কত যে কালী কলকাতায়। এমনটা কোনও শহরে নেই। শাক্তধর্মের এমন জনপ্রিয়তা বঙ্গদেশ ছাড়া কোথাও মিলবে না। শাক্ত বিশ্বাস মতে, শাক্তদেবী কালিকা বা কালী দশম বিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা। বিশ্বসৃষ্টির আদিকরণ তিনি। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহাময়ী। তন্ত্র ও পুরাণে কালিকার নানা রূপভেদ। সেই অনুসারে দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালী।

বাংলা জুড়ে অবশ্য তার নানা নাম। কলকাতার উত্তরে দক্ষিণেশ্বরে তিনি মা ভবতারিণী আবার দক্ষিণের কালীঘাটে দেবী কালিকা। আদ্যাপীঠে আদ্যাকালী, কাশীপুরে চিত্তেশ্বরী, ঠনঠনিয়ায় সিদ্ধেশ্বরী, বউবাজারে ফিরিঙ্গি, কেওড়াতলায় শ্মশানকালী, টালিগঞ্জে করুণাময়ী, নিমতলায় আনন্দময়ী। কালীময় কলকাতার কথা কয়েক আঁচড়ে আঁকা রইল এখানে। অবশ্যই সবার কথা বলা গেল না।

প্রথমে আমরা অল্পকথায় জেনে নিই কালীর অষ্টরূপের মাহাত্ম্য। তার পর কলকাতার পরিচিত স্বল্প পরিচিত কিন্তু ঐতিহ্যপূর্ণ কালীস্থানের কথা বলা যাবে।

 

দক্ষিণাকালী: দক্ষিণ দিকে যমের অবস্থান। কালীর ভয়ে সে পালিয়ে বেড়ায়। তাই এ কালী দক্ষিণা। তিনি করালবদনা, মুক্তকেশী ও চতুর্ভুজা। গলায় মুণ্ডমালা। বাম অধোহস্তে অভয়, ঊর্ধ্বহস্তে বরমুদ্রা। গাত্র শ্যামবর্ণ। তাই তিনি শ্যামাও বটে। দিগম্বরী। কর্ণভূষণ দুই শবশিশু। উন্নত স্তন যুগল। পরণে নরহস্তের কটিবাস। দক্ষিণ পদ শিবের বক্ষে স্থাপিত ও দক্ষিণামুখী।

 

শ্মশানকালী: শ্মশানকালী মহাশক্তির অন্যরূপ। তিনি অঞ্জনের মতো কালো অর্থাত্‌ কৃষ্ণবর্ণা। নেত্র রক্তবর্ণ। দেহ অতিশুষ্ক। এক হাতে মদপাত্র, অন্য হাতে নরমাংস। স্মিত আনন দেবী সদা মাংস চর্বণে ব্যস্ত।

 

সিদ্ধকালী: সিদ্ধকালী ব্রহ্মময়ী ভুবনেশ্বরী। দক্ষিণাকালীরই আরেক রূপ। সিদ্ধকালী মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান--  আরাধ্যাদেবী হিসাবেই পরিচিতা। ক্রিনয়না মুক্তকেশী দেবীর দক্ষিণ হস্তের খর্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে ঝরে পড়ছে অমৃত বাম হাতের মাথার খুলির পাত্রে। দিগম্বরী, নীলোত্‌পলাবর্ণাদেবী তা পানরত।

চন্দ্র ও সূর্য দেবীর কুণ্ডল। বামপদ শিবের বুকে দক্ষিণপদ শিবের দুই উরুর মধ্যস্থলে অধিষ্ঠিতা।

 

গুহ্যকালী: গুহ্যকালীর অপর নাম আকালী। মহাকালসংহিতার মতে, তাঁর মতে বিদ্যা ব্রহ্মাণ্ডে কারও নেই। সাধক আরাধ্য এই কালীর রূপ গৃহস্থদের কাছে অপ্রকাশ্য। ভয়ঙ্কর রূপকল্পটি এই রকম, গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ মেঘের মতো। লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা। পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা গলায়। ললাটে অর্ধচন্দ্র। গলায় নাগহার, মাথায় সহস্রফণা অনন্তনাগ, চার দিকে নাগফণায় বেষ্টিত। নাগাসনে উপবিষ্টা, বাম কঙ্কণে সর্পরাজ তক্ষক এবং দক্ষিণ কঙ্কণে নাগরাজ অনন্ত। বামে বত্‌স্যরূপী শিব। গুহ্যকালী শব মাংস ভক্ষণে অভ্যস্ত। নারদ ও অন্য ঋষিরা শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন। তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা, সাধকের অভিষ্ট ফলদায়িনী।

 

ভদ্রকালী: যে কালী ভক্তদের কল্যাণ বিধান করেন তিনিই ভদ্রকালী। কালিকাপুরাণের মতে ভদ্রকালী গায়ের রং অতসী ফুলের মতো। মাথায় জটাজুট, কপালে অর্ধচন্দ্র। তন্ত্রমতে তিনি মসীর মতো কৃষ্ণবর্ণ। মুক্তকেশী, কোটরাক্ষী, সর্বদা জগত্‌কে গ্রাস করতে উদ্যত। হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো পাশ।

 

চামুণ্ডাকালী: চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুর বধের জন্য দুর্গার ভ্রূকুটি-কুটিল ললাট থেকে এই চামুণ্ডাকালীর সৃষ্টি বলে মার্কন্ডেয়পুরাণ ও দেবীভাগবত পুরাণের মত। চামুণ্ডার গায়ের রং নীল পদ্মের মতো, পরণে ব্যাঘ্রচর্ম, অস্থিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। অস্ত্র দণ্ড ও চন্দ্রহাস। দুর্গাপুজোয় সন্ধিপুজোর সময় চামুণ্ডার পুজো করা হয়। মন্দিরে বা বাড়িতে আলাদা করে চামুণ্ডা পুজোর রীতি বঙ্গদেশে তেমন দেখা যায় না। তবে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চামুণ্ডার মন্দির রয়েছে।

 

মহাকালী: সংস্কারকারিণী কালরূপ মহাদেবী হলেন মহাকালী। শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুসারে মহাকালীকে আদ্যাশক্তি দশভূজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তন্ত্রসার গ্রন্থ অনুসারে তিনি আবার পঞ্চদশ নয়না। মহাকালীর দশ হাতে যথাক্রমে খড়গ, চক্র, ধনুক, বাণ, শঙ্খ, শূল, লগুড়, ভূশান্তি ও নরমুণ্ড। নীলকান্তমণিকুল্য প্রভাবিশিষ্টা সর্বালঙ্কারে সুশোভিতা এই দেবী। মধু ও কৈটভ নামক অসুরদ্বয়কে বিনাশ করার জন্য ব্রহ্মা মহাকালীর ধ্যান করেছিলেন।

 

শ্রীকালী: পুরাণ মতে শ্রীকালী দারুক নামে এক অসুরকে দমন করেন। এই কালীর গাত্রবর্ণ কালো। কারণ হিসাবে বলা হয় শ্রীকালী মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করায় তাঁর কণ্ঠের বিষে কালীর গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ হয়। শিবের মতোই শ্রীকালী ত্রিশূলধারিণী ও সর্পযুক্তা। কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কালট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাঁদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়্গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

 

কালীঘাটের দেবীকালিকা: কালীঘাটের মন্দিরের গুরুত্ব বেড়েছে প্রকৃতপক্ষে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। কালীঘাটে দেবীর চারটি আঙুল পড়েছিল। দেবী কালিকার ভৈরব নকুলেশ্বর। কিংবদন্তী কাশীর মতো পুণ্যক্ষেত্র কালীঘাটে কীটপতঙ্গ মরলেও সঙ্গে সঙ্গে তারা মুক্তি পেয়ে যায়। এই কালীপীঠ গড়ে ওঠার পিছনে নানা কাহিনির জাল বিস্তৃত। এমন একটা কাহিনি হল:

যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত শ্রীবসন্ত রায় একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময় দেবীর সেবায়েত ছিলেন ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী। তিনি ছিলেন অপুত্রক। তাঁর দৌহিত্র হালদাররাই বর্তমানে কালীঘাটের বিখ্যাত বংশ। মন্দিরের পূজা এখনও করে চলেছেন তাঁরা। বর্তমান মন্দির নির্মাণ হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। শোনা যায় সাবর্ণ চৌধুরীর পরিবারের সন্তোষ রায় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলার নিজস্ব ঘরানার চার চালা এবং তার উপর আর একটি ছোট চারচালার শিখর সমেত মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাঁর পুত্র রামনাথ রায় ও ভ্রাতষ্পুত্র রাজীবলোচন রায় ১৮০৯ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তী কালে আন্দুলের জমিদার কাশীনাথ রায় নাটমন্দির গড়ে দেন। নহবত্‌খানা ও দুটি ভোগের ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন গোরক্ষপুরের টিকা রায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও মন্দিরের জন্য দুশো বিঘা জমি দান করেছিলেন। কালীঘাটের দেবীকালিকার রূপ মাহাত্ম্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।

কালীঘাটের মূল পূজা মূলত আটটি। রক্ষাকালী পুজো, স্নানযাত্রা, জন্মাষ্টমী, মনসাপুজো, চড়ক, গাজন ও রামনবমী। কালীপুজোর রাতে দেবীকে পুজো করা হয় লক্ষ্মীরূপে। কালী-শ্যামা নন দীপাবলিতে আরাধিত হন লক্ষ্মী।

 

দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী—এ কথিত রয়েছে এক বার কাশীযাত্রার আগের দিন ভোর রাতে জানবাজারের রানি মা রানি রাসমণির স্বপ্নে দেখা দিলেন মা জগদম্বা। রানিকে বললেন গঙ্গার পূর্ববর্তী তীরে মন্দির স্থাপনা করতে। কাশী যাওয়ার দরকার নেই। সেই স্বপ্নাদেশ শিরোধার্য করে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে ছ’কিলোমিটার দূরে ভাগীরথীর তীরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেমস হেস্টির কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমি ৬০ হাজার টাকায় কিনলেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন গড়ে তুললেন সাদা রঙের নবরত্ন মন্দির। কাজটা সহজ ছিল না। কৈর্বত্য হরেকৃষ্ণ দাসের মেয়ে মন্দির গড়বে। এ ‘আস্পর্দা’ সে দিন মেনে নিতে পারেননি কুমারহট্ট হালিশহরের ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা। শেষপর্যন্ত সব বাধা দূর করে প্রতিষ্ঠিত হল কষ্ঠিপাথরের দেবীমূর্তি। সাধ করে রাসমণি তার নাম রাখলেন ভবতারিণী। মন্দিরের মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ প্রস্তরাবৃত। সোপানযুক্ত উঁচুবেদী। বেদীর উপর সহস্র দল রৌপ্যপদ্ম। তার উপর দক্ষিণে মাথা ও উত্তরে শয়ান শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি। মহাদেবের বুকের উপর ত্রিনয়নী ভবতারিণী রঙিন বেনারসি ও মহামূল্যবান রত্নঅলঙ্কারে ভূষিতা। ১৮৫৭-৫৮ খ্রিস্টাব্দে দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে পুজোর দায়িত্ব পান শ্রীরামকৃষ্ণ। এই মন্দিরই এই যুগাবতারের সাধনপীঠ।

 

ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালী: বর্তমান মন্দিরটি তৈরির অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিদ্ধেশ্বরী কালী এমন একটা মত প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি, উদয়নারায়ণ-ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক আনুমানিক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রূপের কালীর্মূতি গড়েন। তখন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ধনী ব্যক্তি কালীমন্দির ও পুষ্পেশ্বর শিবের আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন। পুজোর ভারও নেন তিনি। কার্তিক অমাবস্যায় আদিকালীর পুজো ছাড়াও জৈষ্ঠ্যমাসে ফলহারিণী এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীর পুজো হয়।

 

কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা: গভীর জঙ্গল ঘেরা এক স্থান। ভাগীরথীর তীরে। সে জঙ্গলে বাস দুর্ষর্ধ ডাকাত দলের। সেই ডাকাত দলের পাণ্ডা রঘু ডাকাত। এই ডাকাত সর্দারের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় চিত্তেশ্বরী। নিয়মিত নরবলি হত এখানে। সর্দারের মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন রামশরণ সিমলাই নামে এক ব্রাহ্মণ। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টারি রোড বা বর্তমানে খগেন চ্যাটার্জি রোডে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। রামশরণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহটি নিমকাঠের রক্তবর্ণা ত্রিনয়নীদেবী চতুর্ভুজা ও সিংহবাহিনী। দেবীর হাত বর, অভয় মুদ্রা, খড়্গ ও কমণ্ডুলে বিভূষিতা। কথিত, রামপ্রসাদ কলকাতা থেকে হালিশহর নৌকাযোগে যেতে যেতে দেবীকে গান শুনিয়েছিলেন, ‘মা তারিণী শঙ্কর বৈরাগী তোর নাং...।’ মূল মন্দিরটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন হুগলি জেলার মনোহর ঘোষ ওরফে মহাদেব ঘোষ।

 

কাশীপুর আদি চিত্তেশ্বরী দুর্গা: এই দেবীর কাহিনিও প্রায় এক। তবে এখানে ডাকাতের নাম চিতু বা চিত্তেশ্বর রায়। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিতু ষোড়শপচারে দেবীর পুজো করত। আদি চিত্তেশ্বরী বলার কারণ কথিত প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেবীর নামেই জায়গাটির নাম চিত্‌পুর হয়ে ওঠে। এই দেবীও নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। দেবীর বিগ্রহের সঙ্গে রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি। জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন।

 

বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালী: ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে তখন কোথায় কলকাতা কোথায় চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। গভীর জঙ্গল, শ্মশান, অদূরে ভাগীরথী। সেই শ্মশানে ছোট একটি চালা ঘরে প্রতিষ্ঠিত ছিল শিবলিঙ্গ ও দেবীকালিকায় বিগ্রহ। শ্মশানে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেবী ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। কালের বিবর্তনে শহর গড়ে উঠল। জনপদ সৃষ্টি হল। আনাগোনা শুরু হল পতুর্গিজ ও ইংরেজদের। তাদের মধ্যে ছিলেন পতুর্গিজ খ্রিস্টান অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। এই ফিরিঙ্গি কালীভক্তের দৌলতে সিদ্ধেশ্বরী কালী লোকমুখে হয়ে উঠলেন ফিরিঙ্গি কালী। ১৮২০-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন শ্রীমন্ত পণ্ডিত। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার বিগ্রহ ত্রিনয়নী। এই মন্দিরে শিব ও সিদ্ধেশ্বরী কালী ছাড়াও দুর্গা, শীতলা, মনসা ও নারায়ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ও অমাবস্যায় বিশেষ কালীপুজো হয়ে থাকে।

কলকাতার কালী মাহাত্ম্যের এ এক সামান্য অংশ। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ ঐতিহ্যপূর্ণ কালী-মন্দিরের সংখ্যা অন্তত তিন ডজন। রাজ্যে সাধনপীঠ ও সতীপীঠ যোগ করলে সে সংখ্যাটি কমপক্ষে ২২২। এই সংখ্যাটি পরিণত ও জনপ্রিয় কালীমন্দির বা পীঠের। এ ছাড়াও এই শহর ও রাজ্যের নানা প্রান্তে জমিদার ও বনেদিবাড়িগুলিতে রয়েছে বহু কালীমন্দির। কলকাতায় এমনই বিখ্যাত ছয় বনেদিবাড়ি হল, হাটখোলার রামচন্দ্র দত্ত। হাটখোলারই জগত্‌রাম দত্ত। দর্জিপাড়ার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়ি। সিমলার রামদুলাল সরকার ও সিমলারই তারক প্রামাণিকের বাড়ি।