আকাশ থেকে দেখেছি পাতলা তুলোর মতো মেঘের আস্তরণের নীচে একটা সবুজ কার্পেট। কম্বলও হতে পারে। কার্পেট একটা, কিন্তু সবুজ অনেক রকম— কালচে, হাল্কা, গাঢ়, ফ্যাকাশে। কার্পেটটার মাঝ বরাবর এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে একটা রুপোলি ফিতে। এক সময় কার্পেটটা (কম্বলও হতে পারে) আমার দিকে হু-হু করে এগিয়ে আসতে থাকল। আর আমি অবাক হয়ে দেখলাম, কালচে সবুজগুলো আসলে নারকেল গাছ, হাল্কা সবুজগুলো কচুরিপানা, ফ্যাকাশেগুলো ন্যাড়া মাঠ— এই রকম সব। আর রুপোলি ফিতেটা হয়ে গেল একটা নদী, তাতে নৌকাটৌকা, এমনকী জাহাজও ভাসছে এক-আধটা।

উত্তর পূর্বের ছোট শহর থেকে পুজোর ছুটিতে বেড়াতে এসে হাল্কা-গাঢ় সব ধরনের সবুজ শুদ্ধ, রুপোলি ফিতের মতো গঙ্গা নদী শুদ্ধ, কলকাতা শহরটা সেই যে আমার মধ্যে ঢুকে গেল, ত্রিশ বছর, পঁয়ত্রিশ বছর পরও তাকে আর বার করা গেল না। তার যাবতীয় সবুজ-সহ, নীল রুপোলি-সহ, এমনকী কালো-সহ সে পাকাপাকি আস্তানা গেড়ে বসে আছে বাঁ দিকের বুক-পকেটের পেছন দিকে। শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে।

ছোট শহর থেকে প্রথম বার কলকাতা আসা বালকের চোখে একটা মুগ্ধতা তো লেগেই থাকে! আমারও ছিল। লাতড়ি কাঠের উনুন দেখে অভ্যস্ত চোখে প্রথম নতুন জিনিস ছিল কয়লার উনুন। বালতিতে চির কাল জলই দেখে এসেছি। প্রথম বার তাতে আগুন দেখলাম। আরও কত কী দেখলাম প্রথম বারের মতো— ট্রাম, এমজি রোডে সারি দিয়ে দাঁড়ানো কালচে বাক্সের মতো ঘোড়ারগাড়ি, লোকাল ট্রেন— যাকে কয়লার ইঞ্জিন টানে না। তিন তলার চেয়ে উঁচু বাড়ি দেখলাম সেই প্রথম। রাস্তা জুড়ে মেট্রো রেলের গর্ত, বাড়ির ছাদে টেলিভিশনের আঁকশি, সন্ধেয় নিয়ম করে লোডশেডিং কিংবা ফুচকাওয়ালা, তাও সেই প্রথম বার। চিড়িয়াখানা বা জাদুঘরের কথা আর নাই বা বললাম!

দ্বিতীয় বার যখন এলাম তখন এগারো ক্লাসে। নতুন কিছু দেখে আবাক হলেও তা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করতে শিখে নিয়েছি তত দিনে। শহরটাও খানিকটা বদলে গিয়েছে যেন। হচ্ছে, হবে করতে করতে পাতাল রেলও চালু হয়ে গিয়েছে। ঘোড়ার গাড়ি বিদায় নিয়েছে, ট্রামগুলো লুপ্তপ্রায়। এগরোল নামে একটা চটজলদি খাবার পাড়ার মোড়ে মোড়ে বিক্রি হচ্ছে। বাসে যথেষ্ট ভিড় হলেও আগের মতো বাদুড়ঝোলা ভিড় আর নেই। লোডশেডিং কমেছে। ট্যাক্সিচালকদের মধ্যে দাড়ি-গোঁফওয়ালা মুখের সংখ্যা কমেছে। সদ্য বড় হয়ে যাওয়া আমাকে অবাক করার জন্য কলকাতার আস্তিনে আরও কিছু তাস তখনও লুকানো ছিল। পনেরো দিনের সফরে আসার আগে চুল কাটার সময় হয়নি। শিয়ালদহের পূরবী সিনেমার কাছে ‘রিপন’ নামে একটা সেলুনে চুল কাটতে গিয়ে ক্ষৌরকার মহাশয়ের সঙ্গে কথায় কথায় জানলাম, তাঁর ও আমার পূর্বপুরুষের বাড়ি পূর্ববঙ্গের একই শহরে। তিনি চল্লিশ বছর ধরে কলকাতায় আছেন। দেশোয়ালির সঙ্গে প্রবাসে দেখা হওয়ার যে অনুভূতি আর উত্তেজনা, সেটাও এক সদ্য কিশোরকে কলকাতা শহরের তরফ থেকে ছিল সে বছরের পুজোর সেরা উপহার।

তৃতীয় এবং পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় আসার উদ্দেশ্য ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। সেই বয়সটা, যখন মানুষ হয়ে ওঠে তার আনন্দ-দুঃখ-ব্যথা-অভিমান-দাবিদাওয়া কিংবা তার রাজনৈতিক মতামত সমেত।

প্রথম বার লুকিয়ে সিগারেট টানা বা প্রথম বার যমুনা সিনেমার পাশে গিয়ে কাবাব ভরপেট— এগুলো শহর কলকাতার সঙ্গে আমার তৃতীয় মোলাকাতের অবদান। এমনকী, প্রথম কোনও পরীক্ষায় ফেল করা, তাও। এখনও মনে পড়ে, আসার দিনটা ছিল ৬ অগস্ট। ছোট শহরে মানুষ হওয়া গোবেচারা বড় ছেলেকে কলকাতার হস্টেলে একা ছেড়ে আসতে বাবার দুশ্চিন্তা বুঝতে পারছিলাম। মনে মনে একটু বিরক্তও হচ্ছিলাম! এত বড় ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগের কারণটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কলকাতার রাস্তা সড়গড় করানোর জন্য বাবা কলকাতার একটা ম্যাপ আর একটা বাস রুটের বই আমাকে কিনে দিয়েছিলেন। অনেক বছর পর, যখন এই লেখা লিখছি, আমার ঘুমন্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে ২১ বছর আগের এক মধ্যবিত্ত বাঙালি প্রৌঢ় বাবার উদ্বেগটা যেন অনুভব করতে পারছি। এই কলকাতা শহরে বসেই। সেই ম্যাপ আর বাস রুটের বই এখনও আমার কাছে আছে। তবে বইতে দেওয়া বাস রুটগুলোর মধ্যে বেশ কিছু পাল্টে গিয়েছে বা স্রেফ উঠে গিয়েছে।

আমাকে কলেজে ভর্তি করে, হস্টেলে রেখে বাবা তো চলে গেলেন। ঘটনাচক্রে সে দিনটা ছিল আমার জন্মদিন। কলকাতায় আমার একা জীবন শুরু করার প্রথম দিনও বটে। আক্ষরিক অর্থেও সে দিনটা আমার নবজন্ম, আমার ‘আমি’ হয়ে ওঠার শুরু।

আমার হস্টেলের ঘর থেকে নির্মীয়মান দ্বিতীয় হুগলি সেতু দেখা যেত। আমি কলেজে পড়তে পড়তে সেই ব্রিজ তৈরির কাজ শেষ হল। কলেজে পড়তে পড়তেই থোড়-বড়ি-খাড়া দূরদর্শনের জায়গায় কেব্‌ল টিভি এল। এল সুপারহিট মুকাবলা। এই সব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমার চির চেনা শহরটারও পরিবর্তন হতে হতে শেষমেশ ‘পরিবর্তন’ শব্দের মানেটাই একটুখানি পরিবর্তিত হয়ে গেল যেন।

ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম শনি বার ক্লাসের পর বেলেঘাটায় দাদুর বাড়ি যাব বলে বেরিয়েছি (সে দিন আবার কী উপলক্ষে কলেজে রাজ্যপাল এসেছিলেন), থার্ড ইয়ারের দাদা বললেন— ‘‘আমি ও-দিকেই যাব। যমুনায় ‘ব্লু লেগুন’ দেখে এক সঙ্গে যাই চল। তবে দাদুকে সিনেমা দেখার কথা বলা চলবে না। বলবি রাজ্যপালের বক্তৃতা শুনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।’’ অতএব জীবনে প্রথম বড়দের সিনেমা দেখলাম। তার পর ইন্টারভ্যালের সময় লাগোয়া স্টল থেকে অন্য রকম খেতে কী একটা রোল খেলাম। তার পর বাসে করে যেতে যেতে থার্ড ইয়ারের দাদা একটু ইতস্তত করে শুধোলেন— ‘‘গরু আগে কখনও খেয়েছিস?’’ ও হরি! তাই অন্য রকম খেতে লাগছিল। মনে মনে আমার স্বর্গীয় বৈষ্ণব প্রপিতামহের কাছে ভুরি ভুরি ক্ষমা চেয়ে নিলাম। একই দিনে জীবনে প্রথম বার বেশ কয়েকটা নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে গেল। তাও এই কলকাতা শহরের দৌলতেই।

গল্প তো অনেক। সব বলতে চাইলে কখনই শেষ হবে না। দোলের দিন সিদ্ধি খেয়ে বেসামাল হওয়া মনে পড়ে। মনে পড়ে শীতের এক বিষণ্ণ বিকেলে হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে শেষ ট্রাম যেতে দেখা। চাকরি থেকে প্রথম বার ছাঁটাই হওয়া। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে রাতভর হুল্লোড়। বছরের শেষ দিনে গঙ্গায় জাহাজের ভোঁওওও...

আর হ্যাঁ, দশ বছরের দাম্পত্যের মাথায় গিন্নির কুবুল করা, আমাকে বিয়ে করার একটা বড় কারণ আমার কলকাতায় থাকা।

আসলে এই শহরের মধ্যে চিবিয়ে ফেলে দেওয়া চিউয়িংগামের মতো একটা ব্যাপার আছে, টেনে ধরে রাখতে চায়, সহজে ছাড়ে না। তা না হলে, চেন্নাই থেকেই ফিরি বা আমেরিকা থেকে, প্রত্যেক বারই প্রথম বারের মতো সেই রূপোলি ফিতে জড়ানো সবুজ কম্বল কিংবা কার্পেট দেখতে পাই কেন?

আসলে সেই কম্বলটা আমাকে জড়িয়ে আছে, না আমিই সেই জাদু কার্পেট হয়ে গিয়েছি, বলা খুব মুশকিল। জানতেও চাইনা।

 

ত্রিপুরার আগরতলায় জন্ম। শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ১৯৯৭-তে মাইনিং নিয়ে স্নাতক। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় চাকরি। বই পড়া এবং কার্টুন আঁকার পাশাপাশি মেয়ের সঙ্গে খেলতে ভাল লাগে।