আমি আর আমার গান— এ দুইয়ের মধ্য দিয়েই আমি বৃহত্তর জীবনকে খুঁজি। আমার মনে হয় জীবনে চলার ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষের যে নিজস্ব ব্যাকরণ, তার প্রতিটি ধাপেই যেন এক অজানা সুর লুকিয়ে বাজতে থাকে। তাই সংবেদনশীল সত্তা শেষ জীবনে পৌঁছে যখন পিছনে ফিরে তাকায় তখন বুঝতে পারে— এটাই হওয়ার ছিল। অর্থাৎ নিজের জীবনে চলার পথের ব্যাকরণকে আবিষ্কার করে। সেটাও গানই। জীবন গান।

পারিবারিক সূত্রেই আমার গানকে পাওয়া। তাকে এগিয়ে দিয়েছেন বাবা-মা। স্বরলিপি থেকে সরাসরি এক একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত তুলে কণ্ঠস্থ করতে পারার জন্য পুরস্কার পেতাম পাঁচ টাকা করে। গান সুর করার জন্য পুরস্কার ছিল আরও অন্যরকম। পাশাপাশি বাবা-মা ছিলেন সামাজিক তথা অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং তার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রশ্নে সবিশেষ দায়বদ্ধ। তাঁদের এই জীবনদর্শন আমাকে যে প্রভাবিত করবে এ কথা বলাই বাহুল্য। আমার ঠাকুমা কাঠের অর্গান বাজাচ্ছেন (দু’হাতে) এবং আমার দাদু রবীন্দ্রনাথের গান অথবা ব্রাহ্মসঙ্গীত গাইছেন, সে দৃশ্য আজও আমি চোখ বুজলে দেখতে পাই। কাকা কিংবদন্তি সুরকার। তাঁর পেশাদারি সঙ্গীত জগৎ আমাকে যথার্থ অর্থের সঙ্গীতের তারকা তথা প্রণম্য সব সাঙ্গীতিক ব্যক্তিদের দর্শন পাইয়ে দিয়েছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কাজকে সরাসরি (লাইভ) প্রত্যক্ষ করা, রবীন্দ্রনাথ, সলিল চৌধুরীর সুরসৃষ্টিকে বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে অনুভব করতে শেখার অনুপ্রেরণাই আমার কাছে সাঙ্গীতিক উপনয়নের মন্ত্রপাঠ। আর সুচিত্রাদির (মিত্র) সঙ্গে আমার সম্পর্ক তথা তাঁর স্নেহাশিস পাবার কথা বাঙালি সমাজকে আর নতুন করে কী বলব! এ ছাড়াও আরও অনেক গুণিজনের কাছে গান শিখেছি, সাঙ্গীতিক উপদেশ পেয়েছি, নিয়েছি। কত গুণি শিল্পী আমার কথায় প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞানকে আলো করে রেখেছে, সো তো আমার জীবনগান— অমৃতগান।

পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার সঙ্গে

স্নাতকোত্তর-এর পর যখন বেকার যুবক দুটো-তিনটে ২৫ টাকার গানের টিউশনিতে নিজের পকেট খরচা চালাত তখন ঈশ্বরের আশীর্বাদ হয়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মায়া সেন নিজে ডেকে ২৫০ টাকার আংশিক সময়ের অধ্যাপনার চাকরি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগে ১৯৮৫ সালে। তিনি শুধু পায়ের তলায় শক্ত জমিই দেননি, শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং আমার সঙ্গীতকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেখানে তিন বছর কাজ করার পর আকাশবাণীর প্রোগ্রাম এগ্‌জিকিউটিভ পদে যোগদান কার্শিয়াং বেতারকেন্দ্রে। এর পর আকাশবাণী কলকাতা, তার পর সেই বিশাল চাকরি ছেড়ে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ সময়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত অধ্যাপক এবং পরে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব সামলানো। সময় যত এগিয়েছে, বেড়েছে অভিজ্ঞতা। সঞ্চয়ের ঝুলি স্বল্প নয়। প্রচুর গান রেকর্ড হয়েছে গায়ক, সুরকার, গীতিকার, অ্যারেঞ্জার হিসেবে। ১৫০টি রবীন্দ্রসঙ্গীতের তিনটি সিডির অ্যালবাম উপহার, ৫০টি গানের অ্যালবাম সিলেবাসের রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক বাংলা গানের অ্যালবাম বৃষ্টি তুমি, জীবনের ক্যানভাস-সহ আরও অনেক অ্যালবাম রসিক জনের মনে স্থান করে নিয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে টিভি সিরিয়াল, চলচ্চিত্রের গান। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, ভি বালসারা, দিলীপ রায়, কল্যাণ সেন বরাট-সহ আরও অনেক সুরকারের সুরে গানের রেকর্ড রয়েছে। জনপ্রিয় হয়েছে শ্যামাসঙ্গীতের অ্যালবাম নাচে এলোকেশী। দেশে-বিদেশে শুধু শিল্পী হিসেবে নয়। অধ্যাপক হিসেবে, ভারতের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে অনুষ্ঠান করবার, সেমিনার করবার, বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। দেখতে পেয়েছি অনেক উত্থান-পতন, মানুষের উচ্চাভিলাষ জনিত হীনতা, স্নেহ-ভালবাসার সুযোগ নেওয়া, সততাকে বোকামো ভাবা। দেখেছি পাইয়ে দেওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব। আনন্দ-শোক, স্বজন হারানোর বেদনার সঙ্গেও নিবিড় পরিচয় হয়েছে। এও তো জীবনগান।

মান্না দে এবং সুচিত্রা মিত্রের থেকে পেয়েছি আশির্বাদ

আজকের শিল্পীর সঙ্গীতজীবন ভীষণ ভাবে টিভি চ্যানেল নির্ভর। আজ আর সাঙ্গীতিক নৈপুণ্য, প্রতিভাই শেষ কথা নয়। সেল্ফ মার্কেটিং স্ট্যাটেজি সহ অন্যান্য বিষয়ও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমি তানপুরা বাঁধতে পারি কি না, এক পাতা শুদ্ধ ইংরেজি বা বাংলা লিখতে পারি কি না সেটা বড় কথা নাও হতে পারে। যদি ম্যানিপুলেশন শব্দগুলো আমায় উদ্বুদ্ধ করে, তবে সঙ্গীতে পি.এইচ.ডি, অধ্যাপনা, টিভিতে মুখ দেখানো, কাগজে ছবি বেরোনো— এ সবই আয়ত্তের মধ্যে এসে যাবে। ভাবতে লজ্জা করে যে পৃথিবী জুড়ে যখন প্রযুক্তির বিপ্লব চলছে, তখন আমাদের সঙ্গীতের হাজার হাজার মেধাবী ছাত্রছাত্রী সঠিক মাইক্রোফোনে তার কণ্ঠস্বর কেমন শোনায় সেটাও জানতে পারে না। অথচ এম.এ, এম.ফিল, পি.এইচ.ডি হয়ে যায় এবং সঙ্গীতকেই পেশা হিসেবে বাছে, শিক্ষক হওয়াও আটকায় না। সঙ্গীত শিক্ষা ব্যবস্থায় আদর্শ বিজ্ঞানসম্মত পরিকাঠামো থাকা প্রয়োজন। অথচ ১০০ জন ছাত্রছাত্রী শিক্ষকের মুখে নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে গান শিখবে আর শিক্ষক সেটা গিলতে গিলতে গান শেখাবে এমনটাই হয়ে চলেছে। আমার সাঙ্গীতিক মূল্যবোধও আমাকে খুবই বিপদে ফেলে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে তানালাপ, সুরবিকৃতি, সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতায়োজনে পরিবর্তন, খোলা মঞ্চে অথবা দূরদর্শনে লিপ্ সিঙ্গিং, বেসুরো গলাকে পিচ কারেকশন করে সুরেলা করা সহ আরও অনেক বিষয় আছে যা আমার কাছে সাঙ্গীতিক দস্যুবৃত্তি। আমার মনে হয় এ সবের কারণ বোধহয় কোথাও আত্মবিশ্বাসের অভাব।

গুলজারের থেকেও পেয়েছি স্নেহ।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের নোবেল এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু, পৃথিবী তাঁর সঙ্গীতের সঙ্গে ততটা পরিচিত নয়। যতটা পরিচিতি বেঠোফেন, বাখ, মোৎজার্ট-এর সঙ্গীতের সঙ্গে। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের দায়িত্ব বিদেশিদের মধ্যে সুরস্রষ্টা রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দেওয়া। নিজেদের সন্তানকে রবীন্দ্রনাথ-সহ অন্যান্য বাংলা গান শেখার সুযোগ করে দেওয়া এবং তাদেরই বিদেশি বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে বিষয়টিকে ছড়িয়ে দেওয়া। মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ এখনও আমাদের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রদূত। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তার সুযোগ আমরা নিতে পারছি কি?

 

লেখক: সঙ্গীতশিল্পী।