শীতের জন্য সারাটা বছর ঠিক যেন হাপিত্যেশ করে বসে থাকা!

ভোরে উঠে চোখ রগড়িয়ে কুয়াশার ফাঁক দিয়ে সূর্যকে চোখ মারব বা লেপ-বালাপোশ নরম করে গায়ে টেনে নিয়ে আরও একটু বিছানার ওম নিচ্ছি। কর্তা জিজ্ঞাসা করলেন, “আজও বাজার যেতে হবে?” গিন্নির গলায় আদুরে মেজাজ, “আজ একটু ওলকপি এনো প্লিজ! ফ্রিজে অনেকটা চিংড়ি আছে, কড়াইশুঁটি দিয়ে রাঁধব।” অথবা “খেজুরের গুড় ওঠেনি গো? দু’টো নারকেল এনো তা হলে। বাবার জন্য একটু পাটিসাপটা বানিয়ে নিয়ে যাব।” এই হল শীতের কলকাতায় আম বাঙালিবাড়ির ভোর।

কুয়াশার পরত ছিঁড়ে ঘুম ভাঙে কলকাতার। হ্যালোজেন নিভে যায়। আমি কান পেতে র‌ই। উশখুশ প্রাণ। খবরের কাগজ ছিনিয়ে নিয়ে দেখা শীতের কলকাতার কোথায় কী আছে! আজ নন্দনে সিনেমা তো কাল আইসিসিআর-এ চিত্র প্রদর্শনী। অ্যাকাডেমিতে নাটক কিংবা মিলনমেলায় টেরাকোটা-ডোকরার আমন্ত্রণ। আর কয়েক দিন পরেই তো শীতের কলকাতার বড় পার্বণ ‘ব‌ইমেলা’। রবিবার ভোরে ঘুম ভাঙে কড়াইশুঁটির কচুরি আর আলুরদমের গন্ধে অথবা সরু-চাকলির সঙ্গে স্রেফ পয়রা গুড়ের মাখামাখিতে। খবরের কাগজ হাতে তুলতেই কয়েকশো পিকনিক স্পট। এখন আর যেমন কেউ চড়ুইভাতি বলে না, তেমনই বাড়ির মেয়েদেরও মাঠে-ঘাটে-জঙ্গলে গিয়ে রান্নাবান্নাও করতে হয় না। কেটারিং-এর ঘাড়েই সব দায়িত্ব। চাই শুধু একফালি সোনালি রোদের সকাল, নীল আকাশ আর একচিলতে সবুজ খোলা মাঠ। ঠান্ডায় লং ড্রাইভ পুরো জমে ক্ষীর। অমৃত কমলালেবুর সকাল। বেগুনি-মুড়ি অথবা জয়নগরের মোয়া। শীতকাল হল বাঙালির কফি অ্যান্ড কেক মাস। তাই ওই কম্বোতে শীত-বাঙালির ফ্যাশন ইন। শীতের কলকাতায় বাঙালি চা কম খায়। ঊর্দ্ধমুখী হয় কফির চাহিদা। তবে ব্ল্যাক কফি নয়। অপর্যাপ্ত দুধ-চিনির কফি ছাড়া রোচে না তাদের। সন্ধেয় চাই স্যুপ। এটা নাকি শীতকালীন পানীয়! পাড়ায় পাড়ায় চলে ব্যাডমিন্টন। কখনও বা রাস্তা আটকে বারোয়ারি ক্রিকেট।
ছোটবেলায় মা দক্ষিণের বারান্দায় পিঠে ভেজা চুল রোদের দিকে মেলে উল বুনতেন। এক কাঁটা সোজা, পরের কাঁটা উল্টো। ঘর বন্ধ করা শিখেছিলাম উলকাঁটায়। এখন সেই ঘর খুলতেই ভুলে যাই। শীতের মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে কমলালেবুর দুপুরগুলো খুব মনে পড়ে। আর মনে পড়ে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার কথা। ক্লাসে ওঠার ক্ষণও পড়ত ঠিক বড়দিনের প্রাক্কালে। শীতের ভাল-মন্দ, সার্কাস, মেলা, চিড়িয়াখানা কিংবা চড়ুইভাতি— সবই নির্ভর করত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের উপর।

দুটো মাস ব‌ই তো নয়, যেন সম্বত্সরের পরম প্রাপ্তির আবহাওয়া। প্রবাসের বন্ধুদের বলে ফেলি, “শীতকালে আসছিস তো তোরা?”  আমার গর্বের মহানগরের রাজমুকুট যেন বড্ড বেশি ঝলমলে হয়ে ওঠে এই শীতে। মাঘের শীত, পৌষের পিঠে, লেপের ওম— সব আমাদের। তোরা দেখে যা একটি বার, কী সুখেই আছি আমরা! বিদেশে ঝোলাগুড় পাবি? টাকির পাটালি পাবি? রুপোর মতো চকচকে দেশি পার্শে পাবি? বাজারের থলি ভর্তি করে মৌরলা আর তোপসে আনব তোদের জন্য। কলকাতার মাছের মতো স্বাদ আর কোথায় পাবি! ভায়ের মায়ের স্নেহের চেয়েও বেশি শীতের টাটকা মাছ। নলেন গুড়ের সন্দেশ পাবি। আছে তোদের দেশে? কলকাতায় আছে। ফ্লুরিসে বসে কেক দিয়ে কফি খাওয়াব। ভিন্টেজ কার দেখাব। গঙ্গাবক্ষে স্টিমার চড়াব। কল্পতরু উত্সব দেখাব। হর্টিকালচারের ফুলের মেলায় নিয়ে যাব। চামড়াজাত জিনিসের মেলা লেক্সপোতেও নিয়ে যেতে পারি। ওয়েলিংটনে গোলগাল ভুটিয়া মাসির শীতপোশাকের অস্থায়ী দোকানে যাবি? খুব সস্তা। সস্তার ফুটপাথও আছে আমাদের।  আন্ডার এস্টিমেট করিস না মোটেই। আমরা নিপাট আতিথেয়তার ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছি সারা বছর তোদের জন্য। অতিথি দেব ভব!

একটি বার দেখে যা তোরা! বিশ্বায়নের ঢেউতে হাবুডুবু খাচ্ছি আমরা। আমাদেরও শপিং মল আছে। প্রচুর ফ্লাইওভার আছে। মাল্টিপ্লেক্সের রমরমা দেখে যা। বড়দিনের কলকাতার আলোর রোশনাই? পার্ক স্ট্রিটের ট্রিঙ্কাস-এর ঊষা উত্থুপরা এখন আরও গ্লিটসি হয়েছে রে। কলকাতার টিন-রা এখন তন্ত্র-মন্ত্রে দীক্ষিত। শীতে আরও রঙিন হয় পার্ক স্ট্রিট। রেস্তোরাঁতে ক্রিসমাস ডিনারে জায়গা মেলে না জানিস! এত ভিড় সেখানে। প্রিন্সেপ ঘাটে শীতের ওম নিয়ে, গঙ্গায় ভাসমান বয়াগুলোর মতো জেরিয়াট্রিক সব নাগরিক নিয়ে, জানু-ভানু-কৃশানু পথশিশুদের নিয়ে আমরা বেশ ভাল আছি। কফিহাউসের বাড়বাড়ন্ত দেখলে তোরা অবাক হবি। হরেক কিসিমের কফির ঠেক এখন শহরে।

আমাদের বাপ-ঠাকুর্দা অনেক ঠাটঠমক শিখেছিলেন সাহেবদের কাছ থেকে। সওদাগরি অফিসে কাজ করেছেন। এক আধ পেগ হুইস্কি বা ভ্যাট সিক্সটি নাইন তাঁরাও খেতে শিখেছিলেন সাহেবদের হাত ধরেই। স্যুট-বুট পরেছেন শীতকালে। সেই স্যুট বানানোর ট্র্যাডিশন টিকিয়ে রেখেছিল তাঁদের সন্তানসন্ততিরাও। শীত পড়লে দূরে কোথাও, বহু দূরে তাঁরা যান হাওয়াবদলে। ব্যাগ গুছিয়ে পৌষমেলা বা বকখালি।  

আর এই শীতে যে জিততে পারল না, তার জন্য পড়ে র‌ইল রোয়াকের আড্ডা। গিন্নিদের দুপুর গড়াল পুরনো পুজোবার্ষিকী ঘেঁটে আর বালাপোষে রোদ খাইয়ে। রান্নাঘরে গন্ধ ওঠে তলা লেগে যাওয়া নলেন গুড়ের পায়েসের। কলকাতার আম আদমি এখন ই-মেল বোঝে। সোশ্যাল নেটে নাম লেখায়। গৃহবধূরা ফেসবুকে মাতে অলস দুপুরে। তবুও তো তোরা ফিরলি না! আসলে শহরের মনটাকেই বুঝলি না যে!

 

কেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর। আদ্যোপান্ত হোমমেকার। কলকাতার বাসিন্দা। বহুল প্রচারিত বেশ কয়েকটি পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। গদ্য চর্চার পাশাপাশি কবিতার সঙ্গেও রয়েছে নীরব ওঠাবসা। ওয়েবপত্রিকাতেও তাঁর বেশ কিছু লেকা প্রকাশিত হয়েছে। বাজারে তাঁর চারটি ব‌ইও পাওয়া যায়। তাঁর অবসর যাপনের আরও কয়েকটি ঠেক— ব‌ই, সঙ্গীতচর্চা, বেড়ানো এবং রান্না।