সে সময় ওবেরয় গ্র্যান্ডে গ্যারি সোবার্স, ক্লাইভ লয়েড, টনি গ্রেগ, সুনীল গাওস্কর, পতৌদি, শর্মিলা ঠাকুর, কপিলদেব, ফুটবল সম্রাট পেলে, উত্তমকুমার, অমিতাভ ও জয়া বচ্চন, রেখা, শশী কপূর, রাজেশ খন্না, ডিম্পল, ধর্মেন্দ্র, হেমা মালিনী প্রমুখ বহু বিখ্যাত মানুষকে প্যারিস নিজের হাতে কন্টিনেন্টাল খাবার রান্না করে খাওয়াতেন।

সে সময়টা ছিল গানবাজনা, সিনেমা, সাহিত্য, খাওয়াদাওয়া সব কিছুর স্বর্ণযুগ। সে সময়ের কলকাতার ওবেরয়ের কন্টিনেন্টাল খাবারের সুনাম ছিল দেশজোড়া।

এর পর আশির দশকের শেষের দিকে প্যারিস তাজ বেঙ্গলে যোগদান করেন। সেখানেও দীর্ঘ দিন সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছেন।

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, সচিন তেন্ডুলকর, ওয়াসিম আক্রম, যুবরাজ সিং, হরভজন, অনিল কুম্বলে, রিকি পন্টিং, শেন ওয়ার্ন, গিলক্রিস্ট, সঞ্জয় দত্ত, অক্ষয়কুমার, শাহরুখ খান, মাধুরী দীক্ষিত, আমির খান, কুমার শানু, অজয় দেবগণ, কাজল, সুস্মিতা সেন, ঐশ্বর্য রাই, মিঠুন চক্রবর্তী প্রমুখ বহু বিখ্যাত মানুষকে নিজর হাতে রান্না করে প্যারিস খাইয়েছেন।

এর পর কিছু দিন কেনিলওয়ার্থ হোটেলে কাজ করে ২০০৩ সালে পার্ক স্ট্রিটের ‘ওয়ান স্টেপ আপ’ রেস্তোরাঁয় যোগ দেন। ওখানেই ছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত। প্যারিসের হাতের জাদুতে অল্প সময়ের মধ্যেই ‘ওয়ান স্টেপ আপ’ কলকাতার সেরা কন্টিনেন্টাল খাবারের রেস্তোরাঁগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে।

দেশ-বিদেশের খাদ্যরসিকদের ভিড় উপচে পড়ে ‘ওয়ান স্টেপ আপ’-এ। ‘ওয়ান স্টেপ আপ-এ রেগুলার কাস্টমারদের মধ্যে মুনমুন সেন, রিয়া ও রাইমা সেন প্যারিসের তৈরি খাবারের বিশেষ ভক্ত।

কিন্তু এত বড় শেফ হয়েও প্যারিসের আচার-আচরণ ছিল কিন্তু অত্যন্ত সাধারণ মানের। সহজ-সরল এই মানুষটিকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, তার এত নামডাক। সব সময়েই মুখে হাসি লেগে থাকত। শত ব্যস্ততার মধ্যেও কিচেন থেকে বেরিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে খাবার নিয়ে কথা বলতেন, সুযোগ হলে দু’কলি ইংরেজি গানও শুনিয়ে দিতেন অবলীলায়।

প্যারিসের তৈরি মুলগাথানি স্যুপ, প্রন ককটেল, চিকেন মেক্সিকানা, ইম্পিরিয়াল চিকেন, ফিশ ডায়ানা, চিকেন স্ট্রগোনভ, চিকেন আলাকিভ, প্রন থার্মিডোর, প্রন মুনিয়েঁর, ফ্রায়েড ফিশ উইথ টার্টার সস, ল্যাম্ব লাসাগ্‌নে, ফিশ পিকাটা, পোলো ক্যাসালিন্দা প্রভৃতি ষাট ও সত্তরের দশকের বিখ্যাত সব কন্টিনেন্টাল

শেফ প্যারিস পার্ক স্ট্রিটের ‘ওয়ান স্টেপ আপ’ রেস্তোরাঁয় তাঁর হাতের জাদুতে ফিরিয়ে এনেছিলেন সোনালি অতীত। আজ প্যারিস আমাদের মধ্যে নেই। তাই তাঁর স্মৃতিতে তাঁরই কাছ থেকে পাওয়া তাঁর তৈরি দুটি ডিশের রেসিপি জানালাম। মুম্বইয়ের বাড়িতে এই সব বিখ্যাত ডিশ তৈরি করে নস্টালজিক হয়ে যেতেই পারেন।

 

• ফিশ ডায়ানা

উপকরণ: ১৫০ গ্রাম বোনলেস ভেটকি মাছের ফিঁলে সমান দু’ভাগে চৌকো করে কেটে পিস করে নিন। ধুয়ে পরিষ্কার করে জল মুছে নিন।

পুর বা মিশ্রণ তৈরির জন্য: ১০০ গ্রাম সিদ্ধ করা চিংড়ি মাছের কুচি (চিংড়ির খোসা, লেজ ও শিরা বাদ দিয়ে সিদ্ধ করতে হবে), ১ টেবল- চামচ সিদ্ধ করা বাটন মাশরুম কুচি, ১ চা-চামচ পার্সলি পাতা কুচি, ৬ টেবল-চামচ গ্রেট করা চিজ, ২ টেবল-চামচ ক্যাপসিকাম কুচি, আন্দাজমতো নুন ও গোলমরিচের গুঁড়ো।

পদ্ধতি: একটি পাত্রে সিদ্ধ করা চিংড়িমাছ কুচি, সিদ্ধ করা বাটন মাশরুম কুচি, নুন ও গোলমরিচের গুঁড়ো নিয়ে হাতের সাহায্যে ভাল করে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে নিন। পুর বা মিশ্রণ তৈরি হয়ে গেল।

আন্দাজমত ময়দা ও ১টা ডিমের গোলা নিন। পুর বা মিশ্রণটা সমান দু’ভাগে ভাগ করে হাতের সাহায্যে চেপে, চপের শেপ করে নিন। এ বার ভেটকি মাছের কাঁচা ফিঁলে বা টুকরোগুলোর মাঝখানে রাখুন। পুর-সহ মাছের ফিঁলে বা খণ্ডগুলো হাতের সাহায্যে রোল করে নিন। আঙুলের সাহায্যে কাঁচা মাছের গায়ে জল মাখিয়ে, খোলাগুলো মুখ চেপে বন্ধ করে দিন।

শুকনো ময়দার মধ্যে পুর ভর্তি মাছের ফিঁলে দুটো রোল করে বা গড়িয়ে নিন। এর পর ডাস্ট করে নিন—অর্থাৎ অতিরিক্ত ময়দা ঝেড়ে ফেলে দিন। সসপ্যান আঁচে বসিয়ে আন্দাজমত জল দিন।

জলের মধ্যে একটা পাতিলেবুর রস ও ১ টেবল-চামচ স্যালারি কুচি দিন। জলটা ফুটে উঠলে ময়দায় ডাস্ট করা পুরভর্তি মাছের ফিঁলেগুলো ডিমের গোলায় চুবিয়ে সসপ্যানে দিয়ে মিনিট পাঁচেক সিদ্ধ করে নিন।

মাছ সিদ্ধ হয়ে গেলে স্লাইসারের সাহায্যে প্যান থেকে তুলে জল ঝরিয়ে আলাদা করে একটি প্লেটের মধ্যে রাখুন।

 

• সস তৈরির জন্য

উপকরণ: রিফাইন্ড অয়েল ২৫ গ্রাম, মাখন ২৫ গ্রাম, ১ টেবল-চামচ পেঁয়াজ কুচি, ১ চা-চামচ রসুন কুচি, আন্দাজমত ফিশ স্টক, ৪ টেবল-চামচ টম্যাটো কনকাসে, আন্দাজমত নুন ও গোলমরিচের গুঁড়ো, ১ টেবল-চামচ ক্রিম, ১ চা-চামচ পার্সলি পাতার কুচি।

পদ্ধতি: সসপ্যান আঁচে বসিয়ে রিফাইন্ড অয়েল গরম করে মাখন দিন। মাখন ভাল ভাবে গলে মিশে গেলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে নাড়ুন। চকচকে হয়ে এলে রসুনকুচি দিয়ে হালকা ভেজে নিন। এর পর ফিশস্টক দিয়ে কিছুক্ষণ ফোটান।

টম্যাটো কনকাসে দিয়ে নে়ড়েচেড়ে মেশান। নুন, গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে নিভু নিভু আঁচে মিনিট ছয়েক রান্না করুন। ঘন হয়ে এলে ক্রিম ঢেলে মিশিয়ে নিন। পার্সলিপাতা ছড়িয়ে আঁচ থেকে নামিয়ে নিন। সস তৈরি হয়ে গেল।

এ বার প্লেটের মধ্যে রাখা সিদ্ধ করা (পোচড) পুরভর্তি মাছের উপর সস-টা ঢেলে দিন। লম্বা করে কাটা গাজর, বিনস ও আলু সিদ্ধ করে নিন। ফ্রাইং প্যানে মাখন গলিয়ে সিদ্ধ করা গাজর, বিনস ও আলু, আন্দাজমতো নুন ও গোলমরিচের গুঁড়ো, পার্সলি পাতার কুচি ছড়িয়ে নেড়েচেড়ে নিন। প্লেটে ঢেলে এ-সব সহযোগে ফিশ ডায়ানা পরিবেশন করুন।

 

• চিকেন স্ট্রগোনভ

উপকরণ: ২০০ গ্রাম সরু লম্বা লম্বা করে কাটা বোনলেস চিকেন। চিকেন জলে ধুয়ে পরিষ্কার করে জল ঝরিয়ে রাখুন। ৭৫ গ্রাম মাখন, ২ চা-চামচ রসুনকুচি, ২৫ গ্রাম সরু ও লম্বা করে কাটা ক্যাপসিকাম, ২ টেবল-চামচ সিদ্ধ করা বাটন মাশরুম, ২ টেবিল-চামচ সরু ও লম্বা করে কাটা পেঁয়াজ, আন্দাজমত নুন ও সাদা গোলমরিচের গুঁড়ো, আধ কাপ চিকেন স্টক, ৪ টেবল-চামচ হোয়াইট সস, ৩ টেবল-চামচ ডাবল ক্রিম।

পদ্ধতি: ফ্রাইং প্যান আঁচে বসিয়ে মাখন গলিয়ে রসুনকুচি দিয়ে সোনালি রং করে ভাজুন। সরু লম্বা লম্বা করে কাটা বোনলেস চিকেনগুলো দিয়ে নেড়েচেড়ে ভাজুন। অর্ধেক ভাজা হলে ওর মধ্যে ক্যাপসিকাম, মাশরুম, পেঁয়াজ, নুন ও সাদা গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে ভাল করে নেড়ে ভাজুন। এর পর চিকেন ভাজা হয়ে গেলে ওর মধ্যে চিকেন স্টক দিয়ে নিভু নিভু আঁচে পাঁচ মিনিট রান্না করুন। চিকেন কষে গেলে হোয়াইট সস ঢেলে আরও তিন মিনিট নেড়েচেড়ে রান্না করুন। সবশেষে ডাবল ক্রিম ঢেলে ভাল করে নেড়েচেড়ে মিশিয়ে, আঁচ থেকে নামিয়ে গার্লিক রাইস, সিদ্ধ করে মাখনে সাঁতলানো গাজর, বিন্‌স ও আলু-সহযোগে পরিবেশন করুন।

 

• গার্লিক রাইস তৈরির পদ্ধতি

ফ্রাইং প্যান আঁচে বসিয়ে আন্দাজমত রিফআইন্ড অয়েল ও মাখন গলিয়ে তার মধ্যে রসুনকুচি দিয়ে নেড়েচেড়ে ভাজুন। সিদ্ধ করা দেরাদুন চালের ভাত ওর মধ্যে দিয়ে আন্দাজমত নুন ও সাদা গোলমরিচের গুঁড়ো দিন। ভাল করে নেড়ে মিশিয়ে নিন। গার্লিক রাইস তৈরি হয়ে গেল।