ঝাড়া তিন ঘণ্টা বসে। বাইরের দুনিয়া ব্যস্ত অঞ্জলি দিতে। আর আমি কিনা বসে আছি বিমানবন্দরে। মুখ ব্যাজার করে!

অষ্টমীর সাত সকালেই পৌঁছে গিয়েছি কলকাতা বিমানবন্দরে। ন’টায় শিলং যাওয়ার বিমান। কিন্তু, ছাড়ার কোনও নামই নেই৷ ঘোষণা করা হচ্ছে, দেরি হবে। তার বেশি কিছু নয়।

এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ছাড়ল বেলা ১২টার সময়৷ তবে দেরি হলেও খেতে দিয়েছিল ভালই৷ পড়শি বাংলাদেশের উপর দিয়ে উড়ে শিলঙের উমরয় বিমানবন্দরে নামলাম দুপুর দুটোয়। এখান থেকে মূল শহর ১৫ কিলোমিটার দূরে। বাস আছে শহরে যাওয়ার। ভাড়া ১০০ টাকা। আর ভাড়ার গাড়ি আছে, তাতে মোটামুটি ৫০০ টাকা ভাড়া। তবে বেশ দরদাম চলে৷


শুটিং স্পট চেরাপুঞ্জি যাওয়ার পথে।

বাসেই চলে এলাম পুলিশ বাজার এলাকায়৷ হোটেলের ছড়াছড়ি এখানে। আগে থেকে বুক করে না এলেও ঘর পাওয়া যায়৷ তবে, সবই বাজেট হোটেল৷  থাকার খরচ দিনপ্রতি ৫০০ থেকে ১৫০০-র মধ্যে৷ পর্যটন দফতরের পাইনউড এবং পোলোটাওয়ার্স হোটেল দু’টি উচ্চ মানের ও দামের৷ ২০০০ টাকা থেকে শুরু৷ তবে, এই হোটেল দু’টি শহরের ভিড় থেকে দূরে, সঙ্গে গাড়ি থাকলে ভাল৷ পুলিশ বাজার জায়গাটার সুবিধা হল, এখান থেকে বাজার, দোকান, বাস ডিপো, ভাড়ার গাড়ি সবই কাছাকাছি পাওয়া যায়৷ সে দিন বিকেলটা আশেপাশের দোকানগুলোতে নানা রকম হস্তশিল্পের জিনিস দেখেই কেটে গেল৷ আশপাশের ঘোরার খোঁজখবর নিয়ে নিলাম৷ বিকেলের পর পুলিশ বাজার একটা জমজমাট জায়গা৷ সব্জি বাজার, জলখাবারের দোকান, চা, কফি, মোমো— সবমিলিয়ে গমগম করছে৷ তখন গাড়ি চলাচলে ‘না’ থাকে ওই রাস্তায়৷ উত্তর পূর্ব ভারতের বেতের অপূর্ব হাতের কাজের সম্ভারের পাশাপাশি শীতবস্ত্র ও মেমেন্টো সংগ্রহ করার সেরা ঠিকানা এই পুলিশ বাজার৷


চেরাপুঞ্জি যাবার রাস্তায় ছোট ছোট কোলিয়ারি।

দ্বিতীয় দিন একটা গাড়ি নিয়ে বেরোলাম শিলং পিক, লেডি হায়দরি পার্ক, গল্ফ কোর্স, বিমানবাহিনীর মিউজিয়াম— এ সব জায়গা দেখতে৷ শিলং পিক থেকে নীচে গোটা শহরটা ‘পাখির চোখে’ দেখা যায়৷ বিমানবাহিনীর মিউজিয়ামটা অসাধারণ, অনেকটা সময় লাগে দেখতে৷ হায়দরি পার্কের ফুলের শোভা নজরকাড়া৷ এখানে অর্কিডের সংগ্রহ বেশ ভাল৷ গল্ফ কোর্সেরও তুলনা মেলা ভার৷ গোটা পূর্ব ভারতে এ রকম গল্ফ কোর্স নাকি আর নেই! ঢেউ খেলানো ঘাস জমিতে গল্ফ ময়দান ও ক্লাবহাউস মনে ছাপ রাখে৷ এ ছাড়াও আছে সেন্ট পল্স চার্চ ও ডন বস্কো মিউজিয়াম— দুটোই অবশ্য দ্রষ্টব্য৷ খ্রিস্টান অধ্যুষিত বলে এখানে চার্চের সংখ্যা বেশি৷ সেন্ট পল্স চার্চ ও তার পরিসর দেখার মতো৷ গোটা উত্তর পূর্ব ভারতের আদিবাসী ও তাদের শিল্প, জীবন, সংস্কৃতির সম্ভার সাজানো সাত তলা ডন বস্কো মিউজিয়ামে৷ দেখতে অনেকটা সময় লাগে৷ পুজোর সময় শিলং শহরের বাড়তি পাওনা প্রচুর দুর্গাপুজো সঙ্গে অঢেল ভোগ প্রসাদের ব্যাবস্থা৷ এখানে অনেক ভাল বেকারি আছে। তাদের কেক, বিস্কুট, কুকিজ জিভে জল আনে৷ আর অবশ্যই ইলিশ মাছ চেখে দেখা উচিত। পড়শি দেশের সিলেট থেকে আগত এই মাছের স্বাদ কলকাতার থেকে অনেক ভাল৷

তৃতীয় দিন গাড়ি ভাড়া নিয়ে রওনা হলাম চেরাপুঞ্জির উদ্দেশে৷ দূরত্ব প্রায় ৫৩ কিলোমিটার। মাঝে এক বার থামা হল শুটিং স্পট নামক জায়গায় চা খেতে৷ এখানে রামকৃষ্ণ মিশন, কোলিয়ারি ও লিভিং রুট ব্রিজ দেখার মতো! এখন চেরাপুঞ্জির থেকে মওসিনরামে বেশি বৃষ্টি হয়৷ আমাদের গন্তব্য আরও ১৫ কিলোমিটার এগিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসর্ট৷ এই রাস্তায় প্রজাপতির মেলা৷ গ্রামের নাম লাটিকিশনিউ৷ রিসর্টের বাগান থেকে দেখা যায় পড়শি দেশের রেলগাড়ি— পণ্য ও যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করছে৷ অনামী জংলি ঝরনার থেকে উত্পত্তি শেলা নদীর। এই নদীই পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়শি দেশের সিলেট জেলায় ঢ়ুকে পড়েছে৷ এখানকার বন্দোবস্ত বেশ ঘরোয়া ও আন্তরিক৷ এক বিদেশি ভদ্রলোক এখানে এসে এক খাসি মহিলাকে বিয়ে করে, এখানেই থেকে যান। এই রিসর্ট ওই দম্পতির। বিদেশি ভদ্রলোক পরের দিনের বেড়ানোর সূচি সাজিয়ে দিলেন  আমাদের। সঙ্গে গাইডের ব্যবস্থাও৷


শিলংয়ের বরাপানি লেক।

জলখাবার খাওয়ার পর আমাদের যাত্রা শুরু লিভিং রুট ব্রিজের উদ্দেশে। প্রায় দু’হাজার ফুট নীচে একটা ঝরনা বয়ে যাচ্ছে। তারই উপরে দু’দিকের দু’টি বট গাছের ঝুরি আটকে চওড়া এই ব্রিজ তৈরি হয়েছে৷ এর উপর কিছু ক্ষণ কাটিয়ে ও ছবি তুলে ফিরে এলাম রিসর্টে৷ রাতে ক্যাম্পফায়ার ও গানবাজনা হল৷ চতুর্থ দিন শেষ হয়ে গেল।

পঞ্চম দিন আবার শিলং ফেরা, এ বার থাকা বড়াপানি লেকের পাড়ে উমিয়ম লেক রিসর্টে৷ হোটেলটির অবস্থান এক কথায় দারুণ৷ বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় লেকের উপর ভাসছি৷ কাচে ঘেরা রেস্তোরাঁয় বসে সময় কাটে লেকের উপর জলক্রীড়া দেখতে দেখতে৷ পাশেই লেক ক্লাব। চাইলে বোটিং করা যায়৷ পিকনিক করারও আদর্শ জায়গা৷ দুপুরের পর থেকে শুরু হল জোর বৃষ্টি। অতএব হোটেলবন্দি৷


শেলা নদী।

পর দিন ফেরার পালা। দুপুরের বিমান। এখান থেকে বিমানবন্দর কাছেই। গোছগাছ সেরে আর এক বার লেকের ধার ধরে ঘুরে আসা৷ দুপুরের খাবার খাওয়ার পর একটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বের হওয়া গেল৷ মিনিট কুড়ি লাগে পৌঁছতে৷ কিন্তু, সিকিউরিটি চেকিং করার লোক নেই৷ শহর থেকে যে বাসটি যাত্রী নিয়ে আসে তারাও সেই বাসের যাত্রী এবং বাসটি জ্যামে আটকে আছে খবর পাওয়া গেল৷ বিমান সে দিন সময়মতো ঠিক দু’টোর সময় নেমে পড়েছে, কিন্তু যাত্রীরা নামতে পারছেন না৷ অবশেষে বাসটি এল দুটো কুড়ি নাগাদ। তার পর সিকিউরিটি চেকিং করে বিমানে উঠে ছাড়তে ছাড়তে প্রায় তিনটে৷ মাঝে যোরহাটে এক বার থেমে কলকাতায় নামাল, তখন প্রায় ছ’টা৷ শেষ হল সপ্তাহব্যাপি শিলং ভ্রমণ৷

 

লেখকের বাড়ি কলকাতার রাজারহাটে। বর্তমানে কর্মসূত্রে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি শহরে বিড়লা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে সিস্টেম আ্যনালিস্ট হিসেবে কর্মরত৷ ঘোরার নেশা ছোটবেলা থেকে। ইয়ুথ হস্টেল আ্যসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার আজীবন সদস্য৷ ছবি তোলাও একটা নেশা৷