শিল্পীকে নিয়ে স্মরণ-অনুষ্ঠান

সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ বা ‘অবাক পৃথিবী’র মতো কবিতায় তাঁর দেওয়া সুর আজও আমবাঙালি গুনগুনিয়ে ওঠে। সলিল চৌধুরীর জন্ম ১৯২৫-এর ১৯ নভেম্বর। ছেলেবেলাটা অসমের চা বাগানে কাটলেও, কোদালিয়ায় মামাবাড়িতে থাকার সময়ই তিনি বাঁশি, দোতারা ও একতারা বাদনে পারদর্শী হয়ে ওঠেন, সঙ্গে চলতে থাকে সংগীতচর্চাও। পরে বেহালা, পিয়ানো ও এস্রাজ বাজানো শিক্ষাও করেন। পড়াশোনা হরিনাভি স্কুল এবং বঙ্গবাসী কলেজে। কলেজজীবনে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। সেই সময় থেকেই কৃষক আন্দোলন ও গণআন্দোলনের উপর গান লেখা শুরু করেন সলিল। তখন প্রত্যেকটি মিটিং-মিছিলের জন্য শুধু গান লেখাই নয়, সুর দেওয়ার সঙ্গে গাইতেনও। ১৯৪৪-এ ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেন। ‘যখন প্রশ্ন ওঠে ধ্বংস কি সৃষ্টি’, ‘হেই সামালো ধান’, ‘ঢেউ উঠেছে কারা টুটেছে’, ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানগুলো তো আজ এক একটি মাইলস্টোন! মাত্র কুড়ি বছর বয়সে লিখেছিলেন ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’। একেবারে দেশি সুর থেকে মার্গীয় সুর, পাশ্চাত্যের লৌকিক বা ক্লাসিকাল সংগীতের চলন নিয়ে তিনি তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন, গান বেঁধেছেন অনেক ভাষায়। বিমল রায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৫৩-তে মুম্বইতে গিয়ে ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিতে সুর করে সংগীত পরিচালক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এ ছাড়া ‘মধুমতী’, ‘জগতে রহো’, ‘বরাত’, ‘পরখ’ ‘নোকরি’ প্রভৃতি ছবিগুলোর সুর তাঁকে সম্মানের শিখরে পৌছে দেয়। তাঁর মৃত্যুদিনটিকে স্মরণে রাখতে গোর্কি সদনে ‘সলিল চৌধুরী ফাউন্ডেশন অব মিউজিক’ আয়োজন করেছে তিন দিনের প্রদর্শনী ও টক শো (৫-৭ সেপ্টেম্বর, বিকেল ৩-৮টা)। প্রদর্শিত হবে তাঁর আঁকা কিছু ছবি, তাঁর লেখা ও তাঁকে লেখা বিশিষ্টজনের চিঠিপত্র এবং দুর্লভ আলোকচিত্র, গানের পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি। প্রথম দিনে টক শো-তে বলবেন সবিতা চৌধুরী, অন্তরা চৌধুরী, সঞ্জয় চৌধুরী, শ্রীকান্ত আচার্য, হৈমন্তী শুক্লা, পণ্ডিত তন্ময় বসু, গৌতম ঘোষ, বনশ্রী সেনগুপ্ত প্রমুখ। দ্বিতীয় দিনে কল্যাণ সেন বরাট ও তাঁর দলের সংগীত পরিবেশন। শেষ দিনে সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করা শিল্পীদের সংগীত। সঙ্গে ডান দিকে গণনাট্য পর্বে সলিল চৌধুরী, বাঁ দিকে তাঁর পাণ্ডুলিপি ও আঁকা ছবি।

 

রাধাকৃষ্ণন

ছাত্রদের প্রতিবাদের মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ ডাকা ভুল হয়েছে উপাচার্যের, স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন অধ্যাপক। পুলিশের ছাত্র পেটানোকে ‘আনপ্রোভোকড অ্যান্ড আনজাস্টিফায়েড’ লিখলেন তদন্ত রিপোর্টে। সরকারি অনুদান বন্ধ করার ভয় দেখালেন চ্যান্সেলার। কাগজে কাগজে তার প্রতিবাদ, গলা মেলালেন অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন, স্বতন্ত্র। সরকারি হস্তক্ষেপ চলবে না। হতে পারত আজকের খবর। না, এ ঘটনা ১৯২৮ সালের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তখন যদুনাথ সরকার, ছাত্রদের প্রতিবাদ ছিল সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে। আর সেই অধ্যাপক সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন। তাঁর শিক্ষক জীবনের কুড়ি বছর, ১৯২১-’৪১, কেটেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সবটাই মধুর ছিল না। কিছু বাঙালি অধ্যাপক আগাগোড়া তাঁর বিরোধিতা করেছেন। প্রবাসীর একাকীত্বও ছিল। তবু দেশে-বিদেশে পড়াতে গিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। তাঁর সেরা বইয়ের অনেকগুলি লেখা কলকাতায়। ‘দ্য ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ভাষণ ও রচনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি ও দুর্লভ ছবি নিয়ে প্রকাশিত হল ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন অ্যান্ড দ্য ইউনিভার্সিটি অব ক্যালকাটা। সম্পাদক সুরঞ্জন দাসের ভূমিকায় রাধাকৃষ্ণনের জীবন ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে।

 

 

ধনঞ্জয়

আধুনিক গান, নজরুলগীতি, পল্লিগীতি, শ্যামাসংগীত, উচ্চাঙ্গসংগীত— গানের বহু ধারাতেই তিনি দক্ষ ছিলেন। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের জন্ম হাওড়ার বালি-তে ১৯২২-এ। ১৯৩৮-এ তাঁর প্রথম গান সম্প্রচারিত হয় আকাশবাণীতে। ১৯৪০-এ পায়োনিয়ার কোম্পানি থেকে তাঁর গানের প্রথম রেকর্ড ‘যদি ভুলে যাও মোরে’ বের হয়। ‘নববিধান’, ‘পাশের বাড়ি’ ‘লেডিজ সিট’ সহ পাঁচটি ছায়াছবিতে অভিনয়ও করেন। তাঁর ৯৫তম জন্মদিন উপলক্ষে ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধে সাড়ে ৫টায় শিশির মঞ্চে ‘ধনঞ্জয় গীতি মন্দির’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা জানাবেন সবিতা চৌধুরী, বনশ্রী সেনগুপ্ত, হৈমন্তী শুক্লা, অরুন্ধতী হোমচৌধুরী প্রমুখ। ‘ধনঞ্জয় স্মারক পুরস্কার’ দেওয়া হবে সলিল চৌধুরীকে (মরণোত্তর)। জীবনীগ্রন্থ অনন্য ধনঞ্জয় (দে’জ, ২য় সং) প্রকাশিত হবে।

 

 

বক্তৃতা

‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার এই লাইনটি তাঁর মধ্যে বেঁচে-থাকা রোম্যান্টিক বিদ্রোহী মানুষটিকে মনে পড়িয়ে দেয়। সেই কবিসত্তার সূত্র ধরেই সারা বিশ্বের কয়েক জন প্রতিবাদী সাহিত্যব্যক্তিত্বের কথা বলবেন চিন্ময় গুহ, কৃত্তিবাস আয়োজিত ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা’য়। সুনীলের জন্মদিন উপলক্ষে এ আয়োজনে তাঁর কবিতা পাঠ করবেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও দেবশঙ্কর হালদার। সঙ্গে শ্রাবণী সেন ও কালিকাপ্রসাদের গান। ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধে সাড়ে ৬টায় রোটারি সদনে। বলাকা সাহিত্য পত্রিকা ও সাহিত্য অকাদেমির আয়োজনে অনুষ্ঠান— ‘প্রসঙ্গ সুনীল: কথায় কবিতায়’, ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় সাহিত্য অকাদেমি সভাঘরে। থাকবেন স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় পবিত্র সরকার রামকুমার মুখোপাধ্যায় সাধন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

১৯৬৫ সালে পাঠভবন স্কুল যাঁদের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি হয়, উমা সেহানবীশ তাঁদের অন্যতম। তাঁকে মনে রেখে ‘পাঠভবন প্রাক্তনী’ শুরু করেছে ‘উমা সেহানবীশ মেমোরিয়াল ক্লাসরুম সিরিজ’— যেখানে বলবেন বিদ্যায়তনের কৃতি প্রাক্তনীরা। সম্প্রতি বললেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মৈত্রীশ ঘটক। দারিদ্র দূরীকরণের প্রচলিত নীতিগুলির নিরিখে এক নতুন প্রস্তাবিত নীতি— সর্বজনীন ন্যূনতম আয়— যাতে সমস্ত নাগরিককে একটা ন্যূনতম আয় নিয়মিত দেওয়া হবে, তার আপেক্ষিক ভালমন্দ আলোচনা করলেন স্কুলের বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে।

 

 

অভিনব

কলকাতার মেয়ে, সাখাওয়াত-সিটি কলেজ হয়ে এনআইএফটি-র প্রাক্তনী কুহেলি রায় ভট্টাচার্য ফ্যাশন ডিজাইনিং-এ ইতিমধ্যেই নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি গুজরাতের প্রত্যন্ত গ্রামে আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া মহিলাদের নিয়ে তৈরি করেছেন ‘কুত্‌র মহামায়া’(www.mahamayacelestial.com) সংস্থা। এমব্রয়ডারি করিয়ে দুঃস্থ মহিলাদের স্বাবলম্বী করেছেন, এই জামাকাপড় বিক্রির লভ্যাংশ থেকে তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। পঞ্চাশ জন ছাত্রছাত্রীর খরচ জুগিয়ে শুরু করেছিলেন, এখন তা বেড়ে হয়েছে আড়াইশো। এ বার তাঁর বাংলার বালুচরি, কাঁথাস্টিচের সঙ্গে রাজস্থানের এমব্রয়ডারির মিশ্রণে তৈরি নতুন জামাকাপড় নিয়ে ‘দ্য থার্ড আই/ফিউশন ইন ফ্যাশন’ প্রদর্শনী আইসিসিআর-এ, ৯-১১ সেপ্টেম্বর, ৩-৮টা।

 

 

রঙিলী

হেপাজতে নিখোঁজ জাহাঙ্গীর-এর লেখক রঙিলী বিশ্বাস-এর নিজস্ব ভাষাশৈলী ও ভাবনার বিস্তার তাঁর গল্পেও। বেরচ্ছে তাঁর নতুন গল্প-সংকলন গণশুনানির পরে (দে’জ)। আমাদের চারপাশের ভিন্ন অঞ্চল, ভিন্ন ভাষা-উপভাষা, প্রকৃতির অনুপুঙ্খ বর্ণনার বিপুল আয়োজনের মাঝেও বৃহৎ অর্থে অত্যন্ত রাজনৈতিক এই লেখাগুলির কেন্দ্র-এষণা একটাই— জীবনযুদ্ধে অধিকাংশ সময় ধ্বস্ত ও পরাভূত যে মানুষেরা উত্তীর্ণ হয় এক সন্ত-সত্তায়— তাদের অন্বেষণ। ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধে ৬টায় মহাবোধি সোসাইটি হলে বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করবেন শঙ্খ ঘোষ। রঙিলীর গল্প নিয়ে আলোচনায় দেবেশ রায় নলিনী বেরা ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় স্বপন পাণ্ডা। বইটির আখ্যানাদিতে যেহেতু রাঢ় বাংলা, সে অঞ্চলের গান গাইবেন উত্তম দাস এবং ত্রিনাঙ্কা রায়।

 

 

নাটক

ভদ্রকালীতে ১৯৭৬ সালে সুজিত, প্রদীপ, শঙ্কর, অম্বর, শিবশঙ্কর, রঞ্জন, মিলন— সাত নাট্যকর্মীর হাত ধরে জন্ম ‘থিয়েটার প্রসেনিয়াম’-এর। উৎপল দত্তের উৎসাহ ও পরামর্শে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যন্ত্রণা, ভালবাসা, আনন্দ ও দৈনন্দিন লড়াইয়ের কথাকে তুলে ধরে নাটক। কেবল মঞ্চে নয়, প্রয়োজনে পথ-নাটিকা। ক্রমে লোকনাট্যের উপাদান যুক্ত করে আধুনিক নাটক। এসেছে নানা সাফল্য। সংস্থার ৪০ বছর পালিত হবে বরানগরের রবীন্দ্র ভবনে ১০-১১ সেপ্টেম্বর। অম্বর চম্পটির নির্দেশনায় ‘শুকশারির বিবেক কথা’, ‘স্বপ্ন দেখার গল্প’ ও ‘রাম-কানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’ ম়ঞ্চস্থ হবে। অন্য দিকে, মিনার্ভা রেপার্টরির সর্বক্ষণের অভিনেতারা নিজেদের উদ্যোগে নির্মাণ করে বিভিন্ন ‘কর্মশালাভিত্তিক’ প্রযোজনা। তাদের ‘তক্ষক’, ‘য্যায়সা কা ত্যায়সা’, ‘মৃচ্ছকটিক’ যথেষ্ট প্রশংসিতও হয়েছে। এ বার তাদেরই নতুন প্রযোজনা ‘পাঁচের পাঁচালী’ মিনার্ভা-য়, ১০ এব‌ং ১৮ সেপ্টেম্বর, সন্ধে সাড়ে ৬টায়। নাটকটি পাঁচটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিন্ন স্বাদ ও গল্পের সমাহার। ইতিমধ্যেই এর চারটি মঞ্চসফল প্রযোজনা হয়েছে।

 

 

সুরঙ্গমা

১৯৫৭-র ১৬ অগস্ট নেতাজির বাসভবনে পথ চলা শুরু। একমাত্র এখানেই সংগীতশিক্ষার্থীদের হারমোনিয়াম, এসরাজ বাজিয়ে গান শেখানো হয় না, তানপুরাই মাধ্যম। বিশ্বভারতী সংগীতভবনের অধ্যক্ষ পদের দায়িত্ব পালনের শেষে আচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার কলকাতায় এসে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুরঙ্গমা’— রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায়তন। তিনি গুরুদেবের নৃত্যগীতির ধারাটিকে সঞ্চালিত করেন কলকাতায় তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। তাঁর প্রদর্শিত পথে অবিচল থেকে আজও সুরঙ্গমায় চলছে রবীন্দ্রসংগীত ও নৃত্যের চর্চা। এ বার ৫৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধে ৬টায় রবীন্দ্রসদনে সুরঙ্গমার শিল্পীবৃন্দ ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করবেন।

 

মাতৃরূপেণ

শরৎ। আনন্দের বাড়ি ফেরা। সাজিয়েছ ঘাসের ডালি অনেক দূর। বসিয়েছ লাল বাড়ি, লাল কাঁকরের পথ। ফিরিয়ে এনেছ নীলাকাশ।  যে দেখে জানালা থেকে তার মনে তো রয়েছে ভার, রজনীর কালি। সংসারবেদনা কম নয় তো, তবু দেখা শরৎ হঠাৎই আসে। রৌদ্র-মেঘ সজল আয়োজনের ডালি। বোধিত শরৎ-প্রাণ, তাকে দেখি। রিক্ত ঘরে দুঃখী ঘরে তার বরণ,— পাঠক, এমনই ভাবেন কবি। এমনই ভাবিয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই বোধ করি মেঘ ও রৌদ্র নাম্নী এক ছোট গল্পের আয়োজন করিয়াছিলেন শরৎ ঘিরিয়া। শরৎ আসিল। শরৎ আসিলে মনে হয়, হ্যাঁ, এই তো সময়। মা আসিতেছেন। মায়ের পাদপদ্ম পড়ে কোথায়? উত্তরদাতা কহিল— কেন, কুমোরটুলি অথবা পটুয়াপাড়া। অথবা, যেখানে যেখানে মা চিন্ময়ী হইতে মৃন্ময়ী রূপ ধারণ করিবেন, সেইখানেই তাঁর চরণধূলি এ মর্ত্যয়  পড়ে। অতএব পাঠক, আমরা চলিলাম কুমোরটুলি। কিন্তু হায়! কুমোরটুলি দেখিয়া মনে পড়ে— এ তো কেন্দ্রীয় কৃষি সমবায় হইবার কথা ছিল। কথা ছিল কুমোরটুলির পরিবর্তনের। নাঃ, তা হয় নাই। কুমোরটুলি আজও একই রকম রহিয়া গিয়াছে। এখনও মূল এলাকায় দাঁড়াইলে মনে হয়— ওই বুঝি নেতাজি আসিতেছেন ভারতমাতার মূর্তির  বরাত দিতে, ওই বুঝি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় আসিয়াছেন দেবী দুর্গার মূর্তি দেখিতে। কিন্তু তা নহে, কী করিবেই বা হইবে? এ বারের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি বর্ষায় গঙ্গা হইতে সমস্ত নদ-নদী যে রূপ ধারণ করিয়াছে, তাহাতে এঁটেল মাটি তুলিয়া আনা শুধুমাত্র কষ্টকর নহে, প্রাণান্তকরও বটে। বোঝার ওপর শাকের আঁটির ন্যায় নৌকাগুলিও মাটি বহন করিতে চাহে না। এক লপ্তে মাটি আনিবার জন্য যে পরিমাণ অর্থ তাহারা পাইয়া থাকে, তাহার চাইতে ইলিশ ধরিবার জন্য সে নৌকা প্রেরণ করিলে অনেক বেশি রোজগার হইয়া থাকে। এত সবের পরেও যে পরিমাণ মাটি মূর্তির নিমিত্ত আসিয়া পৌঁছয়, তাহা লইয়া যায় বড় বড় ঘর (স্টুডিয়ো)-এর শিল্পীর লোকজনেরা। ফলে কুমোরটুলি বা পটুয়াপাড়াও এখন দ্বিধা বিভক্ত ধনী-দরিদ্র শিল্পীদের জন্য। বিদেশে যে সমস্ত মূর্তি প্রেরণ করা হইয়া থাকে, তাহারা ইতিমধ্যেই বিমান ধরিয়াছে। তাহা ব্যতীত তৈয়ার করা হইয়া থাকে খাইবার গ্লাস সহযোগে। কিন্তু এতদ্দেশীয় প্রতিমার মূল ছন্দ— মাটি। শুধুই গাঙ্গেয় এঁটেল মাটি যথেষ্ট নহে, তাহার সহিত আরও নানাবিধ উপকরণের প্রয়োজন। যাহার মধ্যে রহিয়াছে খড়কুচো এবং দেবীর কাঠামো ধরিয়া রাখিবার নিমিত্ত বাঁশ। খড়কুচো মাখিতে হইবে মাটির সহিত আর কাঠামো ধরিয়া রাখিবে দেবীকে। পাঠক, আমরা আরও বিস্তারিত যাইব পরের সপ্তাহে।

 

 

শিল্পী

মায়ের হাতে তৈরি মাটির প্রদীপ লক্ষ্মীপূজার আগে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হত। চোখের সামনে গড়ে ওঠা এই রীতি থেকেই শিল্পের পরম্পরায় তৈরি হয় আগ্রহ। আর পূজোপার্বণ বা আচার থেকেই সমৃদ্ধ হয়েছে লৌকিক চেতনা। তারপর ইতিহাসের বই থেকে শিল্পীর কলমে নুরজাহান উঠে আসে অঙ্কের খাতায়! এভাবেই শিল্পের সঙ্গে গড়ে ওঠে প্রথম সম্পর্ক। ‘আমার কাজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকি আমি, খুঁজে পাও!’ – এমনটিই বলতেন তিনি। বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালে ১৯২৪-এ শিল্পী ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্মের জন্ম। কলকাতার আর্ট কলেজে ভর্তি হন ১৯৪১এ, এখানে মুকুল দে তখন অধ্যক্ষ। পেয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ এবং সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য। এখানে তিনি ভারতীয় রীতিতে শিল্পশিক্ষা করতে থাকেন। কলেজে থাকাকালীন সরকারি বৃত্তি পেয়ে নন্দলাল বসুর পরামর্শে টেরাকোটা নিয়ে কাজ করবার জন্য তিনি চলে যান ইলামবাজারে। লৌকিক কাজের শিক্ষা সেই সময়েই তিনি অর্জন করেছিলেন। শিক্ষা শেষে শান্তিনিকেতনে বিনয় ভবনে তখন কাজ করছেন, সেই সময় খবর আসে তৎকালীন প্রিন্সিপাল রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অধীনে আর্ট স্কুল তখন কলেজে পরিণত হয়েছে। সেখানে শিক্ষক নেওয়া হবে। দরখাস্ত করে নন্দবাবুর ইচ্ছেয় তিনি ১৯৫১-য়  যোগ দেন কলকাতার আর্ট স্কুলে।  তিনি এখানে ছিলেন একটানা ১৯৮৯ পর্যন্ত। বেঙ্গল স্কুলের অন্যতম প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। ওয়াশ, টেম্পারা ছাড়াও ম্যুরালচিত্র রচনায় তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ভারতীয় রীতি মেনে  পৌরাণিক বা ইতিহাসধর্মী নানা কাহিনী উপজীব্য হয়েছে ওঁর ছবিতে। দিল্লির পার্লামেন্টে ভবনে রয়েছে ‘পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ও পতঞ্জলি’ এবং ‘হেলিওডরাস’ শীর্ষকে ওঁর দুটি বিখ্যাত ম্যুরালচিত্র। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতায় তিনি তৈরি করেছেন আজকের অনেক সুযোগ্য ছাত্রছাত্রীকে। ২০১৪-য় চারুকলা উৎসবের মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে ওঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় জীবনকৃতি সম্মান। একই সম্মান জানানো হয়েছিল আর্ট কলেজের ১৫০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে। ওঁর কাজ নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে। নানা সংগ্রহে রয়েছে শিল্পীর কাজ। অসংখ্য কাজের স্মৃতি রেখে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি চলে গেলেন সম্প্রতি। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টেয় ধর্মতলার আর্ট কলেজের অবন হলে আয়োজিত হয়েছে একটি স্মরণসভার। এখানে উপস্থিত থাকবেন শিল্পীর কাছের মানুষজন, গুণমুগ্ধ এবং ছাত্রছাত্রীরা। সঙ্গের ছবি গোপী দে সরকার।

 

সাংবাদিক

চিনে কেমন আছে তিব্বতিরা? প্রায়-অজানা এই প্রশ্নের বৃত্তে আলো ফেলার কাজটা করেছেন বেজিং-প্রবাসী মার্কিন সাংবাদিক জোসেলিন ফোর্ড। এক তিব্বতি মহিলা আর তার দশ বছরের সন্তানের জীবন নিয়ে তিন বছর ধরে তৈরি করেছেন ডকুমেন্টারি ছবি, ‘নো হোয়্যার টু কল হোম: আ টিবেটান ইন বেজিং।’ বেজিং থেকে তিব্বতের গ্রাম, এক মহিলার জীবন ও যাত্রার ছবি ধরা রয়েছে এই ফিল্মে।  ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিটি বুধবার (সেপ্টেম্বর ৭) দেখানো হবে ম্যাক্সমুলার ভবনে। ছবিটি যেমন উদ্বাস্তু তিব্বতিদের প্রতি বেজিং-এর চিনেদের তাচ্ছিল্যের মনোভাব ধরা পড়েছে, তেমনই তিব্বতি সমাজে মেয়েদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলাও স্পষ্ট হয়েছে। চিনেও সমাদৃত হয়েছে ছবিটি, দেখানো হয়েছে শিনহুয়া সংবাদ সংস্থার দফতরে, বেজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। বুধবার ম্যাক্সমুলার ভবনে ছবির প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকবেন জোসেলিনও। তাঁর কর্মজীবন বিচিত্র। নব্বইয়ের দশক কাটিয়েছেন জাপানে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংযুক্ত সাংবাদিকদের দলে তিনিই প্রথম বিদেশি সাংবাদিক। ২০০১ সাল থেকে রয়েছেন চিনে। মার্কিন রেডিওর জন্য ব্যবসা-সংক্রান্ত খবর করেন বেজিং থেকে। চিনে বিদেশি সাংবাদিকদের সংগঠনের অন্যতম নেত্রী জোসেলিন। সাংবাদিক ও সংবাদের স্বাধীনতা নিয়ে ক্রমাগত লড়াই চলে তাঁর। কলকাতার পরে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখানো হবে তাঁর ছবিটি।