দ্য হার্ট অফ ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া

মধ্যপ্রদেশ পর্যটন-এর এই ‘ক্যাচলাইন’টি খুব টানত আমাকে। ভাবতাম, কী এমন সম্পদে পূর্ণ ভারত ভূখণ্ডের এই প্রদেশটি, যে কারণে তাকে ‘অমূল্য ভারতের হৃদয়’ বলা হয়? তাই ‘হৃদ মাঝারে’ ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছেটা মনে কেমন চেপে বসছিল! অবশেষে ঠিক হল শীতের ছুটিতে যাওয়া হবে মধ্যপ্রদেশ।

 

জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে হাওড়া থেকে বিলাসপুর নেমে ঠিক করা হল গাড়ি। মধ্যপ্রদেশ সফরে আমাদের প্রথম গন্তব্য মন্দিরময় পুরনো শহর ‘তীর্থরাজ’ অমরকন্টক। সেখানে ভারতের দুই উল্লেখযোগ্য পর্বত বিন্ধ্য এবং সাতপুরা মিলিত হয়েছে মৈকাল পর্বতের সঙ্গে। নর্মদা এবং শোন নদীর উত্পত্তিস্থলও এই অমরকন্টক।

পর্যটন দফতরের বিলাসবহুল তাঁবু

ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমরা চলছি। ছমছমে সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে বিন্ধ্যাচলের গায়ে। গাড়ির হেডলাইটে রাস্তার ধারে দু’একটা ছোট হরিণ চোখে পড়ল। বাঘও নাকি আছে এই জঙ্গলে! তবে তাদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। বিলাসপুর থেকে ঘণ্টা পাঁচেক চলার পর অমরকন্টকে এসে পৌঁছলাম, তখন বেশ রাত। পর্যটন দফতরের বিলাসবহুল তাঁবুতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। ছ'জনের জন্য বরাদ্দ তিনটি তাঁবু। নৈশভোজ সেরে সেই আস্তানাতেই ঘাঁটি গাড়লাম। ঘরের মধ্যে রুম হিটার ছিল তাই রক্ষে। পরে খবরের কাগজে দেখেছিলাম, ওই রাতের তাপমাত্রা ছিল ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস! ভোরবেলা উঠে দেখি তাঁবুর চার ধারে ফুলের সমারোহ। একে ছুটির সকাল, তাতে শীতের ফুল! সকালটাই জমে গেল। জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম অমরকন্টকের মন্দির দেখতে। এখানকার মন্দিরগুলি ভারতীয় ঐতিহ্যের সাক্ষী। অসাধারণ সৌন্দর্য তার স্থাপত্যশৈলীতে।

 

পুরনো মন্দির দেখে নর্মদার উত্সস্থলে পৌঁছলাম। এই ‘নর্মদা উদ্গম’কে ঘিরে রয়েছে একটি বিশাল কুণ্ড, তার পাশে নতুন এক মন্দির। বিশাল রাজকীয় প্রবেশদ্বার সেই মন্দিরের। নর্মদার উত্সমুখ জলের প্রায় ১২ ফুট নীচে, যেখানে নর্মদেশ্বর রয়েছেন। মহাদেবের স্বেদগ্রন্থী থেকে সৃষ্ট এই নর্মদা। বছরে দু’এক বার কুণ্ডের পিছন-দরজা খুলে জল ছেঁচে ফেলার পর ফের কুণ্ড ভর্তি করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সময় নর্মদেশ্বরের মন্দিরে প্রবেশ করা যায়।

অমরকন্টকের পুরনো এবং নতুন মন্দির

দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। অমরকন্টক থেকে আরও পশ্চিমে চলেছি আমরা, ১১ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে জব্বলপুরের দিকে। সবে ডিন্ডোরি আর শা’পুর শহর দু’টি পেরিয়েছি! সামনেই একটা মোড়। এখান থেকে বাঁ দিকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার গেলেই ঘুঘুয়া জাতীয় উদ্যানের প্রবেশপথ। ভারতবর্ষের একমাত্র জীবাশ্ম পার্ক এটি। আমেরিকার  অ্যারিজোনার ‘পেট্রিফায়েড ফরেস্ট ন্যাশনাল পার্ক’ ছাড়া পৃথিবীতে এটাই বোধহয় একমাত্র ‘অরণ্য’ যা কয়েক মিলিয়ন বছর আগে জীবাশ্ম হয়ে ‘রকগার্ডেন’-এ রূপান্তরিত হয়েছে। কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় জানা গিয়েছে, প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে এই জায়গায় ক্রান্তীয় চির সবুজ বৃক্ষের বিশাল এক জঙ্গল ছিল।

 

ঘুঘুয়া এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম উমারিয়া নিয়ে প্রায় ২৭ হেক্টর জায়গা জুড়ে এই জীবাশ্ম পার্কের ব্যাপ্তি। এখনও অবধি এই পার্কে ৩১টি প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করা গিয়েছে। তাদের বেশির ভাগই পাম ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ। ইউক্যালিপটাস, খেজুর, কলা, রুদ্রাক্ষ, জাম— এই সব ক্রান্তীয় সবুজ গাছকেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। রয়েছে ছোট বড় ইউক্যালিপটাসের জীবাশ্ম-গুঁড়ি। বিশাল সেই গুঁড়ির মধ্যে এখনও দেখা যায় গাছের বয়স-রেখা। স্থানীয়দের কাছে এই অঞ্চল ‘পাত্থর কা পেড়’ অর্থাত্ পাথরের গাছ নামেই পরিচিত। একটু উল্টেপাল্টে নিলেই— গাছ-পাথর। কথায় বলে বয়সের গাছ-পাথর নেই। তার মানে এত দিনে বুঝলাম। কত পুরনো হলে গাছ পাথরে রূপান্তরিত হয়! সেখান থেকেই কি এই শব্দবন্ধের উত্পত্তি?

অমরকন্টক ঘুরে এসে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। পর দিন ভোরে উঠে যেতে হবে লাইমস্টোনের দেশে, বিখ্যাত জব্বলপুর ‘মার্বেল রকস’ দেখতে। প্রথমে পৌঁছলাম ভেরাঘাট। জবলপুর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের এই জায়গায় নর্মদা নদী একটি গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শ্বেতপাথরের উপর আছড়ে পড়ছে সজোরে। কী অপূর্ব এই রূপ! ‘কেবল কার’-এ চড়ে নদীর একদম কাছাকাছি পৌঁছে উপর থেকে দেখা যায় ধুঁয়াধর জলপ্রপাত। প্রায় ৩০ মিটার উঁচু থেকে নাচতে নাচতে পড়ছে জল। জলীয়বাষ্পে মাখামাখি চার পাশ।

ভীমবেটকার গুহাচিত্র

সফরসূচি অনুযায়ী পর দিন ট্রেনে জব্বলপুর থেকে ভোপাল এবং সেখান থেকে পরিকল্পনামাফিক এক দিন সাঁচী ও অন্য দিন ভীমবেটকা যাওয়া। ‘গ্যাস ট্র্যাজেডি’ খ্যাত ভোপাল মধ্যপ্রদেশের রাজধানী। ভোপাল স্টেশন থেকে গাড়িতে সাঁচী যেতে লাগে সময় লাগে ঘণ্টা দুয়েক। পথে পেরোলাম কর্কটক্রান্তি রেখা। আমাদের যাত্রাপথকে তেরছা ভাবে কেটেছে সে। আমার কাছে এত দিন যার অস্তিত্ব ছিল ভূগোল ব‌ইয়ের পাতায় এবং মানচিত্রে, সেই কর্কটক্রান্তি রেখার ভারতীয় অংশ আমার পায়ের তলায়!

 

মধ্যপ্রদেশের রাইসেন জেলায়, ভোপাল থেকে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দূরে, বেতোয়া নদীর ধারে, সিন্ধুসভ্যতার সবচেয়ে সংরক্ষিত নিদর্শন সাঁচীস্তূপ। এই ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ মনুমেন্ট’টি এখনও রাজকীয়তায় পরিপূর্ণ। উজ্জয়িনীর ভাইসরয় অশোক তখন বিদিশার সওদাগর-কন্যা মহাদেবীকে বিবাহ করেন। কলিঙ্গ যুদ্ধে ব্যথিত এবং অনুতপ্ত অশোকের পাশে সেই সময় দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। বৌদ্ধধর্মের আদর্শে তাঁকে অণুপ্রাণিত করেছিলেন। বিদিশা মধ্যপ্রদেশের একটি শহর। যার প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে অশোক স্থাপন করলেন এক বৌদ্ধমন্দির যা সাঁচী স্তূপ নামে খ্যাত। বর্তমানে এই স্তূপ বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। বৌদ্ধ স্থাপত্যের সর্বপ্রকার বৈচিত্র অর্থাত্ স্তূপ, মন্দির, স্তম্ভ, বিহার এবং চৈত্য সব কিছুই নিঁখুত ভাবে রয়েছে এখানে। কয়েক একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত সাঁচী স্তূপ ও অন্যান্য স্থাপত্যগুলি। তবে সমস্ত স্থাপত্যই যে সম্রাট অশোকের আমলে তৈরি হয়েছিল তেমনটি নয়। আসলে সাঁচী গড়ে উঠতে সময় লেগেছিল বহু বছর।

 

যে প্রধান স্তূপটি অশোক তৈরি করেছিলেন সেটি সংগ্র অর্থেই রাজকীয়। স্তূপের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে চারটি প্রবেশদ্বার বা তোরণ রয়েছে। প্রত্যেকটি তোরণ অসাধারণ সুন্দর পাথরের কারুকাজ করা। উপরে রয়েছে জাতকের গল্প, গৌতম বুদ্ধের জীবন কাহিনি। এ ছাড়াও স্থপতির নাম ব্রাহ্মি লিপিতে খোদাই করা রয়েছে। বুদ্ধের দেহাবশেষও রাখা রয়েছে এই স্তূপের নীচে। দক্ষিণ দিকের প্রবেশদ্বারটিই সেই ঐতিহাসিক অশোক স্তম্ভ যা ভারতের জাতীয় প্রতীক। পাথরে নিখুঁত খোদাই করা চারটি সিংহের মুখ। খ্রিস্ট্রপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর এই স্থাপত্য চিহ্ন আমরা আজও জাতীয় ভাবে বহন করে চলেছি এখনও, সম্মানের সঙ্গে।

 

পর দিন সকালে হাজির হলাম ভীমবেটকার জঙ্গলে। ভোপাল থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং হোসাঙ্গাবাদের প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ওবাইদুলাগঞ্জ-ইটার্সি জাতীয় সড়কের ধারে এই জঙ্গল। ভীমবেটকা গুহাচিত্রের জন্য বিখ্যাত। কালের স্রোত তাকে বিনষ্ট করতে পারেনি। মুছে যায়নি সেই সব গুহাচিত্রের রং। অজানা কোন রঙে তুলি ডুবিয়ে আঁকা হয়েছিল এই সব চিত্র? প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর অজানা। কাল নির্ণয় করে দেখা গিয়েছে, সম্ভবত মেসোলিথিক যুগে এগুলি আঁকা হয়েছিল।

 

ভারতবর্ষের মানবসভ্যতার এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ১৯৫৭-১৯৫৮ সালে আবিষ্কার করে জনসমক্ষে তুলে ধরেন ভি এস ওয়াকাঙ্কার। প্রায় ৪০০টি চিত্রাঙ্কিত গুহা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভীমবেটকার গভীর জঙ্গলে। প্রাচীনত্ব এবং মানব ইতিহাসে এর তাত্পর্য মেনে নিয়ে ইউনেস্কো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ তালিকায় ভীমবেটকার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ তো গেল তথ্য-কথা। বিশাল এই গুহার মধ্যে দাঁড়িয়ে চিত্রগুলি দেখলে মনে হয় প্রায় ১০ হাজার আগের কোনও এক দিনে ফিরে গিয়েছি।

 

এর পরের গন্তব্য ইনদওর। সেখান থেকে যেতে হবে মুঘল সম্রাটদের বিশ্রামকেন্দ্র, শৈলশহর মান্ডুতে। ইনদওর থেকে মান্ডুর দূরত্ব প্রায় ৯৮ কিলোমিটার। মান্ডু ভাল করে ঘুরতে প্রায় সারা দিন লেগে যাবে। সমতল থেকে উঁচুতে, মালভূমির শীর্ষদেশ জুড়ে লেক, রাজপ্রাসাদ, উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তর— সব মিলিয়ে ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে মান্ডু দুর্গ অসামান্য এক জায়গা। রাজকীয় প্রবেশদ্বার একে একে পেরিয়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিন খিলজির হারেমে পৌঁছলাম। নাম তার জাহাজমহল। দোতলা এই প্রাসাদের টেরাসে দাঁড়িয়ে দু’পাশে দু’টি লেকের জলের দিকে তাকালে মনে হবে কোনও এক জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি। দুই হ্রদের জলে নোঙর করা জাহাজমহল থেকে নেমে ঘুরে দেখে এলাম মান্ডুর জাদুঘর।

ধুঁয়াধর জলপ্রপাত

অর্থনৈতিক ভাবে হোশং শাহের আমলে মান্ডু তার অর্থনৈতিক খ্যাতি লাভ করে। এর পর ১৫৫৪ সালে বাজ বাহাদুর ক্ষমতায় আসেন। বাজ বাহাদুর ছিলেন মান্ডুর শেষ স্বাধীন সুলতান। তিনি তাঁর হিন্দু বেগম রূপমতীর জন্য বানিয়েছিলেন রেওয়াকুণ্ড। মাণ্ডুর এই দ্রষ্টব্য স্থানটি দেখে আমরা গেলাম আকবরের হিন্দু গভর্নর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নীলকণ্ঠ শিব মন্দিরে। পারসি লিপিতে মন্দিরের গায়ে লেখা কত কিছু। অবাক হতে হয় হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির এই অপূর্ব সংহতি দেখে। মন্দিরে শিবলিঙ্গের মাথায় নর্মদা থেকে জল এসে পড়ছে অনবরত।

 

অমূল্য ভারতের হৃদয়ের কিছু অংশ ঘুরে বেশ সুন্দর এক অনুভূতির রেশ নিয়ে এ বার বাড়ি ফেরার পালা।

 

ছবি: লেখক।

উত্তর কলকাতায় জন্ম। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর। বিবাহসূত্রে বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। ভ্রমণ কাহিনি, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ লেখায় উত্সাহী। একাধিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে লেখা। এর পাশাপাশি ঘুরে বেড়ানো ও ব্লগ লেখার প্রতিও রয়েছে যথেষ্ট আগ্রহ। তাঁর কবিতার বই, রান্নার ব‌ই, ভ্রমণবৃত্তান্ত ও ১২টি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে।