মানুষের আসল পরিচয় তার ভালবাসায়। তার অকারণ হিংসায় নয়। এ জন্যই হাজার বছর আগের কোনও নিধন-ইতিহাসকে অনায়াসে ছাপিয়ে যায় আরও পুরনো একটি সরল রূপকথা। তা এ কারণেই যে, অস্ত্রাঘাতে চুরমার একটি করোটির চেয়েও বেশি নিবিড় করে আমরা আঁকড়ে ধরতে চাই অভিমানে খানখান একটি আহত হৃদয়। বাস্তবের জাল ছিঁড়ে এ জন্যই মানুষ বরাবর ওড়াতে চেয়েছে কল্পনার আপাত-অসম্ভব দুটি রঙিন পাখাকে।

ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার গত তিন দশকের আঙিনায় অমনই এক আপাত-অসম্ভব কল্পজগতের সুলুক-সন্ধান মেলে বর্তমান পৃথিবীর সমস্ত অস্থির ও অসুন্দর  সময়েও শুদ্ধ নান্দনিকতায় বিশ্বাসী ভারতের কিছু প্রতিভাবান ও যশস্বী শিল্পীর তুলি-কলমের উড়ালে। সুব্রত চৌধুরী তাঁদেরই অন্যতম। তা ওঁর ক্যানভাস- মাতানো নিজস্ব চিত্রভাবনাতেই হোক, কিংবা এ-দেশে অলংকরণের ক্ষেত্রে প্রথম প্রজ্ঞাদীপ্ত চিত্রভাষা নির্মাণে—সুব্রতর সর্বব্যাপ্ত অভিধা আজ ‘দ্য উইজার্ড পেন্টার’ তথা ‘জাদুকর ছবিওয়ালা’। বলা বাহুল্য, মধ্যযুগীয় জার্মান নগরী হ্যামলিনের সেই জাদুকর বাঁশিওয়ালার মতোই!

এই মুহূর্তে (১৭-২৩ মে) এ-শহরের জাহাঙ্গির আর্ট গ্যালারিতে উপস্থিত সুব্রত চৌধুরীর ‘ফেয়ারি টেল’ তথা ‘রূপকথা’ শীর্ষক মূলত ৩৬ x ৪৮ ইঞ্চি ক্যানভাসে বহুবর্ণ অ্যাক্রিলিকে আঁকা ২১টি  সাম্প্রতিক চিত্রভাষ্যের এক পরম উপভোগ্য সৃষ্টি-শৃঙ্খলা। এই শৃঙ্খলা বা ক্রমিক অবস্থানের কথাটি এ-কারণেই যে, পৃথক ভাবে ছবিগুলির কোনও নামকরণ নেই। বরং যা রয়েছে তা হল: একই স্বপ্নদৃশ্যের মধ্যে অজস্র পুষ্পমুকুল, স্তূপমেঘ বা শিলাবৃষ্টির পর্ব থেকে পর্বান্তরে যাওয়ার মতোই বহুমাত্রিক রূপ বদলের একেকটি ঢেউ—আদতে যা একটিই কল্পদৃশ্যের সন্ধানে যেন একবিংশতি দর্পণখণ্ডের দিকে উন্মুখ  দৃষ্টিপাতের আয়োজন!

এই সব দর্পণখণ্ডে সুব্রত ওঁর স্বভাবোচিত বিনম্র বর্ণ নির্বাচন ও পেলব তুলিচালনাগুণে মায়াজগতের যে-দৃশ্যপটগুলিকে‌ মেলে ধরেছেন—তাতে আকাশ, জল ও মৃত্তিকার আভাসে আসলে এক অদ্ভুত নিঃসীম শূন্যতারই আয়োজন। মিত উচ্চারণে আমরা যাকে পরিসর বলি। সুব্রতর অধিকাংশ ক্যানভাসেই এই শূন্যতাকে ধুলোবালি থেকে তুলে এনে যেন এক রাজ-সিংহাসনে বসানো হয়েছে। যেন আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই মৌন বিষণ্ণ শাসকের সাম্রাজ্যে, যাতে আমরা সেই অপার সৌন্দর্যের সামনে নির্বাক ও নতজানু হতে শিখি। তা, সেই শূন্যতার সাম্রাজ্যে ঢুকে আমরা কী দেখতে পাই? না, ছোট বড় নানা বর্ণ ও আকৃতির ফুল মাছ পাখি ব্যাং কুমির এবং বিভিন্ন সুরযন্ত্রের সান্নিধ্যে বসে বা দাঁড়িয়ে-থাকা নানা বয়সের কিছু অপার্থিব নারী—যাঁদের ঐশ্বরিক মুখমণ্ডলে ব্যথা ও বেদনা, বিস্ময় ও  বিষণ্ণতার পাশেই অমোঘ এক প্রজ্ঞা ও প্রকীর্ণতার প্রলেপ—যার তীব্র অভিঘাতে এমনকী সেই নারীরা নিজেই কখন এক দেহগত রূপান্তরের অভিমুখ হয়ে বসে, অর্থাৎ সাররিয়াল ট্রান্সফর্মেশনে কখনও সে পক্ষীমানবী, কখনও মৎস্যকন্যা, আবার কখনও বা অতি সাধারণ গৃহ-পরিসরেও পিঠের দু’ধারে দুটি সংক্ষিপ্ত পাখার বিস্তার মেলে ধরে যেন অচেনা-অধরা এক দিব্য দেবদূতী!

ছবিগুলির আলোচনায় ঢোকার আগে ঠিক এই জায়গাটি থেকেই আমরা একবার মুখোমুখি হব শিল্প বিষয়ে গত উনিশ শতকীয় ফ্রান্সের আগ্নেয় কবি-শিল্পী শার্ল ব্যদলেয়ারের একটি অমূল্য সংজ্ঞার: ‘‘মানুষ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যে-সম্পর্ক, শুধু শিল্পীই তার একমাত্র যোগসূত্র। এ জন্যই পৃথিবীর যাবতীয় ভাব ও সৌন্দর্যকে প্রতীকায়িত রূপ দিতে চায় শিল্পী। কেননা, নইলে তা অজ্ঞাতই রয়ে যেত। ঠিক যেমন ঘুম ভাঙার পর মিলিয়ে যায় রাতের স্বপ্ন।’’

পাখি বরাবরই সুব্রতর এক প্রিয় প্রতীক। পাখির ছবিই তাঁকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এনে দিয়েছে। তাই প্রত্যাশিত ভাবেই এই প্রদর্শনীতেও তা বারবার উঁকি দিয়েছে একেকটি ক্যানভাসে। তার মধ্যে একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকৃতি পাখির কথা এখানে না বলে পারা গেল না। ধরা যাক সেই নামহীন ছবিটির নাম ‘মাধবীলতার পাখি’, যাতে পৃথিবীর যাবতীয় স্বপ্ন-মেশানো এক নারীর চারপাশে যেন স্বপ্নের মতোই অজস্র চিকণ ডাল থেকে ঝুলে থাকে সবুজে-হলুদে মাখানো একরাশ মাধবীলতার পাতাপত্রে ভর-দেওয়া একরত্তি এক পাখি। যার অনিন্দ্যসুন্দর দেহের বর্ণ ও ভঙ্গিমার ভারসাম্য যেন আমাদেরই উচ্ছল প্রাণের প্রতীক—যা এক নিয়তির মতোই বৃক্ষতলে ওই নারীটির কাছে পৌঁছতে চায়।

যদিও বৈচিত্রের খোঁজেই এ চিত্র-শৃঙ্খলায় সুব্রত নিজেকে ভেঙেছেন নানা ভাবে। যেমন পাখির ড্রয়িংয়েরই সদ্য-আলোচিত যাবতীয় বাস্তব-আনুগত্যকে উড়িয়ে দিয়ে ওঁকেই আমরা পক্ষীমানবীর রূপারোপকালে আত্মস্থ হতে দেখি জীবনানন্দীয় পেঁচা ও এক মানবীর মিশ্রিত অবয়বে যেন বাস্তব-অতিক্রমী কোনও সৎ শিল্পের সাহসী প্রয়াসে। যেন লক্ষ্মী ও তাঁর বাহনের একই দেহাশ্রয়ী এই প্রতীক-পরীক্ষায় তিনি চূড়ান্ত ভাবে সফল।

তবে এই ছবিটির থেকেও ফর্মের পরীক্ষায় অনেক দুঃসাহসী লেগেছে ওঁর জলতলে মৎস্যকন্যার ছবিটিকে। একেবারে জীবন্ত ও প্রাণময় দৃষ্টিতে চেয়ে-থাকা যে কল্পনারীর পক্ষীসদৃশ পা দুটি ক্যানভাসের নীচের তলে এসে নিজেরই নারীসত্তার দ্বিতীয় এক শায়িত মুখাবয়বের উপরে আটটি বিস্তৃত নখের ভারসাম্যতায় বসে থাকে অপার মগ্নতায়। আসলে বাস্তব ও পরাবাস্তবের জগতে শিল্পীর নিয়ত কল্পভ্রমণের এ এক নিখুঁত প্রতীকায়ন!

নারীর নগ্নতার আমন্ত্রণ এড়াতে পারেননি বিশ্বের কোনও শিল্পীই। শিল্পসৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই। তবুও কারও কারও তুলির ছোঁয়ায় সেই নগ্নতাই যেন দেবার্চনার পুষ্প হয়ে ওঠে। সুব্রত চৌধুরীর নগ্নিকারা এই বিরল গোত্রের বিবসনা—যাঁদের দেখে কামনা-বাসনার বদলে এক ব্যাখ্যাতীত মায়া বা করুণার জন্ম হয়, যেন অকারণেই বড় দয়ার্দ্র হয় মন।

শিল্পের শুদ্ধতার এই হল এক সূক্ষ্ম মাপকাঠি। তা, এই প্রদর্শনীতে বৃন্দাবনের অষ্টসখীর মতোই সুব্রতও সঙ্গে এনেছেন ওঁর আট অনাবৃতাকে, যাঁদের কেউ কলের গান শোনেন তো কেউ জলতলের অদ্ভুত এক প্রাচীন ভগ্নস্তূপে বসে ভেসে-যাওয়া মাছের ঝাঁক দু’পাশে নিয়ে এক বাতিলপ্রায় পিয়ানোয় সুর তোলেন। কেউ শরীরী মসৃণতাকে অস্ত্রের মসৃণতার সামনে রেখে নির্নিমেষ চেয়ে থাকেন তো কেউ মৎস্যকন্যাদের জলক্রীড়া দেখেন নিজের প্রজাপতিসদৃশ পাখা দুটিকে দু’পাশে ছড়িয়ে রেখে। পরাবাস্তবের এমনই সহজ ও জটিল মনন-অবকাশ প্রায় সর্বত্রই। যেমন বস্ত্রভারহীনা এক মগ্ন জলকন্যাকে দেখা যায় স্বরলিপির পাতায় চোখ রেখে, বেহালার সুর সৃষ্টিতে তন্ময় হয়ে আছে। এই চিত্রকল্পটিকে অপূর্ব লেগেছে যেন মৃত ও জীবিতের জগতের এক অপার্থিব মিলনদৃশ্য হিসাবে।

সার্বিক ভাবে প্রতিটি ক্যানভাসই যেন অবিকল কোনও রূপকথার প্রাসাদের ২১ কিসিমের দেওয়ালচিত্র, অথবা তার ২১ মহলের পালঙ্কজোড়া নকশিকাঁথার মতো দামি—যাতে অতি চেনা কোনও ভারতীয় নারীই মন্ত্রবলে কখন প্রাচীন ইউরোপের কোনও মায়া-রমণীর মুখাবয়ব নিয়ে, অমনই মরাল গ্রীবা তুলে, চার পাশের সব কিছুকেই এক অদ্ভুত বিস্ময়-মেশানো তাচ্ছিল্য অথবা এক বেদনা-জড়ানো একাকিত্বের যাপনকাল ভেবে উপভোগ করছেন... আর তার বহু যুগ পরে আমরা দর্শকেরা যেন সেই ধূসর চিত্রগুলিই ফের কোনও অলৌকিক ফটো-অ্যালবাম খোলার মতন  উল্টে পাল্টে দেখছি!

স্বাধীন ভারতের প্রথম পর্বের শ্রেষ্ঠ মহিলা চিত্রশিল্পীদের অন্যতমা শানু লাহিড়ী শিল্পকলা বিষয়ে একবার একটি অসাধারণ উক্তি করেছিলেন: ‘‘সৃষ্টিই হল শিল্পীর প্রতিবিম্ব। তাই শিল্পীর ছায়া থেকে যায় তাঁর প্রতিটি শিল্পেই।’’  বসন্তবৌরী-হলুদ, মাছরাঙা-নীল, কুয়াশা-ধূসর, দিঘিপাড়-সবুজ আর মহেঞ্জোদড়ো-তামাটে—মূলত নিশি-ডাকের মতো সম্মোহক এই পাঁচটি রঙের বুননে এবং ভারতীয় লোকশিল্প ও পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী শিল্পের এক আশ্চর্য মেলবন্ধনে ‘রূপকথা’ শীর্ষক সুব্রত চৌধুরীর এই তীব্র স্নায়ুগ্রাসী ছবিগুলি দেখার পর শানুর সেই অমোঘ উক্তিটির কথা ভেবে হঠাৎ মনে হতেই পারে—গঙ্গাতীরের এক বর্ষপ্রাচীন জনপদে নিজের শিল্পীসত্তার বীজবপন বলেই কি সুব্রতর এই সব অপরূপ স্বপ্নসৃষ্টি নিয়ে স্রোতের মতন ভেসে চলা?

 নইলে ওঁর একটি ছবিতে গাঢ় কমলাবর্ণ উড়ন্ত দেবশিশুর পাশে যে-দীঘল পীতবর্ণা নারীর অবস্থান, পূর্ণত মুণ্ডিতমস্তক হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে দেখে হৃদয়ে অমন ঘোর লাগবে কেন? অথবা ওঁর এই সিরিজের সম্ভবত শ্রেষ্ঠ রহস্যময়ী যে-নারী তাম্রাভ কণ্ঠদেশের দু’পাশে অসাধারণ দু’সারি শিকলাকৃতি বিনুনির মতো কেশসজ্জা নিয়ে ব্যথাতুর চোখে চেয়ে থাকেন ফ্রেমের দুটি জ্যামিতিক মধ্যবিন্দু থেকে—তাঁকে দেখে অযথাই মনে হবে কেন, এ আমার গতজন্মেরও বহু আগে থেকে চেনা?

আসলে সবার আঙুলে বুঝি সমস্ত আসে না! আর সে জন্যই বুঝি মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পীর ক্ষেত্রেই প্রদর্শনী ফুরোলেও ফ্রেমগুলি রয়ে যায় আরও বহু কাল ধরে দর্শকের বুকের গভীরে, রয়ে যায় অফুরান ‘রূপকথা’ হয়ে!