবার মৃত্যুর কত দিন পরে। প্রোবেট দাখিল করতে খুব দেরি না হলে সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই। আপনি এক কাজ করুন। প্রোবেট মামলার একটি কপি এবং সেই মামলার রায়ের একটি সার্টিফায়েড কপি তুলুন। দেখুন কবে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আপনি বলছেন, প্রায় ১২ বছর বাদে প্রোবেট হয়—এই ব্যাপারটা আপনি ঠিক বলছেন না। আপনার বাবা তো গত হয়েছেন ২০০০ সালে। অর্থাৎ প্রোবেটের জন্য আবেদন করতে হবে অবশ্যই ২০০০ সালের পরে।

দ্বিতীয়ত, খুব কম চালু একটা সংবাদপত্রে প্রোবেট সংক্রান্ত মামলার আইিনি নোটিস প্রকাশ করাটাও এক ধরনের চালাকি করা ঠিকই। আদালত সবসময় বলেন, এমন কাগজে তা প্রকাশ করতে হবে যেটি চালু ও সেটি বেশির ভাগ মানুষ পড়েন। অর্থাৎ নোটিসটি সব সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের নজরে আনাটাই উদ্দেশ্য।

তৃতীয়ত, যেখানে আপনি থাকেন সেখানে মামলার নোটিস না-পাঠিয়ে যেখানে আপনি থাকেন না সেই ঠিকানায় নোটিসটি পাঠানোটাও অন্যায় হয়েছে।

আপনার অন্য ভাইয়েরা নোটিস পেয়েও হাজির হননি। মানেই হল, পুরো ব্যাপারটাই তাঁদের মস্তিষ্কপ্রসূত। প্ল্যানমাফিক। ইচ্ছে করে আপনাকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। আপনি বলছেন যে আপনার সন্দেহ গোটা উইলটাই জাল। আপনার বাবার মৃত্যুর পরে বানানো।

সবার প্রথমে রায়ের কপি তুলুন। তবে খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠবে। কবে আপনি জানলেন। এত দিন কেন ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করেননি। কিন্তু আমার মনে হয় আপনার বক্তব্যের মধ্যে সারবত্তা আছে। আপনি ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারেন। যদি আপনি নিঃসন্দেহ হন যে উইলটি আপনার বাবার মৃত্যুর পরে তৈরি এবং বাবার ওই সইটি জাল, তা হলে আপনি ফৌজদারি আদালতেও আপনার ভাইদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।    

 

পরামর্শদাতা: আইনজীবী জয়ন্ত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়